ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনা: ছোট ট্রাক কেটে অ্যাম্বুলেন্স, ফিটনেস নেই বিআরটিসি বাসেরও!

ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনা: ছোট ট্রাক কেটে অ্যাম্বুলেন্স, ফিটনেস নেই বিআরটিসি বাসেরও!

উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬, আপডেট ১২:৫

ফরিদপুরের নগরকান্দায় যাত্রীবাহী বিআরটিসি বাসের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সের ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। দুর্ঘটনাকবলিত অ্যাম্বুলেন্সটির ১৭ বছর ধরে বিআরটিএ থেকে কাগজপত্র হালনাগাদ করা হয়নি। এমনকি এটি মূলত একটি ছোট ট্রাক ছিল, যেটিকে পরিবর্তন করে অ্যাম্বুলেন্স বানানো হয়। অন্যদিকে বিআরটিসি বাসটিরও দুই বছর ধরে ফিটনেস সনদ ছিল না। সরকারি বাস হলেও তিন বছর ধরে পরিশোধ করা হয়নি ট্যাক্স।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ভাঙ্গা হাইওয়ে থানায় কোন মামলা হয়নি। ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হেলাল উদ্দিন জানান, পাঁচজন নিহত হলেও এখন পর্যন্ত কেউ মামলা করেননি। নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা অসুস্থ থাকায় এখনও আসতে পারেননি। তবে দু-একদিনের মধ্যে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন।

তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুস্মিতা সাহাকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিতে সদস্যসচিব হিসেবে রয়েছেন বিআরটিএর সহকারী পরিচালক পলাশ খীসা। এছাড়া সদস্য হিসেবে আছেন হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং বুয়েটের একজন প্রতিনিধি।

দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুস্মিতা সাহা জানান, ঈদের ছুটির পর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।

তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ফরিদপুর বিআরটিএর সহকারী পরিচালক পলাশ খীসা। জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে গাড়ির নম্বর দেখে বিস্মিত হই। অ্যাম্বুলেন্সের নম্বর সাধারণত ‘ছ’ দিয়ে শুরু হয়, কিন্তু দুর্ঘটনায় পড়া গাড়িটির নম্বর ছিল ‘ঢাকা মেট্রো ঠ ১১-১২২৯’, যা মূলত একটি পিকআপ বা ছোট ট্রাকের নম্বর। পরে সেটিকে পরিবর্তন করে অ্যাম্বুলেন্স বানানো হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ২০০৯ সালের ১৫ মে মোবারক হোসেন নামের এক ব্যক্তি সর্বশেষ গাড়িটির ফিটনেস ও ট্যাক্স পরিশোধ করেন। তার বাবার নাম নুরুল ইসলাম। তিনি ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা। ধারণা করা হচ্ছে, পরে গাড়িটি একাধিকবার হাতবদল হয়েছে।

পলাশ খীসা বলেন, দুর্ঘটনায় জড়িত বিআরটিসি বাসটিরও ফিটনেস সনদ ছিল না। বাসটির ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর। এছাড়া ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বরের পর থেকে বাসটির ট্যাক্সও পরিশোধ করা হয়নি। এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। ওই কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে আমি রয়েছি। যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এদিকে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ফরিদপুর জেলা শাখার সভাপতি আবরার নাদিম ইতু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এগুলোকে দুর্ঘটনা বলতে আমি রাজি নই, এগুলো হত্যাকাণ্ড। কীভাবে ১৭ বছর কাগজপত্র ছাড়া একটি অ্যাম্বুলেন্স রাস্তায় চলতে পারে? আবার সরকারি বিআরটিসি বাসেরও তিন বছর ট্যাক্স দেয়া হয়নি, ফিটনেস নেই। এতে স্পষ্ট হয়, কর্তৃপক্ষের কোনো তদারকি নেই। এই উদাসীনতার কারণেই প্রতিদিন সড়কে প্রাণ ঝরছে।’

এর আগে রবিবার (২৪ মে) বেলা পৌনে ১১টার দিকে ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কের নগরকান্দা উপজেলার শংকরপাশা এলাকায় যাত্রীবাহী বিআরটিসি বাস ও একটি অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাদারীপুরের দুই ভাই, তাদের দুই স্ত্রী এবং অ্যাম্বুলেন্স চালকসহ মোট পাঁচজন নিহত হন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মাদারীপুর থেকে এক অসুস্থ স্বজনকে চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসছিল অ্যাম্বুলেন্সটি। পথে শংকরপাশা এলাকায় একটি ভ্যানকে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা ফরিদপুর থেকে ঢাকাগামী বিআরটিসি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে দুমড়ে-মুচড়ে যায় অ্যাম্বুলেন্সটি। ঘটনাস্থলেই মারা যান চালকসহ পাঁচজন।

স্বজনরা জানান, পরিবারের এক অসুস্থ সদস্যকে হাসপাতালে নেয়ার পথেই এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের আলমগীর হোসেন (৫৮), তার ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন (৬২), আলমগীরের স্ত্রী খুশি বেগম (৪৫), জাহাঙ্গীরের স্ত্রী মাজেদা বেগম (৫০) এবং অ্যাম্বুলেন্স চালক কাউছার হোসেন (২৫)। কাউছার মাদারীপুর সদর এলাকার শাহজাহান মাতুব্বরের ছেলে।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading