হরমুজ দিয়েই বিশ্বের শ্বাসরোধ করছে ইরান?

হরমুজ দিয়েই বিশ্বের শ্বাসরোধ করছে ইরান?

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, আপডেট ০৮:০০

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। যদিও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে ১০ দিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলাকালীন ইরান সাময়িকভাবে এই জলপথ খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে গত কয়েক সপ্তাহের অচলাবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। শুধু জ্বালানি তেল নয়, বরং উড়োজাহাজের জ্বালানি, সার এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কার্বন ডাই-অক্সাইডের সংকট তীব্র হয়ে উঠছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ ছিল। এর ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং গ্যাসের দাম বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশের বেশি। ওয়াশিংটন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যে অবরোধ আরোপ করেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন তা অব্যাহত থাকবে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তা এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে।

হরমুজ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিমান চলাচলে। বিশেষ করে এশিয়া এবং ইউরোপের দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের রিফাইনারি থেকে আসা জেট ফুয়েলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, আগামী মে ও জুন মাস নাগাদ ইউরোপে বড় ধরনের ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা ঘটতে পারে। ইতিমধ্য়েই জার্মানির লুফথানসা এয়ারলাইনস তাদের একটি সহযোগী সংস্থার কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। কারণ, জেট ফুয়েলের দাম যুদ্ধের আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দারমিত গিল এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে ৩০ কোটি মানুষ চরম খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে পড়বে। বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ ইউরিয়া এবং ৩০ শতাংশ অ্যামোনিয়া সরবরাহ করা হয়, যা সার উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল। সারের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী শস্য উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সারের এই তীব্র সংকট কেবল সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর ফলে উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে বহুগুণ। জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে ভারত, মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সার কারখানাগুলোতে উৎপাদন আংশিক বন্ধ বা কমিয়ে দিতে হয়েছে। কৃষি প্রধান এই অঞ্চলগুলোতে সারের ঘাটতি দেখা দিলে কয়েক মাসের মধ্যেই স্থানীয় বাজারে চালসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।

উন্নত দেশগুলোতেও এই সংকটের আঁচ লেগেছে ভিন্নভাবে। যুক্তরাজ্য সরকার ইতিমধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলায় জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। সার কারখানার উপজাত হিসেবে উৎপাদিত এই গ্যাস মাংস প্রক্রিয়াকরণ এবং খাদ্য সংরক্ষণের জন্য অপরিহার্য। ব্রিটিশ সরকারের আশঙ্কা, এই গ্যাসের অভাবে সুপারমার্কেটগুলোতে মাংস ও তাজা খাবারের বৈচিত্র্য কমে যেতে পারে এবং স্বাস্থ্য খাতে ভ্যাকসিন বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়তে পারে।

জাপানি সংবাদমাধ্যমগুলো বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ন্যাপথা সংকট’ হিসেবে অভিহিত করেছে। জাপান তাদের প্রয়োজনীয় ন্যাপথার ৮০ শতাংশই আমদানি করে, যার বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ন্যাপথা হলো প্লাস্টিক এবং বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম যেমন, স্টেরাইল গ্লাভস ও ডিসপোজেবল মাস্ক তৈরির প্রধান উপাদান। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় জাপানে জীবন রক্ষাকারী এসব চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির এই স্থবিরতা বর্তমান বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট মনে করিয়ে দিচ্ছে যে বিশ্বের খাদ্য, শক্তি এবং স্বাস্থ্য নিরাপত্তা মূলত কয়েকটি কৌশলগত সামুদ্রিক করিডোরের ওপর নির্ভরশীল। এই করিডোরগুলোর নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ হয়ে যাওয়া মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে স্থবির করে দিতে পারে। সাময়িক যুদ্ধবিরতি স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের অভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা থেকেই যাচ্ছে।

সূত্র: ফ্রান্স টোয়েন্টি ফোর

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading