ড. ইউনূসের আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি, ঈদের মোনাজাতে কাঁদলেন রোহিঙ্গারা

ড. ইউনূসের আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি, ঈদের মোনাজাতে কাঁদলেন রোহিঙ্গারা

উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬, আপডেট ২০:৩০

ঈদ আসে, ঈদ চলে যায়। কিন্তু নিজভূমি মায়ানমারে ফেরার অপেক্ষায় থাকা লাখো রোহিঙ্গার জীবনে প্রত্যাবাসনের স্বপ্ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক মহলের নানা আশ্বাস ও কূটনৈতিক আলোচনার পরও বাস্তব অগ্রগতি না থাকায় কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বাড়ছে হতাশা ও ক্ষোভ।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে পবিত্র ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়। তবে উৎসবের আমেজের বদলে ক্যাম্পজুড়ে ছিল অনিশ্চয়তা, কষ্ট আর দীর্ঘশ্বাসের আবহ। ৯ বছর ধরে নিজ দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শরণার্থী জীবনে থাকা রোহিঙ্গাদের কাছে ঈদের আনন্দ এখন অনেকটাই ফিকে।

ক্যাম্পের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, বড়দের চোখে দুঃখ আর হতাশা থাকলেও শিশুদের কেউ কেউ নাগরদোলায় চড়ছে, খেলাধুলায় মেতে উঠছে। সীমাহীন সংকটের মধ্যেও শিশুমনে ঈদের আনন্দের কিছুটা ছাপ দেখা গেছে। রোহিঙ্গাদের আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইউনূসের সেই আলোচিত বক্তব্য। গত বছর কুতুপালং ক্যাম্প সফরকালে তিনি আঞ্চলিক ভাষায় বলেছিলেন—‘এই ঈদে না পারলেও আগামী ঈদ যেন আপনারা নিজেদের দেশে করতে পারেন, সেই দোয়া করি।’

সেই বক্তব্যের পর অনেক রোহিঙ্গা দেশে ফেরার নতুন স্বপ্ন দেখেছিলেন বলে জানান। টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘আমরা অনেক আশা করেছিলাম। মনে হয়েছিল ড. ইউনূস হয়তো আমাদের জন্য কিছু করবেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সেই আশ্বাস কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এতে আমরা খুব কষ্ট পেয়েছি।’

ক্যাম্পবাসীর অভিযোগ, কোরবানির ঈদ এলেও গত কয়েক বছর ধরে তারা সরকারের পক্ষ থেকে মাংস সহায়তা পাননি। এ ছাড়া নিজ দেশে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদ উদযাপনের স্মৃতি তাদের কষ্ট আরো বাড়িয়ে দেয়। রোহিঙ্গারা জানান, মায়ানমারে ঈদের নামাজ শেষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কবর জিয়ারত করতেন তারা। সেখানে ছিল নিজেদের বাড়ি, জমি, ব্যবসা ও গবাদি পশুর খামার। কিন্তু বর্তমানে শরণার্থী শিবিরে ত্রাণনির্ভর জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের।

কুতুপালং ক্যাম্পের বৃদ্ধ আবু তৈয়ব বলেন, ‘মায়ানমারে প্রতিবছর কোরবানি দিতাম। এখানে ৯ বছরেও একটি গরু কোরবানি দিতে পারিনি। সেখানে আমাদের কৃষিকাজ, ব্যবসা আর গরুর খামার ছিল। এখন অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করে বাঁচতে হচ্ছে।’ আরেক রোহিঙ্গা ছৈয়দ আলম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা দেশে ফেরার আশায় ছিলাম। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ক্যাম্পের কষ্টের জীবন আমাদের আরো অসহায় করে তুলেছে।’

রোহিঙ্গা নূর নবী বলেন, ‘ড. ইউনূস আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তি হওয়ায় আমরা তার কথায় বিশ্বাস করেছিলাম। মনে হয়েছিল এবার হয়তো দেশে ফেরা সম্ভব হবে। কিন্তু এখনো আমরা শিবিরেই পড়ে আছি। সে আমাদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করছে। এটি আমরা বিশ্ব নেতাদের কাছে বিচার দিচ্ছি তার এ ভুয়া কথার যেন বিচার হয়।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১৫ মাসে বাংলাদেশে নতুন করে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি। সরকারি হিসাবে দেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ হলেও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভাসানচরসহ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ১৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

এদিকে জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমারের কাছে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ ব্যক্তিকে মিয়ানমারের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এখনো প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

এদিকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘আশ্রয়শিবিরে বিভিন্ন সেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত অনেক এনজিও তহবিল সংকটে রয়েছে। এ কারণে এবার কোরবানির পশুর সংখ্যা কমে গেছে। গত বছর দেড় কেজি করে মাংস বিতরণ করা হয়েছিল। এবার উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে থাকা দুই লাখ রোহিঙ্গা পরিবারে এক কেজি করে মাংস বিতরণ করা হবে।’

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান ও নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় লাখো রোহিঙ্গা। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

নিজেদের ভিটেমাটি, আত্মীয়-স্বজন আর পুরনো জীবনের স্মৃতি বুকে নিয়ে তাই আরেকটি ঈদ কাটাচ্ছেন রোহিঙ্গারা। দেশে ফিরে নিজ আঙিনায় কোরবানি দেওয়ার স্বপ্ন এখনো তাদের কাছে দূরের বাস্তবতা।

DUD.NEWS

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading