দেশে খাদ্য অপচয়ের প্রবণতা এত বৃদ্ধির নেপথ্যে কী
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০২৪, আপডেট ১৩:৩০
বাংলাদেশে খাদ্য অপচয়ের এ প্রবণতা অনেক উন্নত দেশের চেয়েও বেশি। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। নেপথ্যের কারণ নিয়ে আশিকুর রহমান’র প্রতিবেদন
জনপ্রতি বছরে গড়ে অপচয় ৮২ কেজি: বাংলাদেশে উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোতে খাদ্য অপচয় বেশি হয়। আর কম অপচয় হয় গরিব পরিবারগুলোতে। ২০২২ সালে বাসাবাড়ি, খাদ্য সেবা ও খুচরা পর্যায়ে সারা বিশ্বে মোট খাদ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ (১০০ কোটি টনের বেশি) অপচয় হয়েছে। ওই বছর বাংলাদেশেও একজন ব্যক্তি বছরে ৮২ কেজি খাবার অপচয় করেছেন। বাংলাদেশে খাদ্য অপচয়ের এ প্রবণতা ইন্ডিয়া রাশিয়া, আমেরিকা ও ব্রিটেনের চেয়ে বেশি। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক কর্মসূচি ইউনেপের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ওই বছর বিশ্বে বেশিরভাগ খাদ্য অপচয় হয়েছে বাসাবাড়িতে। মোট খাদ্য অপচয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ বাসাবাড়িতে হয়েছে। গড়ে একজন মানুষ বছরে ৭৯ কেজি খাবার অপচয় করেছেন। ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স রিপোর্ট-২০২৪ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে ইউনেপ বলেছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশের খাদ্য অপচয়ের প্রবণতা ইন্ডিয়া, রাশিয়া, ব্রিটেন ও আমেরিকার চেয়ে বেশি ছিল। জাতিসংঘের হিসাবে বাসাবাড়িতে এক ব্যক্তি বছরে গড়ে ইন্ডিয়ায় ৫৫, ব্রিটেনে ৭৬, আমেরিকায় ৭৩ ও রাশিয়ায় ৩৩ কেজি খাবার অপচয় করেছেন। তবে এ হিসাবে সবচেয়ে বেশি খাবার অপচয় হয়েছে মালদ্বীপে ২০৭ কেজি। আর সবচেয়ে কম ১৮ কেজি হয়েছে মঙ্গোলিয়ায়। ইউনেপের আগের প্রতিবেদনের সাথে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগের চেয়ে ২০২২ সালে খাদ্য অপচয় বা খাদ্য উপাদান কিংবা তৈরি খাদ্য নষ্ট করার প্রবণতা বেড়েছে। ২০১৯ সালের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে সংস্থাটি ২০২১ সালের প্রতিবেদনে জানায়, একজন বাংলাদেশি বছরে ৬৫ কেজি খাদ্য উপাদান কিংবা তৈরি খাদ্য নষ্ট করেন। গবেষকরা বলছেন, সাধারণভাবে খাবার সম্পূর্ণ না খেয়ে অপচয় করাটাই হল ফুড ওয়েস্ট। আর ফুড লস হল উৎপাদন বা আহরণের পর গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত না পৌঁছানো। সেটিও খাদ্য অপচয়ের মধ্যেই পড়ে। আবার যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে কোনো খাবার যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে সেটি খাদ্য অপচয়ের আওতায় আসবে। এর মধ্যে ফুড লস হয় মাঠ পর্যায় থেকে গ্রাহকের হাতে আসা পর্যন্ত। আর ফুড ওয়েস্ট বা অপচয় হয় গ্রাহকের হাতে আসার পর। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বিশ্বের ৫৮ দেশের ২৫৮ মিলিয়ন মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং দিনকে দিন এ সংখ্যা বাড়ছে। যেভাবে বৈশ্বিক সংঘাত, জলবায়ু সংকট ও অর্থনৈতিক স্থবরিতা দিনকে দিন বাড়ছে তাতে করে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা আগামী দিনগুলোতে আরও প্রকট রূপ ধারণ করবে। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে জাতীয় পর্যায়ে কর্মপরিকল্পনা গাইডলাইনের পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের হর্টিকালচার বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক ড. মো. কামরুল হাসান। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন পর্যায়ে খাদ্য অপচয় কমিয়ে এনেছে বহুগুণে। আমাদের এ বিষয়ে জোর দিতে হবে। এ ছাড়া খাদ্য অপচয় প্রতিরোধে ন্যাশনাল স্ট্রাটেজি তৈরি করা জরুরি। একটি সঠিক পরিকল্পনা আমাদের খাদ্য অপচয় রোধ করতে পারে।

বিশ্বে দিনে নষ্ট হয় ১০০ কোটি টন: মধ্যপ্রাচ্যের দেশ গাজায় অনাহারে অপুষ্টিতে প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে শিশু ও বয়স্কজন। শুধু গাজাই নয়, বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশেই খাদ্যের অভাবে প্রতিনিয়ত মৃত্যু হচ্ছে মানুষের। অথচ সেই বিশ্বেই প্রতিদিন ১০০ কোটি টন খাবার নষ্ট হয়, বলছে জাতিসংঘ। কিন্তু এর বিপরীতে প্রতিদিন অনাহারে থাকছে ৭৮ কোটি মানুষ। নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। বিশ্বের খাদ্য অপচয় নিয়ে ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স রিপোর্ট-২০২৪ এ তথ্য প্রকাশ করে জাতিসংঘের এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনইপি)। ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য অপচয় অর্ধেক করার চেষ্টা করছে এমন দেশগুলোর অগ্রগতি লক্ষ্য করে রিপোর্টটি প্রস্তুত করা হয়। সেখানে বলা হয় যে, ২০২২ সালে বিশ্বে এক বিলিয়ন টনেরও বেশি খাদ্য, অর্থাৎ বাজারে পাওয়া সমস্ত পণ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নষ্ট হয়েছিল। এসব খাবার বেশিরভাগই পরিবারের দ্বারা নষ্ট হয়েছিল বলছে গবেষণাটি। তবে এ গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশের পরই উৎপাদিত খাদ্য বিতরণে বিশ্বের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংস্থাটির পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, খাদ্য অপচয় একটি বিশ্বব্যাপী ট্র্যাজেডি। সারা বিশ্বে খাদ্য নষ্ট হওয়ায় লাখ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত হচ্ছে। এই ধরনের অপচয় মানুষের সৃষ্টি, পরিবেশগত নয় বলে হয়েছে গবেষণাতে। জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বিশ্বে নষ্ট হওয়া ১০০ কোটি মেট্রিক টন খাবারের মধ্যে এক-পঞ্চমাংশ গৃহস্থালি, রেস্তোরাঁ, খাদ্য পরিষেবা এবং খুচরা খাতের। এতে আরও বলা হয়েছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার সময় নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া খাদ্য উৎপাদনের খামার থেকে খাদ্য গ্রহণ পর্যন্ত পৌঁছানোর সময়ে নষ্ট হয় প্রায় ১৩ শতাংশের ওপরে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে গৃহস্থালি বা পরিবারগুলো ৬০ কোটি মেট্রিক টনের বেশি খাদ্য নষ্ট করেছে। যা মোট অপচয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ। গড় হিসেবে একজন ব্যক্তি প্রতি বছরে ৭৯ কিলোগ্রাম খাবার অপচয় করে। কেবল উন্নত বিশ্বে নয়, উচ্চ এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেও প্রতি বছর জনপ্রতি ৭ কিলোগ্রাম খাবারের অপচয় হয়। গবেষণা সংস্থা আইএফসিওর প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বে অপচয় হওয়া খাদ্যের মধ্যে ৪৫ শতাংশ ফলমূল এবং সবজি, ৩৫ শতাংশ মাছ, ৩০ শতাংশ শস্য, ২০ শতাংশ দুগ্ধজাত পণ্য এবং ২০ শতাংশ মাংসজাত পণ্য। মূলত এসব খাদ্যপণ্য অপচয় উৎপাদন থেকে শুরু করে ভক্ষণ প্রতিটি পর্যায়ে হয়ে থাকে। পর্যায়ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ বাড়াতে পারলে খাদ্য অপচয় কমে আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া অপচয় রোধের পাশাপাশি সুষ্ঠু বণ্টনের দিকে জোর দেয়া হয় জাতিসংঘসহ নানা সংস্থার প্রতিবেদনে। খাদ্যের বর্জ্যের সিংহভাগই জমিতে যায়, যা ভেঙ্গে মিথেন গ্যাস তৈরি হয় । এটি একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, মিথেনের উষ্ণতা শক্তি কার্বন ডাই অক্সাইডের থেকে প্রায় ৮০ গুণ বেশি। খাদ্যের বর্জ্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকেই প্রভাবিত করে না বরং এটি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। গরম দেশগুলিকে শীতল দেশগুলির চেয়ে বেশি খাবার নষ্ট করতে দেখা গেছে, কারণ উচ্চ তাপমাত্রা খাবার নষ্ট হওয়ার আগে সংরক্ষণ করা এবং পরিবহন করা আরও চ্যালেঞ্জিং করে তোলে।

ড. মো. আব্দুস শহীদ
পরিমাণ কমিয়ে আনাই সরকারের লক্ষ্য: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশনএইডের পুরনো এক গবেষণা থেকে জানা যায়, দেশে সবচেয়ে বেশি খাবার নষ্ট হয় বিয়ের অনুষ্ঠানে। এর পরই রয়েছে রেস্তোরাঁ। রাজধানীর বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁয় কথা বলে জানা যায়, তাদের রান্না করা খাবারের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ নষ্ট বা অপচয় হয়। তবে রান্নার চেয়ে পরিবেশনে বেশি পরিমাণ খাদ্যের অপচয় হয় বলে জানান তারা। কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুস শহীদ বলেছেন, বাংলাদেশে ফসল সংগ্রহের পর বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ৩০ শতাংশ ফসল ও খাদ্য নষ্ট এবং অপচয় হয়। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য নষ্ট ও অপচয়ের পরিমাণ কমাতে পারলে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ৩৭তম এশিয়া ও প্যাসিফিক আঞ্চলিক সম্মেলনে খাদ্য ও পানি সংরক্ষণ এবং খাদ্য অপচয়রোধ শীর্ষক সেশনে তিনি এসব কথা বলেন। আব্দুস শহীদ বলেন, কৃষিতে বর্তমান সরকারের এখন অগ্রাধিকার হলো ফসলের সংগ্রোত্তর নষ্ট ও অপচয়ের বিশাল পরিমাণ কমিয়ে আনা। সেলক্ষ্যে সরকার ৫০-৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে কৃষকদের কৃষিযন্ত্র দিয়ে যাচ্ছে এবং বহুমুখী হিমাগার নির্মাণ, বহুফসলের সমন্বিত সংরক্ষণাগার নির্মাণ ও শাকসবজি পরিবহনে রেফ্রিজারেটেড ভেহিকল প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। খাদ্য নষ্ট ও অপচয়ের পরিমাণ কমাতে ফসল তোলা, মাড়াই, পরিবহণ ও সংরক্ষণে বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে, তারপরও এসব খাতে বেসরকারি ও বিদেশি বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন। আমরা এখন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) অগ্রাধিকার দিচ্ছি। বিদেশি বিনিয়োগ আনার বিষয়ে এফএও সহযোগিতা করতে পারে। খাদ্যশস্যের অপচয় নিয়ে কৃষিবিজ্ঞানীরা বলেন, খাদ্যশস্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করার কারণে অনেক বেশি পরিমাণ নষ্ট হয়। অনেকেই জানেন না সবজি এবং ফলমূল কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয়। এ জন্য অনেক সময় ভালোভাবে পাকার আগে কিংবা বেশি পেকে গেলে তারপর ফসল সংগ্রহ করা হয়। এখানে ঠিকভাবে মানা হয় না পরিপক্বতার নির্দেশনা। এ ছাড়াও সঠিক নিয়ম না মেনে রান্না করা এবং খাবার পরিবেশনের নিয়ম না মানার কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে খাদ্যশস্য অপচয় বা নষ্ট হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, বাসা ও রেস্তোরাঁয় খাবার অপচয়ের মূল কারণ হল, দরকারের চেয়ে বেশি রান্না করা, অতিরিক্ত খাবার কিনে তা ব্যবহার না করা এবং খাবার সংরক্ষণ যথাযথভাবে না করা। গবেষণায় খাবার অপচয় বা নষ্টের ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে এসব কারণই উঠে এসেছিল।
সুনির্দিষ্ট কোনও কর্তৃপক্ষ নেই: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির খাদ্য অপচয় সংক্রান্ত যৌথ গবেষণা বলছে, দেশে ফসলের মাঠ থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছতে প্রতি বছর ৩৭ লাখ টনেরও অধিক খাদ্যশস্য নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া ইঁদুর, পাখি ও বাদুড়ের মতো প্রাণী দ্বারাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্যশস্যের অপচয় হয়ে থাকে। অর্থাৎ এক কেজি ধান নষ্ট হওয়া মানে প্রকৃতপক্ষে এর ৭ গুণ বেশি অপচয় হওয়া। অপচয়ের কারণেই আমাদের দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদিত হওয়ার পরও আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। খাদ্য আমদানির বিষয়ে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ ছিল ৪৯ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিকটন। এক্ষেত্রে চাল আমদানির পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৫৫ হাজার মেট্রিকটন এবং গম ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিকটন।
গত বছরের জুন মাসে প্রকাশ হওয়া বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক নিরাপদ খাদ্য ফোরাম এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) গবেষণা থেকে জানা যায়, উৎপাদন থেকে মানুষের প্লেট পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই প্রায় ১৮ শতাংশ শস্যদানা অপচয় হয়। ১৭ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত অপচয় হয় ফল ও সবজি। মোট অপচয়ের হার হিসেবে বাড়ি বা পরিবার থেকে ৬১ শতাংশ, হোটেল বা রেস্তোরাঁ থেকে ২৬ শতাংশ এবং বাকিটুকু বিক্রয় প্রতিষ্ঠান, সুপার শপ, দোকান ও বাজার থেকে নষ্ট বা অপচয় হচ্ছে। এরও আগে এফএও ২০২১ সালে বাংলাদেশে একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল, যেখানে দেখা যায় উচ্চ আয়ের পরিবারে প্রতি মাসে মাথাপিছু ২৬ কেজি খাদ্য নষ্ট বা অপচয় করে। বাংলাদেশে খাদ্য অপচয় বিষয়টি দেখার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনও কর্তৃপক্ষ নেই। বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া গণমাধ্যমকে বলছেন, খাদ্য অপচয় প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া তেমন কিছু তাদের করণীয় নেই। আমরা ভোক্তা পর্যায়ে কেউ নষ্ট বা মানোত্তীর্ণ খাবার দিলে ব্যবস্থা নিতে পারি। কিন্তু কেউ খাদ্য নষ্ট করলে বা অপচয় করলে আমাদের কিছু করার আছে বলে এখনও জানা নেই। যদিও ২০২৩ সালের জুন মাসে ঢাকায় দশম আন্তর্জাতিক নিরাপদ খাদ্য ফোরামের এক অনুষ্ঠানে ‘খাদ্য নিরাপদ এবং পুষ্টিকর রাখা, ক্ষতি রোধ করা’ শীর্ষক আলোচনার আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। ওই আলোচনায় তখন বলা হয়েছিল, দেশে বছরে প্রায় এক কোটি টনের বেশি খাবার অপচয় হয় এবং বছরে জন প্রতি ৬৫ কেজি খাবার কখনও খাওয়াই হয় না। খাদ্য অপচয়ের চেয়ে খাদ্য নষ্ট হওয়ার হার অনেক বেশি। যত খাদ্য নষ্ট হয় এর ৮৭ শতাংশই ঘটে উৎপাদন, মজুত, প্রক্রিয়া, বিতরণের সময় ও বাজারে। সেই সময় জানানো হয়, যত খাবার অপচয় হয় তার ৬১ শতাংশই বাড়িতে, ২৬ শতাংশ রেস্তোরাঁ থেকে আর বাকি খাবার অপচয় হয় খাদ্যশস্য যেখানে বিক্রি হয় অর্থাৎ বাজার কিংবা বিভিন্ন ধরনের দোকানে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ৩১ মার্চ ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
সচেতনতার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞগণ : খাদ্য অপচয়বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক কামরুল হাসান বলছেন, বাংলাদেশে উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোতে বেশি খাদ্য নষ্ট বা অপচয় হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক খাদ্য অপচয় নিয়ে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ঢাকায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় গবেষণা করেছেন। অধ্যাপক কামরুল হাসানের নেতৃত্বে করা এস্টিমেশন অব ওভারঅল ফুড লসেস অ্যান্ড ওয়েস্ট এট অল লেভেলস অব দ্য ফুড চেইন শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোতে খাদ্য অপচয় বেশি হয়। আর কম অপচয় হয় একেবারে গরীব পরিবারগুলোতে। তাছাড়া নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এ ক্যাটাগরির রেস্তোরাঁগুলোতেও সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত খাদ্য অপচয় হয়ে থাকে। সে তুলনায় বি ক্যাটাগরির রেস্তোরাঁয় কিছুটা কম নষ্ট হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্ডার দেওয়া এবং সব খাবার একটু চেখে দেখার প্রবণতাই রেস্তোরাঁ গুলোতে খাবার অপচয়ের বড় কারণ বলে ওই গবেষণায় বলা হয়েছে। মূলত এসব কারণেই আমেরিকা ও ব্রিটেনের মতো উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে খাদ্য অপচয় বেশি বলে ধারণা বাংলাদেশের গবেষকদের। তারা মনে করেন, রেস্তোরাঁ বা কমিউনিটি সেন্টারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেশি নজরদারি বা মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকায় খাদ্য অপচয় প্রতিরোধে উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশের চেয়ে ভালো করছে। অধ্যাপক কামরুল হাসান বলছেন, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিলে তারা যে গবেষণা করেছেন তাতে দেখা গেছে, কমিউনিটি সেন্টারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৫-১৩ শতাংশ খাবার নষ্ট বা অপচয় হয়। বাসাবাড়ি ও হোটেল রেস্টুরেন্টে অনেক খাবার নষ্ট হয়। আমরা গবেষণায় পেয়েছি উচ্চ আয়ের বাসাগুলোতে সপ্তাহে একজন মানুষ দুই কেজির বেশি খাবার অপচয় করে থাকেন। খাদ্যের অপচয় রোধে সচেতনতার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহীন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের দেশে বাসাবাড়ি পর্যায়ে খাদ্য আপচয় রোধে সচেতনতা সৃষ্টি করা গেলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাহীতার ঝুঁকিও কমে আসবে। এ বিষয়ে সরকারি উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। খাদ্য অপচয় প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক খালেদা ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, বিশ্বে একদিকে মানুষ ক্ষুধা পেটে ঘুমাতে যাচ্ছে, অন্যদিকে আবার দেদারছে খাদ্য অপচয় করছে আরেক শ্রেণির মানুষ। এই বৈষম্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে পাউরুটি প্রধান খাদ্য সেসব দেশে স্যান্ডুইচ বানাতে যে পরিমাণে ব্রেড ক্রাঞ্চ অপচয় করা হয়, শুধু সেই ফেলে দেয়া খাদ্য থেকে কয়েক কোটি মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করা সম্ভব। খালেদা বলেন, চা খেয়ে কাপে কিছুটা রেখে যাওয়া কিংবা প্লেটে ইচ্ছা করে খাবার রেখে যাওয়াকে অনেকে ভদ্রতা বলে গণ্য করেন। উচ্চশ্রেণি বা সেলিব্রেটি স¤প্রদায়ের মধ্যে খাদ্য নষ্ট করার এ ধরনের উদাহরণ মানুষের মধ্য অনুকরণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু যত যাই করা হোক না কেন, ভদ্রতার মেকি সংস্কৃতির নামে খাদ্য অপচয় কখনোই মেনে নেয়া যায় না। খাদ্য অপচয় রুখতে ব্যাপক প্রচারণার প্রয়োজন আছে উল্লেখ করে খালেদা বলেন, বর্তমানে অনেক রেস্টুরেন্টে পোস্টার বা সাইনবোর্ড টানিয়ে খাদ্য অপচয় না করার জন্য অনুরোধ করা হয়। এটি আরও ব্যাপকভাবে করতে হবে। খাদ্য অপচয়কে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া উচিত না।
ইউডি/এজেএস

