মিয়ানমারে ভূমিকম্পে ১৭০ জন প্রিয়জন হারালেন এক ইমাম

মিয়ানমারে ভূমিকম্পে ১৭০ জন প্রিয়জন হারালেন এক ইমাম

উত্তরদক্ষিণ। বুধবার (২ এপ্রিল), ২০২৫, আপডেট ১৬:৩০

সাগাইং-এ একটি মসজিদে গত শুক্রবার নামাজের আযান শোনার সঙ্গে সঙ্গে শত শত মুসলিম মসজিদে ছুটে যান। তখন পবিত্র ঈদের উৎসবের মাত্র কয়েকদিন বাকি ছিল। তারা রমজানের শেষ জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলেন। সেদিন স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫১মিনিটে ৭.৭ মাত্রার মারাত্মক ভূমিকম্প আঘাত হানে।

তখন তিনটি মসজিদ ধসে পড়ে। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় মসজিদটি ছিল মায়োমা। মসজিদটির ভেতরে থাকা প্রায় সকলেই মারা যান। শত শত কিলোমিটার দূরে থাকা মায়োমা মসজিদের সাবেক ইমাম সোয়ে নেই ওও সীমান্তবর্তী শহর মায়ে সোতে ভূমিকম্প অনুভব করেন।

সোয়ে মিয়ানমারে ইমামতি করতেন। কিন্তু ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পালিয়ে থাইল্যান্ডে চলে আসেন। এখন তিনি একটি মানবাধিকার গোষ্ঠীর হয়ে কাজ করছেন। মারাত্মক সেই ভূমিকম্পের পরে তিনি জানতে পারেন তার প্রায় ১৭০ জন আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং তার প্রিয় মসুল্লিরা মারা গেছেন। যাদের বেশিরভাগই মসজিদে ছিলেন।

সোয়ে বিবিসিকে বলেন, ‘আমি প্রাণ হারানো সব মানুষের কথা ভাবি। নিহতদের সন্তানদের কথা… তাদের মধ্যে ছোট শিশুরা আছে…এই বিষয়ে কথা বলতে বলতে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারছি না।’

এলাকাটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরের জন্য পরিচিত তবে শহরগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম জনসংখ্যার বাস। সোমবার দেশটির নেতা মিন অং হ্লাইং-এর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুসারে, মসজিদে নামাজ পড়ার সময় আনুমানিক ৫০০ জন মুসল্লি মারা গেছেন।

সাগাইংয়ের প্রত্যক্ষদর্শীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, মসজিদগুলো যেখানে ছিল সেই রাস্তা, শহর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাস্তার পাশের বহু বাড়ি ধসে পড়েছে। মমায়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের কাছে সংঘটিত ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায় বহু স্থাপনা। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে মৃতদেহ উদ্ধার অব্যাহত রাখলে মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।মায়ানমারের সংঘটিত ভূমিকম্পে ২ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন।

গৃহহীন শত শত মানুষ রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছে। আবার আফটারশক হওয়ার কারণে অনেকে তাদের বাড়ি ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছে। খাদ্য সরবরাহের অভাবও রয়েছে বলে জানা গেছে। শুধুমাত্র মায়োমাতেই ৬০ জনেরও বেশি লোক চাপা পড়েছে বলে জানা গেছে। মায়োডাও এবং মোয়েকিয়া মসজিদে আরো অনেক লোক মারা গেছে। মঙ্গলবার আরো মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে কিছু মৃতদেহ একে অন্যদের হাত ধরা আবস্থায় পাওয়া গেছে।

সাবেক ইমাম সোয়ের অনেক প্রিয়জনদের মধ্যে ছিলেন তার স্ত্রীর চাচাতো ভাই। তিনি বলেন, ‘ইমাম হিসেবে তিনি ১৩ বছর কাজ করেছেন। সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা আমি সহ্য করেছি।’ সোয়ে আরো বলেন, ‘তিনি আমাদের অনেক ভালোবাসতেন। পরিবারের সবাই তাকে ভালোবাসত। এই ক্ষতি আমাদের জন্য অসহনীয়।’ তার স্ত্রীর আরেক চাচাতো ভাইও ছিলেন। মারা যাওয়া আরো ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে রয়েছেন সোয়ের সাবেক সহকারী ইমাম। ছিলেন স্থানীয় পাবলিক স্কুলের অধ্যক্ষ (মায়োমা মসজিদের একমাত্র নারী ট্রাস্টিও ছিলেন), তিনিও মারা গেছেন।

সোয়ে বলেন, যখনই তিনি সম্প্রদায়ের অন্য কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর কথা শোনেন, তখনই তিনি শোকের এক নতুন ঢেউ অনুভব করেন। যদিও তারা নিকটাত্মীয় ছিলেন না তবুও তারাই ছিলেন যারা সর্বদা আমাকে ভালোবাসতেন। আমার সঙ্গে মসজিদে এক সঙ্গে দোয়া করতেন।

তিনি বলেন, ‘পবিত্র রমজান মাসে তাদের মৃত্যু হয়েছে। সকলেই আল্লাহর ঘরে ছিলেন তখন। তাদের শহীদ হিসেবেই স্মরণ করা হবে।’ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মায়ানমারে বিপুল সংখ্যক মৃতদেহ নিয়ে মোকাবেলা করতে এই সম্প্রদায়টি হিমশিম খাচ্ছে। সামরিক জান্তা এবং প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চলমান লড়াইয়ের কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

সাগাইংয়ের মুসলিম কবরস্থানটি বিদ্রোহী পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস (পিডিএফ)-এর নিয়ন্ত্রিত একটি এলাকার কাছাকাছি এবং বেশ কয়েক বছর ধরে জনসাধারণের জন্য বন্ধ রয়েছে। ভূমিকম্পের পর সামরিক বাহিনী বৃহত্তর সাগাইং অঞ্চলের কিছু অংশে বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। সোয়ের মতে, সাগাইং শহরের মুসলিম সম্প্রদায়ের মৃতদেহগুলো মান্দালয়ে স্থানান্তর করতে হয়েছে।
তাদের মৃতদেহ মান্দালয়ের বৃহত্তম মসজিদে দাফনের জন্য রেখে দেওয়া হচ্ছে।

সোয়ে বলেন, ‘ভূমিকম্পের সময় যদি ইমাম হতাম, তাহলে আমি তাদের সঙ্গে চলে যেতাম। এটা আমি সত্যি শান্তিতে মেনে নিতাম। আমি এখন সেখানে ফিরে যেতে পারছি না। এটা ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে।’ সোয়ে কাঁদতে শুরু করলেন এবং বললেন, ‘এই মুহূর্তে আমার কাছে দুঃখজনক এবং হতাশাজনক, জীবনে আগে কখনও এমনটা অনুভব করিনি। আমি এমন একজন মানুষ যে খুব একটা কাঁদে না।’

তিনি আরো বলেন, বেশ কয়েকদিন ধরে ঘুমাতে পারেননি। তার উদ্বেগ আরো বাড়ছে কারণ তিনি এখনও মান্দালয়ে থাকা তার নিজের ভাইবোনসহ পরিবারের কিছু সদস্যের কাছ থেকে কোনো খবর পাননি। সোয়ে বর্তমানে সাগাইংয়ে উদ্ধার প্রচেষ্টার সমন্বয় সাধনে সাহায্য করছেন। তিনি ধারণা করছেন, এলাকায় কমপক্ষে ১ হাজার মুসলিম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন যাদের এখনও সাহায্যের প্রয়োজন।

দেশটিতে শক্তিশালী ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৭১৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে দেশটির জান্তা সরকার। ভয়াবহ এ ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং সবচেয়ে বিপর্যস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজ চলছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৪৪১ জন। আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৫২১ জন।

গত শুক্রবার (২৮ মার্চ) মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এর কেন্দ্র ছিল দেশটির মান্দালয় শহর থেকে প্রায় ১৭.২ কিলোমিটার দূরে এবং ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। প্রথম কম্পনের ১২ মিনিট পর ৬ দশমিক ৪ মাত্রার আফটার শক হয়।

সূত্র : বিবিসি

ইউডি/সিফাত

Taanjin

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading