সংসদে বাজেট, সীমান্ত হত্যা ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, আপডেট ১৮:৫৯
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দল ও সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাগবিতণ্ডা এবং উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে। নোয়াখালী-৬ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের বাজেট সমালোচনা এবং প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতাকে নিয়ে করা কিছু মন্তব্যের পরিপ্রক্ষিতে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
রবিবার (২১ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ১১তম দিনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে বাজেট, সীমান্ত হত্যা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সংসদীয় রীতিনীতি নিয়ে সদস্যরা পর্যায়ক্রমে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
সংসদ অধিবেশনে বাজেটের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট বর্তমান নতুন বিএনপি দলীয় সরকারের একটি আকাঙ্ক্ষার দলিল হলেও বাংলাদেশের বাস্তব পরিকল্পনার কোনো দলিল নয়। বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা পূরণ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না। সরকার রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৭.৯ শতাংশ ধরলেও গত বছর তা ছিল ৪.৪ শতাংশ। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি থাকবে এবং প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে, অথচ ব্যাংকিং খাতে এখন সর্বোচ্চ নিট ঘাটতি চলছে।
তিনি বলেন, করমুক্ত আয়সীমা মাত্র ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে, যা ঢাকা বা এর আশপাশে বসবাসকারী মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করবে।
খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে এডিপি বরাদ্দ হ্রাস পাওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ১০ টাকার পণ্য ৭০ টাকায় রূপান্তরিত হচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে আব্দুল হান্নান মাসউদ বিগত সরকারের আমলের নামকরণের রাজনীতির সমালোচনা করে বলেন, ২০২৪ পরবর্তী সংসদে এসে আমরা একটা খ্যাতির বিড়ম্বনা দেখতে পাচ্ছি। অতীতে শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে এমনটি দেখা গিয়েছিল, যার নামে সবকিছু নামকরণ করা হতো। বর্তমানে আমাদের এই সংসদের একজন প্রতিমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও একই বিড়ম্বনা দেখা যাচ্ছে, যেখানে উনার অজান্তেই ১০-১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়নের নাম উনার পরিবারের নামে হয়ে যাচ্ছে।
সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করে বলেন, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের মতো বর্তমান সংসদের কোনো কোনো মন্ত্রীও একই ভাষায় কথা বলছেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন সব সীমান্ত হত্যাকে সীমান্ত হত্যা বলা যাবে না। তিনি একে সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে অভিহিত করেন।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে মব কালচার, শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও ডাকাতির ঘটনার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করেন এবং অভিযোগ করেন যে, বাজেট ঘোষণার পরদিনই বাজারে চাল ও তেলের দাম বেড়ে গেছে।
সংসদ নেতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ভাষণে অসত্য তথ্য দিয়ে বিরোধী দলের আন্দোলনের সমালোচনা করেন এবং ব্যাংক ঋণ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ঋণ নেওয়াকে উৎসাহিত করেন। যা অত্যন্ত আশাহত করার মতো।
আব্দুল হান্নান মাসউদের এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদিন ফারুক পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, আমরা এই সংসদকে কার্যকর করার জন্য একটি সম্মতিতে এসেছি, সংসদে কোনো অসত্য বাক্য উত্থাপন করা হবে না বা এমন কোনো কথা বলা হবে না যাতে মান-সম্মান হানি হয়। জুলাই আন্দোলনের নেতা এবং নোয়াখালীর এই সংসদ সদস্য, সংসদ নেতাকে নিয়ে যে বক্তব্য রেখেছেন, তাতে আমরা খুবই ক্ষুব্ধ। আমাদের সরকার কোনো লুটের ভোটে বা হুন্ডা-গুন্ডার ভোটে গঠিত হয়নি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান আমাদের নেতা। দীর্ঘ ১৬ বছর দেশের মানুষের গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের জন্য সংগ্রাম করে সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছেন। তাই সংসদ নেতাকে নিয়ে যে অসত্য কথা বলা হয়েছে, তা সংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ বা প্রত্যাহার করার জন্য স্পিকারের কাছে বিনীত অনুরোধ।
জয়নাল আবেদিন ফারুকের বক্তব্যেও পর বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্য ঢালাওভাবে অসত্য বলেছেন এমন দাবি না করে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে হবে কোন তথ্যটি ভুল ছিল। তিনি মূলত সংসদ নেতার বক্তব্যের প্রেক্ষিতেই নিজের মতামত প্রকাশ করেছেন। সংসদ নেতার সমালোচনা করার অধিকার বিরোধী দলের রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীও মানুষ এবং বক্তব্য দেওয়ার সময় উনারও ভুল বা ‘স্লিপ অব টাং’ হতে পারে। আমরা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছি এবং কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদের দিকে ফিরে যেতে চাই না।
তাই স্পিকারকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
এরপর স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমাদের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন ফারুক যে কথাটি বলেছেন তা সম্পূর্ণ সত্য ও সঠিক। নোয়াখালীর সংসদ সদস্য তার বক্তব্যে সুনির্দিষ্টভাবেই সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অসত্য বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের আচরণের সমালোচনা করে বলেন, আপনারা ফ্যাসিবাদের কথা বলেন, অথচ ফ্যাসিস্টসুলভ আচরণ আপনাদের মাঝেই দেখা যাচ্ছে।
মন্ত্রী স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ যে অংশটুকু অসত্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, সংসদ নেতার সম্মান রক্ষার্থে সেই বক্তব্যটুকু যেন দয়া করে কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করা হয়।
এসময় অধিবেশন কক্ষে হট্টগোল শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে স্পিকার সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদকে তার আসন গ্রহণ করার অনুরোধ জানান এবং বলেন, এটি শাহবাগ চত্বর নয়, এটি জাতীয় সংসদ। তাই সংসদের ভেতরে সংসদীয় নিয়ম ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।
স্পিকারের এমন মন্তব্যেও পর বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমাদের এই হাউজের একজন সদস্য বক্তব্য রাখতে গিয়ে সংসদ নেতার ব্যাপারে কিছু মন্তব্য করেছেন। সংসদের ভেতরে একটি সংসদীয় রীতি বা ‘নর্মস’ রয়েছে এবং বাইরেরও একটা ব্যাকরণ আছে। বাইরের জবাব বাইরে দেওয়া হোক এবং সংসদের জবাব সংসদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।
তিনি স্পিকারকে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, সংসদের ভেতরে কোনটি সত্য আর কোনটি অসত্য, এই ঝগড়ায় মেতে উঠলে তা সবার জন্যই লজ্জাজনক হতে পারে। তাই কারো সম্মানের হানি না করে এই পুরো বিতর্কিত বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়াই সবার জন্য কল্যাণকর হবে।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর স্পিকার জানান, সংসদীয় রীতিনীতি অনুযায়ী সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ইউডি/রেজা

