ট্রাম্পের ইরান পরিকল্পনা নিয়ে অন্ধকারে ‘বন্ধু’ নেতানিয়াহু

ট্রাম্পের ইরান পরিকল্পনা নিয়ে অন্ধকারে ‘বন্ধু’ নেতানিয়াহু

উত্তরদক্ষিণ। শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, আপডেট ১৫:৫৮

ইরানে হামলার পরিকল্পনা আগেই জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই পরিকল্পিত হামলা বন্ধের নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে জানান, আমেরিকা যুদ্ধের অবসানে একটি প্রাথমিক চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ইরানের নেতারা একটি খসড়া চুক্তির ‘অনুমোদন’ দিয়েছেন।

ট্রাম্প হঠাৎ ইরানে পরিকল্পিত হামলা থামানোয় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘অবাক’ হয়েছেন বলে জানা গেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদন মতে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা সম্পর্কে নেতানিয়াহু কার্যত অন্ধকারে রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য খসড়া চুক্তি সম্পর্কে তাকে কিছুই জানানো হয়নি। এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টায় ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের ফোন করছেন নেতানিয়াহু।

ইরানে একযোগে যুদ্ধ শুরু করা দুই ‘বন্ধুর’ মধ্যে মতবিরোধের খবরটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন আমেরিকা ও ইসরাইলের স্বার্থ ভিন্ন পথে এগোচ্ছে। একদিকে ট্রাম্প নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে পেট্রোলের দাম নিয়ন্ত্রণে আনার ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে সংঘাতের নিষ্পত্তি করতে চাইছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু, যিনি চলতি বছর নির্বাচনের মুখোমুখি হচ্ছেন, তিনি যুদ্ধ শুরুর সময়ে নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য চাপের মধ্যে রয়েছেন।

ট্রাম্প যা বলেছেন:
আমেরিকা ও ইসরাইল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ব্যাপক হামলা চালায়। জবাবে ইরান ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালায় এবং বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেয়।

এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে প্রায়শই গোলাগুলি ও হামলা-পাল্টা হামলা চলতে থাকে। চলতি সপ্তাহেও দুই দফা পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্প একটি সম্ভাব্য চুক্তির ব্যাপারে বারবার আশাবাদী বার্তা দিয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) নিজের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প এক ঘোষণায় জানান, ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে আলোচনা ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছে অনুমোদিত হওয়ায় আমি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আজ সন্ধ্যায় ইরানের বিরুদ্ধে নির্ধারিত হামলা ও বোমা হামলা বাতিল করেছি।’

তিনি দাবি করেন যে, আলোচনা এবং চূড়ান্ত বিষয়গুলো ধারণাগত ও বিশদ উভয় দিক থেকেই আমেরিকা, ইসরাইল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান, মিশরসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ অনুমোদন দিয়েছে। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করার আগে ট্রাম্প ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, কাতারের আমির তামিম আল-থানি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।

ইসরাইল যা বলেছে:
এর কিছুক্ষণ পরই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে বলা হয়, তেল আবিব ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের কোনো পক্ষ নয়।

তবে এতে আরও বলা হয় যে, নেতানিয়াহু ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করেছেন যে, আলোচনার ফলস্বরূপ চূড়ান্ত চুক্তিতে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো ভেঙে ফেলা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা এবং এই অঞ্চলে ইরানের ‘সন্ত্রাসী প্রক্সি’দের প্রতি সমর্থন বন্ধ করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’

যুদ্ধে উভয়ের ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য:
হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর ট্রাম্প মূলত ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে তার সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মোকাবিলায় ‘বন্ধু’ নেতানিয়াহুর কৌশলকেই গ্রহণ করেছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই ইরানের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেন।

কিন্তু শিগগিরই এটা স্পষ্ট হতে শুরু করে যে, এই যুদ্ধে উভয়েই ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন। ট্রাম্প যেখানে ভেনিজুয়েলার মতো একটি দ্রুত বিজয় চাইছিলেন, সেখানে নেতানিয়াহু চাইছিলেন ইরান এবং হিজবুল্লাহর মতো তার সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পরাজিত করতে, এমনকি এর জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রয়োজন হলেও।

এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরান যখন প্রচণ্ড বোমাবর্ষণ সহ্য করতে থাকল এবং হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বাণিজ্য পথে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেল, তখন আমেরিকান ও ইসরাইলিদের মধ্যে হতাশা বাড়তে থাকে — তবে ভিন্ন ভিন্ন কারণে।

ট্রাম্পবিরোধীরা আমেরিকায় তেল ও অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য যুদ্ধকে দায়ী করেন এবং একই সাথে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে আমেরিকাকে মধ্যপ্রাচ্যে আরেক জটিল সংকটে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। ট্রাম্প এই সমালোচনাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ক্রমবর্ধমান এই ক্ষোভ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দলের জেতার সম্ভাবনাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

এদিকে নেতানিয়াহুর শাসনামলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর সংঘটিত হামাসের আকস্মিক হামলার ফলে সৃষ্ট সংঘাতে স্থায়ী বিজয় অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় ইসরাইলিদের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে লাগাতার অস্থিরতার পরও হামাস এখনও গাজার কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এদিকে হিজবুল্লাহ লেবানন থেকে রকেট নিক্ষেপ করছে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অক্ষত রয়েছে।

দেশে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত করতে নেতানিয়াহু বারবার দেখিয়েছেন যে, তিনি ট্রাম্পকে অগ্রাহ্য করতে এবং মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে উত্তপ্ত করার ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত। এর একটি উদাহরণ গত সপ্তাহে দেখা গেছে, যখন ট্রাম্প নিষেধ করা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু ইরানের ওপর হামলার নির্দেশ দেন। যা ‘বন্ধু’ ট্রাম্পকে যারপরনাই হতাশ করেছে।

নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের হতাশাও মাঝে মাঝে প্রকাশ্যেও এসেছে। গত সপ্তাহে একটি উত্তপ্ত ও গালিগালে ভরা ফোন কলে ট্রাম্প লেবাননে ইসরাইলের আগ্রাসন জোরদার করার জন্য নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করেন। নিউইয়র্ক পোস্টের একটি পডকাস্টে কথা বলার সময় ট্রাম্প স্বীকার করেন যে, তিনি নেতানিয়াহুকে ‘ফাকিং ক্রেজি’ তথা বদ্ধ উন্মাদ বলে আখ্যা দেন এবং এমনকি তাকে অকৃতজ্ঞ বলেও অভিযুক্ত করেন।

অ্যাক্সিওসের একটি প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে আসে। বলা হয়, ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর ‘ভীষণ রেগে’ যান এবং তাকে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি এসব কী করছো?’ মার্কিন নেতা বলেন, ‘আমি না থাকলে তুমি জেলে থাকতে। আমি তোমার জীবন বাঁচাচ্ছি। এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে। এই কারণে সবাই ইসরাইলকে ঘৃণা করে।’

নেতানিয়াহুর উভয় সংকট:
ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে পূর্বসূরি প্রেসিডেন্টদের চেয়ে নেতানিয়াহুকে আরও জোরালো সমর্থন দিয়েছেন। যেকোনো পরিস্থিতিতে ‘বন্ধু’র পক্ষে থাকার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন; যেমন—নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও চলমান বিচারের বিরোধিতা করা, অবৈধ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের কার্যকলাপের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং অস্ত্র হস্তান্তরের ওপর বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের বাধা অগ্রাহ্য করা।

কিন্তু যুদ্ধ শেষ করার ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সদিচ্ছা ইহুদি নেতা নেতানিয়াহুকে ক্রমশ এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। একদিকে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ইসরাইলের দাবিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে চলতি বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগে দেশের অভ্যন্তরীণ জনমতকেও সামাল দিচ্ছেন।

সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, অধিকাংশ ইসরাইলি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে এবং তাদের বেশিরভাগই বিশ্বাস করে যে দেশটি তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। গত মাসে ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফলে মাত্র ৩৭ শতাংশ মানুষ সন্তুষ্ট।

তথ্যসূত্র: অ্যাক্সিওস ও এনডিটিভি

ইউডি/রেজা

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading