প্লাস্টিক দূষণ: হুমকিতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ০৭ জুলাই, ২০২৪, আপডেট ১৭:১৫
অপচনশীল’ পণ্যের সবর্ত্র জয়জয়কার : দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার। রাজধানীতে বছরে মাথাপিছু প্রায় ২৩ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহূত হয়,বাইরের শহরগুলোতে এর পরিমাণ মাথাপিছু ৩ কেজি। প্লাস্টিক বর্জ্য দেশের পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্লাস্টিক বর্জ্য মাটিতে আটকে পানি ও প্রাকৃতিক পুষ্টি উপাদান চলাচলে বাধা দেয়। এতে মাটিতে থাকা অণুজীবগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে না, মাটির উর্বরতা হ্রাস পায় এবং শস্যের ফলন কম হয়।
গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে বার্ষিক মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার ২০০৫ সালের ৩ কেজি থেকে ২০২০ সালে তিনগুণ বেড়ে ৯ কেজি হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারিকালে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বাড়ায় এর দূষণ আরও বেড়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্যের একটি বড় অংশ ভাগাড়, জলাশয় ও নদীতে ফেলা হয়।
প্লাস্টিক নিত্যব্যবহার্য পণ্য। ‘প্রায় অপচনশীল’ এই পণ্যের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন। প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা তথা মাইক্রোপ্লাস্টিক জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। এখন সর্বত্রই পলিথিন ব্যাগের ছড়াছড়ি।
পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্লাস্টিকজাত পণ্য বা পলিথিন ব্যাগ শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়েই মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশের শত্রু পলিথিন প্রতিনিয়ত ক্ষতি করে চলেছে। খাবারের প্যাকেট বা মোড়ক হিসেবে প্লাস্টিকের জয়জয়কার।
দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, যার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ নদী, খাল এবং বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে। মানব স্বাস্থ্যের ওপর প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব গভীর। যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা এবং পোড়ানোর ফলে বাতাসে বিষাক্ত রাসায়নিক নির্গত হয়, যা শ্বাসযন্ত্রের রোগ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করে।
বড় প্লাস্টিকের জিনিসগুলো ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি হয়, যা পানীয় জলের উৎসগুলোতে পাওয়া গেছে। এটি মানব শরীরে জমা হয় এবং স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। প্লাস্টিক দূষণের উল্লেখযোগ্য আর্থ-সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যাবশ্যক।
কিন্তু সৈকত ও পর্যটন স্পটগুলো প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে ভরে যাওয়ায় এ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদী ও জলাশয়ের দূষণের কারণে মাছের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে মৎস শিল্প চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যা লাখ লাখ মানুষের জীবিকাকে প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ব্যাপক চাপের সম্মুখীন। সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অসংখ্য তৃণমূল আন্দোলন এবং সামাজিক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এবং সুশীল সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং প্লাস্টিকের টেকসই বিকল্প প্রচারে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ প্লাস্টিক দূষণের কার্যকর ব্যবস্থাপনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিদ্যমান আইনের দুর্বল প্রয়োগ, জনসচেতনতার অভাব এবং বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের জন্য অপর্যাপ্ত অবকাঠামো প্রধান বাধা। এ চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করতে একটি বহুমুখী পদ্ধতি প্রয়োজন।
রাজধানী ঢাকায় ভয়াবহতা বেশি : প্লাস্টিক দূষণে বড় ভূমিকা রাখছে রাজধানী শহর ঢাকা। কারণ এর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং শিল্প কার্যক্রম একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন করছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, ঢাকায় বার্ষিক মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার শহরাঞ্চলের জাতীয় গড় থেকে তিনগুণেরও বেশি, যা বর্তমানে ২২.২৫ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়, যা পুরো বাংলাদেশে উৎপন্ন বর্জ্যের ১০ শতাংশ। ঢাকার মোট প্লাস্টিক বর্জ্যের মাত্র ৩৭.২ শতাংশ রিসাইকেল বা অন্য কাজে লাগানো হয়।
বাংলাদেশের তুলনায় ইউরোপের দেশগুলোতে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহারের গড় ১০০ কেজির বেশি। কিন্তু তারপরও প্লাস্টিক বর্জ্যের অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশ এখন শীর্ষ প্লাস্টিক-দূষিত দেশগুলোর অন্যতম। তথ্যমতে, প্রতি বছর বিশ্বে ৫ লাখ কোটি টন পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে।
এর মাত্র ১ শতাংশই পুনর্ব্যবহারের জন্য রিসাইক্লিং করা হয়। ‘পবার’ (পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন) তথ্যমতে, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি পলিথিন ব্যাগ জমা হচ্ছে, যেগুলো একবার ব্যবহার করেই ফেলে দেওয়া হচ্ছে।
২০০২ সালে আইন করে সারা দেশে সব ধরনের পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় (তবে রেণু পোনা পরিবহন ও পণ্যের মোড়ক হিসেবে একটু মোটা প্লাস্টিকের মোড়ক বৈধ)। আইন থাকলেও ক্রেতা-বিক্রেতা কারোরই ভ্রুক্ষেপ নেই।

দূষণ রুখবে ব্যাকটেরিয়া : আশার কথা হলো সমস্যার সমাধানে গবেষকরা এক ধরনের ‘সেলফ-ডাইজেস্টিং প্লাস্টিক’ আবিষ্কার করেন, যা ভাগাড়ে পড়লে নিজেই নিজেকে ধ্বংস করতে শুরু করবে।
আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান দিয়েগোর গবেষক হান সল কিম বলেন, এই আবিষ্কারের মাধ্যমে আমরা প্রকৃতিতে প্লাস্টিক দূষণ কমাতে পারি। সম্প্রতি পিয়ার-রিভিউড জার্নাল ন্যাচার কমিউনিকেশনে প্রকাশিত হয়েছে তাদের গবেষণা প্রতিবেদনটি। প্লাস্টিকখেকো ব্যাকটেরিয়ার স্পোর যোগ করে গবেষকরা এমন একটি প্লাস্টিক তৈরি করেছেন, যা নিজে নিজেই ধ্বংস হবে।
প্লাস্টিকের ব্যবহার উপযোগী সময়জুড়ে স্পোরগুলো সুপ্ত থাকবে। কিন্তু আবর্জনার কম্পোস্টে থাকা উপাদানের সংস্পর্শে এলেই সেগুলো আবার জীবিত হয়ে উঠবে এবং প্লাস্টিকের বস্তুটি হজম করতে শুরু করবে। পাশাপাশি, এই ব্যাকটেরিয়ার স্পোরগুলো প্লাস্টিকের দৃঢ়তাও বাড়িয়ে দেবে বলে আশা করছেন গবেষকরা। প্রকল্পের সহ-গবেষক জন পোকরস্কি বলেন, আমাদের প্রক্রিয়াটি প্লাস্টিকের উপকরণগুলো আরও কঠিন করে তোলে। এটি তার ব্যবহার উপযোগী জীবনকাল আরও বাড়িয়ে দেয়।
এরপর যখন সময় শেষ হয়, তখন আমরা এটি পরিবেশ থেকে নির্মূল করতে পারি, তা সে যেভাবেই ফেলা হোক না কেন। তিনি জানান, সেলফ-ডাইজেস্টিং’ প্লাস্টিক নিয়ে এখনো পরীক্ষাগারেই কাজ চলছে। তবে কয়েক বছরের মধ্যেই এটি বাইরের জগতে পা রাখতে পারে।
প্লাস্টিকের সঙ্গে যুক্ত করা ব্যাকটেরিয়াটি হলো ব্যাসিলাস সাবটিলিস। এটি ফুড অ্যাডিক্টিভ এবং প্রোবায়োটিক হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহƒত হয়। উল্লেখ্য, প্লাস্টিক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে ব্যাকটেরিয়ার স্পোরগুলোকে জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ারড হতে হবে।

সাবের হোসেন চৌধুরী
সমাধানে সরকারের যত পদক্ষেপ : পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে বাংলাদেশ সরকার প্লাস্টিক দূষণ মোকাবেলায় বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। প্লাস্টিক বর্জ্য হ্রাস করার লক্ষ্যে এটা ছিল একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।
যদিও আইনটির প্রয়োগে বেশ অসঙ্গতি রয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞার প্রভাবও সীমিত। সৃষ্ট ভয়াবহ অবস্থা থেকে উত্তরণে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার অর্ধেকে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা তৈরি করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
এই সময়ের মধ্যে প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদন ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা, প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানো এবং ২০২৬ সালের মধ্যে প্লাস্টিকের পুনঃব্যবহার ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়। সরকার প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে উৎসাহিত করার জন্য বেশকিছু নিয়মও চালু করেছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ২০১০ সালে চালু করা হয় ন্যাশনাল থ্রি আর (রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল) কৌশল, যার লক্ষ্য বর্জ্য উৎপাদন কমানো এবং পুনর্ব্যবহার পদ্ধতির উন্নত করা। এছাড়া, বাংলাদেশের গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, যারা প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহার করবে, তাদেরকে দূষণের জন্য দায়ী করা হবে।
সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, আমাদের ১০০ দিনের কর্মসূচিতে এক্সটেন্ডেন্ট প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটির কথা আছে। অর্থাৎ যারা প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করবে, তাদের আমরা দূষণের জন্য দায়ী করবো। এজন্য তাদের একটি অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করে দেব। উৎপাদন ও নকশায় কীভাবে তারা প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে আনবে, সেটাও বলা হবে।
সিঙ্গেল ইউজ বিবেচিত হবে যেসব পণ্য : প্লাস্টিকদূষণ থেকে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের (এসইউপি) তালিকা তৈরি করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। যেসব প্লাস্টিক পণ্য একবার ব্যবহারের পর আর কোনো কাজে লাগে না, সেগুলোই সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক হিসেবে পরিচিত।
এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এর আগে কখনো এমন তালিকা তৈরি হয়নি। এসইউপির প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও এই পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহার হ্রাসে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক হলো- স্ট্র, স্টাইরার, একবার ব্যবহারযোগ্য তৈজসপত্র বা কার্টলারি, বেলুন, আইসক্রিম বা ললিপপের সাথে ব্যবহƒত প্লাস্টিকের লাঠি/কাঠি, ১০০ মাইক্রন পুরুত্বের কম প্লাস্টিক ব্যানার, পোস্টারের প্লাস্টিক মোড়ক, বিভিন্ন পণ্যের একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের মিনিপ্যাকেট/সৌখিন ধারক, চকলেট এবং ললিপপের প্লাস্টিক মোড়ক, স্টাইরোফোমের খাবার মোড়ক বা ধারক, পাতলা প্লাস্টিকের আবরণযুক্ত ফাস্ট ফুডের মোড়ক, প্লাস্টিকের দাওয়াত কার্ড এবং প্রচারণা সামগ্রীর ওপর ব্যবহƒত থার্মাল ল্যামিনেশন, পাতলা প্লাস্টিক আবরণযুক্ত সিগারেটের প্যাকেট/টিস্যু পেপার/টয়লেট রোল/সাবানের মোড়ক, পলিইথাইলিন এবং পলিপ্রপাইলিন মিশ্রণ দ্বারা তৈরি কোনো শপিং ব্যাগ/ঠোঙ্গা/ধারক, যে কোনো পণ্যের একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের প্যাকেজিং, সিগারেট ফিল্টার, প্লাস্টিকের বোতল এবং ক্যাপ।
সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ঝুঁকির মুখে : জাতিসংঘের একটি সমীক্ষা বলছে, প্রতি বছর ৫০ লাখ থেকে দেড় কোটি টন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে। তথ্য বলছে, সমুদ্রের মোট দূষণের ৩০ শতাংশ হয়ে থাকে প্লাস্টিকের কারণে। আইইউসিএনের (প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা) সমীক্ষা জানাচ্ছে, গাড়ির টায়ার ও বিভিন্ন টেক্সটাইল কারখানা থেকে নিঃসৃত প্লাস্টিকের বর্জ্য সমুদ্র দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নদীবাহিত প্লাস্টিক দ্বারা সমুদ্রের দূষণ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের নদ-নদী দ্বারা সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ হচ্ছে। এ দূষণ শুধুমাত্র জলজ জীবনের ক্ষতি করছে না, মাছ ধরা ও কৃষিকাজের জন্য এ জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীল সম্প্রদায়ের জীবিকাকেও ব্যাহত করছে। সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র বিশেষ ঝুঁকির মুখে। প্লাস্টিক বর্জ্য সামুদ্রিক প্রাণীদের মৃত্যু এবং প্রবাল প্রাচীরের অবক্ষয় ঘটাচ্ছে।
বিভিন্ন গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বের শীর্ষ ১ হাজার নদীর মাধ্যমে আসা প্লাস্টিক, ৮০ শতাংশ সমুদ্র দূষণের জন্য দায়ী। প্লাস্টিক বেশিরভাগ স্থানান্তর হয় নদীর মাধ্যমে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যতম ভুক্তভোগী।
আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির এসিএস পাবলিকেশনসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামুদ্রিক প্লাস্টিকের ধ্বংসাবশেষের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভূমিভিত্তিক উৎস থেকে উদ্ভুত হয় এবং নদীগুলো প্লাস্টিকের ধ্বংসাবশেষের জন্য একটি প্রধান পরিবহন পথ হিসেবে কাজ করে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি নদী সমুদ্রে বৈশ্বিক প্লাস্টিকের ৮৮ থেকে ৯৫ শতাংশ পরিবহন করে।
সাগর-মহাসাগরগুলো প্রাণিকুল রক্ষার মূল উপাদান অক্সিজেন যেমন উৎপাদন করে থাকে; তেমনি ব্যাপকমাত্রায় কার্বন শোষণ করে থাকে। সমুদ্র পৃথিবীর জলবায়ুকে সহনীয় করে রাখে।
পানিচক্র, কার্বনচক্র ও নাইট্রোজেনচক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে এই সমুদ্র। বিজ্ঞানীদের গবেষণার তথ্য বলছে, সমুদ্র বৈশ্বিক উষ্ণতার ৯০ ভাগ শোষণ করে থাকে।
সে হিসেবে জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলায় মহাওষুধের মতো কাজ করে সমুদ্র। পৃথিবী নামক শরীরের রক্তপ্রবাহ বলা হয় সমুদ্রকে।
রক্তপ্রবাহে কোনো প্রকার দূষণ দেখা দিলে শরীর টিকিয়ে রাখা যেমন দুষ্কর হয়ে পড়ে; তেমনি সমুদ্রে দূষণ দেখা দিলে পৃথিবীর সমস্যা অনিবার্য।
রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া উন্নত করার দাবি : আসবাব তৈরি, গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিকভাবে প্লাস্টিকের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ১২তম প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানিকারক দেশ।
এ শিল্পের সঙ্গে লাখ লাখ কর্মসংস্থান জড়িত। প্লাস্টিক শিল্প অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্প। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো সম্ভব, তবে একবারে বন্ধ করা হয়তো সম্ভব নয়! তবে প্লাস্টিকের মতো সম্ভাবনাময় ও উৎপাদনশীল শিল্পকে রিসাইক্লিং দ্বারা এর দূষণ রোধ করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব দেশে প্লাস্টিকের রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া উন্নত, সেসব দেশে দূষণ কম। পৃথিবীর উন্নত দেশে প্লাস্টিকের দূষণ কম। অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার যত কমবে, পৃথিবী তত নিরাপদ হবে। বাংলাদেশে প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহারের নীতিমালা নেই।
প্লাস্টিকের বহুবিধ ব্যবহার দূষণকে ত্বরান্বিত করছে। যে জিনিস আগে প্লাস্টিক দ্বারা তৈরি কল্পনা করা যেত না, এখন সেটি অনায়াসেই তৈরি হচ্ছে। তথ্য বলছে, প্লাস্টিকের বহুমুখী ব্যবহার ও উৎপাদন আগামীতে বাড়বে। বলা যায়, প্লাস্টিক দূষণের মাত্রাও বাড়বে।
তাই প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার বিষয়ে এখনই চিন্তা করা দরকার। পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপ ও জনগণের মধ্যে সচেতনতাই পারে পলিথিন এবং প্লাস্টিক দূষণের হাত থেকে রেহাই দিতে।
বিপর্যয় ঠেকানোর আহ্বান ইউএনইপি’র : পৃথিবী ইতিমধ্যেই একটি পরিবেশগত বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে। গত ৫০ বছরে পুরো বিশ্বে মাথাপিছু ১ টনের বেশি প্লাস্টিকের বিভিন্ন পণ্য উৎপাদিত হয়েছে। যার ৯০ শতাংশের বেশি পৃথিবীর পরিবেশকে নানাভাবে বিপন্ন করে তুলেছে।
এসব ক্ষতিকর পচনরোধী বর্জ্য পরিবেশে ৪০০ থেকে ১ হাজার বছর পর্যন্ত থাকতে পারে এবং তা মাইক্রো, ন্যানো প্লাস্টিকের কণাসহ নানা ক্ষতিকর পদার্থ নিঃসরণ করে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যে ভয়ংকর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। শুধু পঞ্চাশ দশকের গোড়ার দিকে, সারা বিশ্বে প্রায় ৮.৩ বিলিয়ন টন প্লাস্টিক উৎপাদিত হয়েছে।

এই পরিমাণের অর্ধেক গত ১৫ বছরে উৎপাদিত হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে, এই সংখ্যা দ্বিগুণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতি বছর প্রায় ৮ মিলিয়ন প্লাস্টিক পণ্য ফেলে দেওয়া হয় উপকূলীয় দেশগুলোর সমুদ্রসৈকতে, যা সেখানকার বাস্তুসংস্থানকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করছে।
বিশ্বে প্রতি মিনিটে ২ মিলিয়ন প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করা হয়, যা বার্ষিক হিসেবে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন থেকে ১ ট্রিলিয়নের মধ্যে। যার মধ্যে ২৩ বিলিয়নই শুধু নিউইয়র্ক শহরে হয়। এই প্লাস্টিক বিশ্বের সমুদ্রতীরে বসবাসকারী ১.১ মিলিয়ন পাখি এবং প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারণা করা হয়, পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ পাখি এবং মাছের দেহে প্লাস্টিকের মাইক্রো কণা আছে।
জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচি (ইউএনইপি) মনে করে, যুদ্ধ, সংঘাত, মহামারি ও দুর্ভিক্ষের মতোই পরিবেশ বিপর্যয় বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিপদ। আগামী দিনগুলোয় পরিবেশবিষয়ক ইস্যুগুলোই পৃথিবীর সামনে প্রধান হয়ে দেখা দেবে। পৃথিবী ও পৃথিবীবাসীর সুস্থতা ও নিরাপত্তার জন্য দূষণ এবং আঘাতের হাত থেকে প্রকৃতির সব উপাদানকে রক্ষা করার সুপারিশ করেছেন।
তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের ব্যবহƒত প্লাস্টিকের ৩০ শতাংশ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ গড় ব্যবহার সময় মাত্র ১২ মিনিট! এতে পৃথিবীর সম্পদের বিপুল অপচয় এবং প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে গ্রহের মারাত্মক পরিণতিসহ আরও নানাবিধ প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ। ০৭ জুলাই ২০২৪ । প্রথম পৃষ্ঠা
এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে হলে আমাদের জরুরিভাবে প্লাস্টিকের ব্যাগের বিকল্প ব্যবহারের দিকে ঝুঁকতে হবে। একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ নষ্ট হতে প্রায় ২০-৩০ বছর সময় লাগে! কিছু বিজ্ঞানী বলেছেন যে, এটি ২০০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তারপরও এটি শুধু অদৃশ্য না হয়ে কেবল ছোট ছোট টুকরো হয়ে যায়, যা পরে মহাসাগর, মাছ এবং বন্যপ্রাণীর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
আরও ভয়াবহ ব্যাপার যে, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন খাবার এবং পানিতে পাওয়া যায়। সমীক্ষা বলছে, যেভাবে দূষণ বাড়ছে তাতে ২০৫০ সালে সমুদ্রে মাছের তুলনায় প্লাস্টিকের সংখ্যা বেশি হবে। এর মোকাবিলা কীভাবে হবে, তা নিয়ে নির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। কোথায় যাবে এই বিপুল বর্জ্য? সাধারণ প্লাস্টিকের ব্যাগগুলোর শতকরা ১০০ ভাগই কৃত্রিম পলিথিনের, যা জীবাশ্মের অপরিশোধিত তেল থেকে তৈরি।
এই প্রতিবেদটি লিখেছেন আশিকুর রহমান, সাদিত কবির, রিন্টু হাসান, আরেফিন বাঁধন, পারভেজ আহমেদ।
ইউডি/এআর

