দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা
উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, আপডেট ১৭:২৫
প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ: সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং আধুনিক কর্মবাজার
দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত ১০ বছরে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকার বেড়েছে সাড়ে ২৪ শতাংশ। প্রতিবছর উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কয়েক লাখ ছাত্রছাত্রী পাশ করে বের হচ্ছেন। কিন্তু সে তুলনায় তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। আর্ন্তজাতিক শ্রম সংস্থার আঞ্চলিক কর্মসংস্থান নিয়ে এক প্রতিবেদন বলছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বাংলাদেশে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এ অঞ্চলের ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বিশেষজ্ঞদের অভিমত-দেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা সর্বজনীন বা কর্মমুখী নয়। তাই শিক্ষার সঙ্গে কর্মের সংযোগ স্থাপন করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি কর্মহীন বিপুল এ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে সরকারের পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীর একটি বড় অংশই বেকার থেকে যাচ্ছে। এসব নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন…
এক ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ‘ট্র্যাজেডি’
রিন্টু হাসান: দেশে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ট্র্যাজেডির নাম হলো উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের মিছিল। দেশের সামাজিক ব্যাধিগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বেকারত্ব। যার কশাঘাতে জর্জরিত তরুণসমাজ। প্রতি বছরই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যে বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী কর্মসংস্থানের সন্ধানে চাকরির বিজ্ঞপ্তির পাতায় হন্যে হয়ে খুঁজছেন, তাদের বিশাল একটি অংশের কপালে জুটছে না প্রত্যাশিত কাজ। অথচ দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষ কর্মীর তীব্র অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, এদেশে চাকরির সঙ্গে শিক্ষার মিল নেই! এখনকার শিক্ষিত তরুণেরা তাদের কর্মসংস্থান নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। একজন শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে পাঁচ-ছয় বছর ধরে পড়াশোনা করে ভালো ফলাফল করার পরও নিজের পছন্দমতো চাকরি পাচ্ছেন না।
চাকরির আশায় আবার আলাদাভাবে সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করে চাকরির পড়াশোনা করতে হচ্ছে। ভালো চাকরির আশায় অনেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে চাকরির পড়াশোনার জন্য আবার কোচিংও করছেন। একজন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে রাষ্ট্রকে অনেক টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। আর সেই পড়াশোনা তথা শিক্ষার সঙ্গে যদি চাকরির মিল না থাকে তাহলে সেই বিনিয়োগ যথাযথভাবে কাজে আসে না। নিজের পছন্দের বিষয় বা পছন্দমতো চাকরি না পেয়ে অনেকে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। অনেকে আবার প্রতিযোগিতার বাজারে টিকতে না পেরে অপছন্দের চাকরি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

কিন্তু যদি নিজের নির্দিষ্ট পড়ালেখা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই চাকরি পেত বা পর্যাপ্ত চাকরির ক্ষেত্র থাকত তাহলে সে নিজের অভিজ্ঞতা ও সেরাটা রাষ্ট্রকে দিতে পারত। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যে ধরনের কর্মী দরকার সে অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে না। ফলে গ্র্যাজুয়েটরাও তাদের চাহিদামতো চাকরি পাচ্ছেন না। দুঃখের বিষয় হলো, পড়াশোনা শেষ করার পর এ দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে আলাদাভাবে চাকরির পড়া পড়তে হয়। তা না হলে ভালো চাকরি পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই! চার-পাঁচ বছর ধরে চাকরির পড়া তথা প্রস্তুতি নেওয়ার ফলে চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের জীবনের সোনালি সময় নষ্ট হচ্ছে।
কপালে জুটছে না প্রত্যাশিত কাজ
শিক্ষাবিদগণ বলছেন, তরুণরা যদি পড়াশোনা শেষ করেই বিষয়সংশ্লিষ্ট চাকরি পেত, তাহলে রাষ্ট্রকে তারা নিজের তারুণ্যদীপ্ত মেধা ও সময় দিয়ে আরো বেশি অবদান রাখতে পারত। তারা বলছেন, আমরা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যেখানে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে সার্টিফিকেট অর্জনের অশুভ প্রতিযোগিতা কয়েকগুণ বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়ছে ঠিকই, কিন্তু শিখছে কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় আজ চূড়ান্তভাবে সমাগত। দেশে বর্তমানে প্রতি তিনজন বেকারের মধ্যে একজন উচ্চশিক্ষিত। তারা বিএ কিংবা এমএ ডিগ্রি নিয়েও শোভন চাকরি পাচ্ছে না।
ফলে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও অনেকে টিউশনি, পাঠাও-উবারে ভেলিভারিম্যান, বিক্রয়কর্মী এবং এমনকি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সরকারি চাকরিগুলোতেও যোগ দিচ্ছেন। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো সর্বশেষ রেলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সবাই স্নাতক ডিগ্রিধারী। দেশে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি বিরাজ করছে। খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি ছাড়িয়েছে ১০ শতাংশ। বাংলাদেশের মানুষকে গড় আয়ের অর্ধেকের বেশি খরচ করতে হয় খাবার ক্রয়ে। বৈদেশিক মুদ্রায় সংকট চলছে, যথেষ্ট দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে না। বেসরকারি বিনিয়োগ এক দশক ধরে জিডিপির ২২-২৩ শতাংশে আটকে আছে। ফলে বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না এবং বেকারত্ব বাড়ছে।
বেকার যুবকদের মধ্যে ৩২%-ই উচ্চশিক্ষিত
হাসান ইউ খান : স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে দেশের জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৮ কোটিতে পৌঁছেছে। কিন্তু এই বিপুল জনসংখ্যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় বেকারত্ব ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে ৪.৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩.৯৫ শতাংশ। একই অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই- সেপ্টেম্বর) এই হার ছিল ৪.৪৯ শতাংশ।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা তৈরি হওয়াও এই বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৫০ হাজার, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ লাখে। একই সময়ে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৪.১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.৪৮ শতাংশ হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক হলো- শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হারও কমছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে এটি ৫০.২৭ শতাংশ থেকে কমে ৪৮.৪১ শতাংশে নেমে এসেছে, যার প্রধান কারণ নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ হ্রাস। ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে মোট পাঁচ কোটি ৮৯ লাখ ৩০ হাজার শ্রমশক্তির মধ্যে কর্মসংস্থানে ছিল পাঁচ কোটি ৬২ লাখ মানুষ- যা আগের বছরের তুলনায় কম। অর্থাৎ, কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না।

বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ১৯.৪ লাখ যুবক বেকার ছিল, যা যুব শ্রমশক্তির ৭.২ শতাংশ। এর মধ্যে ৩১.৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। ২০২৪ সালে স্নাতক পর্যায়ের বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.৫ শতাংশ- যা প্রমাণ করে, উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও কর্মসংস্থান নিশ্চিত হচ্ছে না। বাস্তবতা হলো- শিক্ষার স্তর যত বাড়ছে, বেকার থাকার ঝুঁকিও তত বাড়ছে। জাতিসঙ্ঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশন ২০২৫ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ রয়েছে (১৫-৬৪ বছর বয়সী), যা মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘জনমিতিক মুনাফা’-যা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।
উচ্চশিক্ষিত নারীদের ২০.৩৯%-ই বেকার
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সা¤প্রতিক তথ্য বলছে, উচ্চশিক্ষিত নারীরা সবচেয়ে বেশি বেকার। চাকরিদাতার চাহিদা ও প্রার্থীদের যোগ্যতার মিল না হওয়ার কারণেই উচ্চশিক্ষিত হয়েও নারীরা সবচেয়ে পিছিয়ে আছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিবিএস’র ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, উচ্চশিক্ষিত পুরুষদের ১১ দশমিক ৩১ শতাংশ বেকার হলেও নারীদের মধ্যে ২০ দশমিক ৩৯ শতাংশই বেকার থাকছেন। উচ্চ শিক্ষিতের পরে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি উচ্চমাধ্যমিক সনদধারীদের মাঝে।
শুধু উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে নয়, দেশের নিট জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সবচেয়ে বেশি বেকার নারীরা। দেশের যুবশ্রেণীর ২০ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যক্তিই কোনো ধরনের শিক্ষা, কর্ম কিংবা প্রশিক্ষণে নিয়োজিত নেই। এর মধ্যে পুরুষের হার ১৪ দশমিক ১ ও নারীদের ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ। আর নিট জনগোষ্ঠীর দুই-তৃতীয়াংশ তথা ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশই হলো নারী। অবশ্য শহুরে নারীদের ক্ষেত্রে এ হার আরো বেশি। দেশের নগরীগুলোয় বাস করা নারীদের ৭৪ দশমিক ৩ শতাংশই নিট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা গণমাধ্যমকে বলেন, দেশের চাকরির বাজারে দক্ষতা শূন্যতা থেকে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে যতটা কাজ করা দরকার, তা হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষিতরা হয়তো কাজের জন্য উপযুক্ত। কিন্তু যে ধরনের কাজ তারা চাইছে, তা হয়তো তারা পাচ্ছে না।
দক্ষ মানবপুঁজি তৈরি করতে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার
আরাফাত রহমান : শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, দক্ষ মানবপুঁজি তৈরি করতে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। সম্প্রতি ইউনিসেফ আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। বিএনপির মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেইজে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। সরকার দেশের জিডিপির পাঁচ শতাংশ শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলেও জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।

শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন
তিনি বলেন, শিক্ষা খাতের আমূল পরিবর্তন ও মানোন্নয়নে মোট জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয় করতে সরকার প্রস্তুত। মন্ত্রী আরও বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। এহছানুল হক মিলন বলেন, বিগত সরকারের আমলে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ কখনোই দেড় শতাংশের বেশি হয়নি। দক্ষ মানবপুঁজি তৈরি করতেই শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে বিএনপি সরকার। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা নিশ্চিতের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষতা বৃদ্ধিও প্রয়োজন। ডিজিটাল ক্লাসরুমের ব্যাপারে বিগত সরকার ব্যর্থ ছিল, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব ছিল। বর্তমান সরকার প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল ক্লাসরুম স্থাপনের দিকে এগোচ্ছে।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে ব্যবধান দূর করার আহ্বান
দেশে আরও উৎপাদনশীল কর্মশক্তি গঠন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদার ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যকার ব্যবধান ঘোচাতে হবে। এ জন্য সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। সম্প্রতি ‘শ্রেণিকক্ষ থেকে ক্যারিয়ার: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে সমৃদ্ধিকরণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এ কথা বলেন। সাজেদা ফাউন্ডেশন রাজধানীর একটি হোটেলে এ আলোচনার আয়োজন করে। সাজেদা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ফারুক সোবহান বলেন, বাংলাদেশ একসময় এশিয়ার বেশ কিছু দেশের চেয়ে এগিয়ে ছিল, কিন্তু এখন পিছিয়ে পড়েছে। তাদের অগ্রগতির মূল কারণ মানসম্মত শিক্ষা।’ তিনি শিক্ষার মানোন্নয়নে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আহ্বান জানান।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাহিদা ফিজ্জা কবির বলেন, বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনগোষ্ঠী থাকলেও শিক্ষা যদি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে জনমিতিক লভ্যাংশ বোঝায় পরিণত হতে পারে। গোলটেবিল আলোচনায় ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে খান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সাল খান বলেন, প্রযুক্তি শিক্ষা গণতন্ত্রীকরণের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। যখন শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ পায় এবং শিক্ষকেরা উদ্ভাবনী পদ্ধতিতে শেখানোর সুযোগ পান, তখন শিক্ষাক্ষেত্রে প্রকৃত পরিবর্তন ঘটে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের আহŸান জানিয়ে বক্তারা বলেন, তরুণ প্রজন্ম যাতে শুধু জ্ঞান নিয়েই নয়, বরং দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে কর্মজগতে প্রবেশ করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব :হারিয়ে যেতে পারে দেশের ৫৬ লাখ কর্মসংস্থান
আশিকুর রহমান : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রোবটিকস ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে দেশে প্রায় ৫৬ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সম্প্রতি ‘সরকারের অগ্রাধিকার ও শিক্ষা খাত: বাজেট ও বাস্তবতা’ শীর্ষক সংলাপে এমন মন্তব্য করেন তিনি। ভবিষ্যতের শ্রমবাজার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রোবটিকস ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে দেশে প্রায় ৫৬ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে যেতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
একইসঙ্গে নতুন প্রায় ৫০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও সেই কাজের জন্য দেশের তরুণরা প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। যে নতুন কাজ সৃষ্টি হবে, তার জন্য আমাদের যুবসমাজ প্রস্তুত নয় বলে আশঙ্কা করছি। নাগরিক প্ল্যাটফর্মেও এই আহŸায়ক বলেন, এখন শুধু শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করলেই হবে না, শিক্ষার মান ও ফলাফল নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আগে আমরা শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য আন্দোলন করেছি। এখন সময় এসেছে শিক্ষার ফলাফল নিয়ে আন্দোলন করার। শিক্ষার্থী স্কুলে ভর্তি হচ্ছে, কিন্তু সে মান নিয়ে বের হচ্ছে কিনা সেটাই এখন বড় বিষয়। তিনি জানান, নতুন সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি জোট গড়ে শিক্ষা আন্দোলনকে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।
শুধু কারিগরি মতামত দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়; এজন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রয়োজন। দেবপ্রিয় আরও বলেন, শিক্ষা আন্দোলনকে যদি রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা না যায়, তাহলে আমরা যে পরিবর্তন চাই তা অর্জন করা কঠিন হবে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের যে পর্যায়ে রয়েছে, সেখান থেকে পরবর্তী ধাপে যেতে হলে মানসম্পন্ন শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষার মানোন্নয়ন না হলে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা দূর করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দাতা গোষ্ঠীর আর্থিক সহায়তা ছাড়া দেশীয় সম্পদের ব্যবহার ও বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের আরও সুযোগ সৃষ্টির জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে দেশে প্রচুর কর্মসংস্থান হবে। এতে বেকারত্ব অনেকাংশে কমে আসবে। দেশি-বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের জন্য দেশের মধ্যে যে কোনো মূল্যে অনুক‚ল পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে, সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ গণমাধ্যমকে বলেন, সহায়তা মেলেনি তাই বেকারত্ব কমেনি ধারণাটাই ভুল। বরং বলা যায়, বিগত দুই দশকে বিদেশি ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক দেশের শিল্প ও কৃষিখাতে বিদেশি সাহায্যনির্ভর প্রজেক্টের কারণে কর্মসংস্থান আরও নষ্ট হয়েছে। আমদানি নির্ভরতাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ায় দেশের ছোট শিল্প-কারখানা ধ্বংস হয়ে গেছে। বেকারত্ব পরিস্থিতি আরও প্রকট আকার ধারণ করতো যদি দেশের জনশক্তি রপ্তানি থেকে রেমিট্যান্স আয় না হতো। তাই সরকারের এই বিদেশি সহায়তা না পাওয়ার ভাবনাটাই বদল করে অভ্যন্তরীণ শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল: ২৮ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ দ্বিতীয়
মহোসু : আর্ন্তজাতিক শ্রম সংস্থার আঞ্চলিক কর্মসংস্থান নিয়ে এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এ অঞ্চলের ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এতে ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলের ২৮ দেশের বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থান, নিষ্ক্রিয় তরুণের হার, আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, কর্মসন্তুষ্টি ইত্যাদির তুলনামূলক চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন পর্যায়ে বেকারত্বের হার কত, তাও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর পার হয়নি- এমন মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম (১ দশমিক ৮ শতাংশ)। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। যারা মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষিত, তাদের মধ্যে বেকার সাড়ে ৮ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ।

আইএলওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে দেড় যুগ আগে ২০০০ সালে সার্বিক বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১০ সালে তা ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৩, ২০১৬ ও ২০১৭ সালের হিসাবে এই হার একই থাকে (৪ দশমিক ৪ শতাংশ)। বাংলাদেশে পুরুষের ক্ষেত্রে বেকারত্ব ৩ দশমিক ৩ শতাংশ ও নারীর ক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের তরুণদের বড় অংশ আবার নিষ্ক্রিয়। তারা কোনো ধরনের শিক্ষায় যুক্ত নন, প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন না, আবার কাজও খুঁজছেন না। দেশে এমন তরুণের হার ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। মেয়েদের মধ্যে এই হার বেশি, ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি।
পরিসংখ্যান মতে, বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। আর এই বেকারদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই সম্পূর্ণ কর্মক্ষম যুবক। ১৯৯০ সালের তুলনায় বেকারের সংখ্যা প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। ১৯৯০ সালে দেশের বেকারত্বের হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০০২ সালে এ হার ছিল ৮ শতাংশ। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। স¤প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) এ প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে। পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিবেদনে বেকারের সংখ্যা বলা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৪৪ লাখ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা আরও বেশি হবে। সে ক্ষেত্রে বলা চলে দেশের এক-পঞ্চমাংশ মানুষই কর্মহীন অবস্থায় দিন কাটায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে এমডিজির ভিত্তি বছরে দেশে বেকারত্বের হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ওই বছর একশজনের মধ্যে বেকার ছিলেন মাত্র তিনজন। ২০০০-০২ সালে বেকারত্বের এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৮ শতাংশে। অর্থাৎ ১০ বছরে দেশে বেকারত্বের হার বাড়ে ৫ শতাংশেরও বেশি।
চাহিদার তুলনায় সরকারি চাকরি সৃষ্টি খুবই কম
সাদিত কবির : সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে প্রতি বছর শ্রমবাজারে ২০-২২ লাখ তরুণ গোষ্ঠী নতুন করে প্রবেশ করছে। তাদের মধ্যে ১২-১৩ লাখের দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান হয়। কিন্তু তাদের ৮৫ শতাংশ মজুরিভিত্তিক অনানুষ্ঠানিক খাতে আর বাকিরা শোভন চাকরি পায়। আর বাকি ৮-৯ লাখ জনগোষ্ঠী প্রবাসে যান চাকরির খোঁজে। দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ২০১৯-২০২৩ সাল পর্যন্ত ৩ লাখ ৫৮ হাজার ২৩৭টি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ৭১ হাজারের কিছু বেশি সরকারি চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতি বছর যত শোভন কর্মসংস্থান বা চাকরি সৃষ্টি হয়, তার চার ভাগের তিন ভাগই হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। চাহিদার তুলনায় সরকারি চাকরি সৃষ্টি খুবই কম হচ্ছে। বাংলাদেশে তরুণরা যে ধরনের শিক্ষা পাচ্ছেন এবং তারা যে কাজ করতে পারেন, সেই ধরনের কাজ সৃষ্টি হচ্ছে না। আবার যে ধরনের কাজ সৃষ্টি হচ্ছে, এখনকার শিক্ষিত তরুণরা সেই ধরনের কাজ করার দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ১১ মে, ২০২৬ । প্রথম পৃষ্ঠা
ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব তরুণদের জন্য নির্মম অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে, বেকারত্ব শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি জাতির মেধার অপচয়। হাজার হাজার মেধাবী তরুণ যখন কর্মহীন বসে থাকে, তখন তা জাতীয় অর্থনীতির চাকা স্থবির করে দেয়। সামাজিক অস্থিরতা, মাদকাসক্তি এবং অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির একটি মূল কারণ এই কর্মসংস্থানের অভাব। যখন একজন শিক্ষিত তরুণ তার জীবনের শুরুর দিকে কোনো কাজ পায় না, তখন সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে তার কর্মক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সেতুবন্ধন রচনার কোনো বিকল্প নেই। সময় এসেছে আত্মোপলব্ধির এবং পরিবর্তনের।
ইউডি/এজেএস

