বন বাঁচাতে অ্যামাজনে আদিবাসী টহল

বন বাঁচাতে অ্যামাজনে আদিবাসী টহল

উত্তরদক্ষিণ। বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫, আপডেট ১০:০০

পেরুর উকায়ালি অঞ্চলের গভীর অ্যামাজন অরণ্যে নিজেদের পূর্বপুরুষের ভূমি পাহারা দিচ্ছে কাকাতাইবো আদিবাসী গার্ডের সদস্যরা। কারও হাতে বর্শা-ধারালো ছুরি। কারও কাছে ঐতিহ্যবাহী তীর-ধনুক। একজন আবার বহন করছেন বহু পুরনো একটি শটগান। ঘন জঙ্গল পেরিয়ে, নদী অতিক্রম করে টহল দিচ্ছেন তারা। লক্ষ্য একটাই- পৃথিবীর ফুসফুসখ্যাত অ্যামাজনের ভেতরে গোপনে রোপণ করা কোকার অবৈধ আবাদ খুঁজে বের কার। এই কোকা থেকেই তৈরি হয় কোকেইন। যা তাদের ভূমি, বন ও জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। একই দৃশ্য পেরুর উত্তর অ্যামাজনের ওয়াম্পিস আদিবাসী অঞ্চলেও। অবৈধ স্বর্ণখনন ও বন উজাড় ঠেকাতে টহল দল গঠন করেছে তারাও।

সরকার পর্যাপ্ত সহায়তা না দেওয়ায় ২০২৪ সালে নিজেদের ভূখন্ড রক্ষার জন্য ‘চারিপ’ নামের স্বেচ্ছাসেবক দলটি গঠন করে তারা। বন বাঁচাতে অ্যামাজনের আদিবাসী যোদ্ধাদের এ ‘দেওয়ালে পিঠ ঠ্যাকা’ পদক্ষেপ নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরেই এভাবে নিজেদের পিতৃভূমি রক্ষা করছেন তারা। তবে সাম্প্রতিক সময়ের এ পদক্ষেপ তুলনামূলক সুসংগঠিত।

পেরু বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ কোকেইন উৎপাদনকারী দেশ। আর অ্যামাজনের বিস্তীর্ণ ও প্রায় আইনহীন অঞ্চল এখন কোকা চাষের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। আকারে টেক্সাসের চেয়েও বড় এই অঞ্চলটিতে বসবাসকারী আদিবাসীরা বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পেরুতে কোকা চাষের পরিমাণ ৪৩,০০০ হেক্টর থেকে বেড়ে প্রায় ৯০,০০০ হেক্টরে পৌঁছেছে। দেশটি বছরে আনুমানিক ৮৫০ টন কোকেইন উৎপাদন করে। যার একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক বাজারে যায়। উকায়ালিতে প্রায় ১২,০০০ হেক্টর জমিতে কোকা চাষ করা হয় বলে ধারণা করা হয়। কোকা চাষের সঙ্গে দুর্নীতি, বন উজাড় ও রক্তপাতের ঘটনাও সাধারণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ২০ জন আদিবাসী নেতা হত্যার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছয়জন কাকাতাইবো সম্প্রদায়ের। মাদকচক্র ও কাঠ চোরাচালানকারীরা প্রায়ই একসঙ্গে কাজ করে। আর যারা প্রতিবাদ করে তাদের হত্যা করা হয়। কাকাতাইবো আদিবাসী দলের এক সদস্য বলেন, ‘আমরা এখানে কোকা চাই না। কোকা মানে মৃত্যু। আমাদের জন্য, এমনকি বনের জন্যও।’ ভয়ংকর মাদকচক্রের প্রতিশোধ এড়াতে নাম প্রকাশ করেননি তিনি।

অন্যদিকে ওয়ামপিস আদিবাসীদের বিশাল প্রায় ১৩ লাখ হেক্টর ভূমি বহু বছর ধরে অবৈধ স্বর্ণখনন, কাঠ চোরাচালান ও বিভিন্ন দখলদারের আক্রমণে বিপর্যস্ত। রাষ্ট্রীয় সহায়তার ঘাটতির কারণে তারা নিজেরা চারিপ নামের একটি পাহারা দল গঠন করে। দলের সূচনার দুই মাসের মধ্যেই চারিপ বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করে। সান্তিয়াগো নদীর তীরে ভিলা গনসালো সম্প্রদায়ের কাছে অবৈধ স্বর্ণখননে জড়িত তিনজন পেরুভিয়ান পুলিশ সদস্যকে আটক করে তারা। এছাড়া চারিপ ২০২৪ সালেই সান্তিয়াগো নদী থেকে কমপক্ষে সাতটি বিশাল ড্রেজ মেশিন (নদীর তলদেশ থেকে খনিজ তোলার বড় যন্ত্র) জব্দ ও ধ্বংস করে।

এ ঘটনার পর সরকার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি পাঠায় এবং অবৈধ খনন বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। যদিও এখনো সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে চারিপের পদক্ষেপে অবৈধ খনন কিছুটা কমেছে এবং এলাকায় কিছুটা শান্তি ফিরেছে। কিন্তু সমস্যাও রয়েছে। চারিপের সদস্যরা কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯ জনেধ। পরিবার-পরিজন চালাতে না পারায় অনেকেই দল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। সক্রিয় সদস্যরা এখনো সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে জীবন ঝুঁকি নিয়ে পাহারা দিচ্ছেন। চারিপের সদস্যদের অনেকে শিক্ষার্থী বা সাধারণ গ্রামবাসী।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading