ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা: দৌলতদিয়ায় উপচে পড়া ভিড়, ভোগান্তিহীন পারাপার

ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা: দৌলতদিয়ায় উপচে পড়া ভিড়, ভোগান্তিহীন পারাপার

উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ০২ জুন, ২০২৬, আপডেট ১৫:৩৫

পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি শেষে কর্মজীবী মানুষের কর্মস্থলে ফেরার কর্মব্যস্ততা ও চিরচেনা রূপ ফিরে এসেছে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে।

মঙ্গলবার (২ জুন) সকাল থেকেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই ঘাট এলাকায় ঢাকামুখী যাত্রী ও যানবাহনের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।

তবে বিগত বছরগুলোর মতো এবার ঘাটে এসে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে না। ঘাট কর্তৃপক্ষের আগাম প্রস্তুতি, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং পর্যাপ্ত ফেরি চলাচলের কারণে স্বস্তিতেই নদী পার হতে পারছেন সাধারণ মানুষ।

​দৌলতদিয়া ঘাট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীমুখী যাত্রী ও গণপরিবহনের উপস্থিতি ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে ছেড়ে আসা বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি তৈরি হয় ঘাট অভিমুখে। তবে সেই সারি বা জটলা বেশিক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে না। ঘাটে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই যানবাহনগুলো ফেরির নাগাল পেয়ে যাচ্ছে।

​ঘাট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঈদযাত্রা ও ফিরতি পথ নির্বিঘ্ন করতে এবার বিশেষ কিছু নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে। ঘাটে বিশৃঙ্খলা ও ওভারলোডিং এড়াতে প্রতিটি বাসে থাকা যাত্রীদের আগেই নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এরপর ফাঁকা বাসগুলোকে সিরিয়াল অনুযায়ী ফেরিতে তোলা হচ্ছে। আর যাত্রীরা হেঁটে নিরাপদে ফেরিতে উঠছেন। এই পদ্ধতির কারণে ঘাটে বাড়তি যানজট তৈরি হতে পারছে না এবং পন্টুনগুলোও নিরাপদ থাকছে।

​ঘাটের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি চোখে পড়ার মতো। প্রতিটি পন্টুন ও ঘাট এলাকায় মোতায়েন রয়েছে নৌ-পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, আনসার সদস্য এবং ঘাট সংশ্লিষ্ট স্বেচ্ছাসেবক দল।

​বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এই নৌপথে যাত্রী ও যানবাহন পারাপারের জন্য ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১৫টি ফেরি সার্বক্ষণিক চলাচল করছে। ঘাট সচল রাখা এবং ফেরির সংখ্যা পর্যাপ্ত হওয়ায় যানবাহনগুলোকে পন্টুনে এসে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে না।

​কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী বেসরকারি চাকরিজীবী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ভেবেছিলাম ঈদের পর ঘাটে এসে জটলায় পড়তে হবে। কিন্তু ঘাটে এসে দেখলাম উল্টো চিত্র। গাড়ি সরাসরি ফেরিতে উঠে যাচ্ছে। কোনো ভোগান্তি ছাড়াই নদী পার হতে পারছি, এটাই বড় স্বস্তি।

ঝিনাইদহ থেকে ঢাকাগামী যাত্রী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ​মো. আল-আমিন বলেন, ঈদের পর দৌলতদিয়া ঘাটে আসা মানেই আগে একটা বড় আতঙ্ক ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকা, গরমে সেদ্ধ হওয়া—এগুলো নিয়মিত চিত্র ছিল। কিন্তু এবার এসে অবাক হয়েছি। ঘাটে আসার পর আধা ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের বাস ফেরিতে উঠতে পেরেছে। ভোগান্তি ছাড়া এভাবে নদী পার হতে পারব, ভাবিনি।

বরিশাল থেকে সাভারগামী যাত্রী গৃহিণী ​রাবেয়া খাতুন বলেন, ছোট বাচ্চাদের নিয়ে গরমে ঘাটে আটকে থাকা সবচেয়ে কষ্টের। এবার বাস থেকে নামিয়ে আমাদের হেঁটে ফেরিতে তোলার ব্যবস্থা করায় প্রথমে একটু কষ্ট মনে হলেও, এটা আসলে অনেক নিরাপদ হয়েছে। ঘাটে কোনো হুড়োহুড়ি ছিল না, পুলিশ আর স্বেচ্ছাসেবকরাও সাহায্য করছে। শান্তিমতোই নদী পার হতে পারছি।

মাগুরা থেকে গাজীপুরগামী মোটরসাইকেল চালক ​রাসেল মাহমুদ বলেন, ​মোটরসাইকেলের জন্য এবার ঘাটে আলাদা শৃঙ্খলা লক্ষ্য করলাম। কোথাও কোনো জটলা তৈরি হতে দেওয়া হচ্ছে না। ফেরির সংখ্যা বেশি থাকায় ঘাটে এসে আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে না। তবে অতিরিক্ত রোদের কারণে গরমে কিছুটা ক্লান্তি লাগলেও ঘাটের অব্যবস্থাপনাজনিত কোনো ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি।

​বাস চালক মো. মানিক বলেন, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার ঘাটের সার্বিক ব্যবস্থাপনা অনেক ভালো। ফাঁকা গাড়ি ফেরিতে তোলার যে নিয়ম করা হয়েছে, তাতে ঘাটের জ্যাম অনেক কম। সিরিয়াল অনুযায়ী দ্রুত গাড়ি পার হতে পারছে। প্রশাসন ও ঘাট কর্তৃপক্ষ এভাবে তৎপর থাকলে আমাদের চালক এবং যাত্রী উভয়েরই কষ্ট অনেক কমে যায়।

বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরা ঢাকামুখী মানুষ ও যানবাহনের চাপ কিছুটা বেড়েছে। তবে দৌলতদিয়া প্রান্তে কোনও ভোগান্তি নেই। বর্তমানে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ছোট-বড় ১৫টি ফেরি যানবাহন পারাপারে চলাচল করছে।

তিনি আরও বলেন, দৌলতদিয়ার ঘাট ব্যবস্থাপনা তদারকি করতে ঈদের পরে ২৯ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি টিম ঘাটে অবস্থান করছিল। তারা সার্বিক বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করেছে। ওই টিম চলে যাওয়ার পর নতুন করে বিআইডব্লিউটিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নের্তৃত্বে তিন সদস্যের আরেকটি টিম ঘাটে এসেছে। তারাও ঘাটের সার্বিক বিষয়ে তদারকি করবে।

দৌলতদিয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (ওসি) ত্রিনাথ সাহা বলেন, ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে আমরা সার্বক্ষণিক দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় কাজ করছি। আমাদের নৌপথে স্পিডবোট নিয়ে টহল টিম কাজ করছে। ফেরি ঘাটের পন্টুন ও লঞ্চ টার্মিনালে নিরাপত্তার জন্য আমাদের একটি কন্ট্রোল রুম খোলা আছে। আমরা ঘাট এলাকায় জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য হ্যান্ড মাইক দিয়ে মাইকিং করছি পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত আছি।

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading