চট্টগ্রামে বোরো মৌসুমে প্রথমবারের মতো চাল উৎপাদন ছাড়াল ১৩ লাখ টন

চট্টগ্রামে বোরো মৌসুমে প্রথমবারের মতো চাল উৎপাদন ছাড়াল ১৩ লাখ টন

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, আপডেট ০৯:০০

চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে বোরো মৌসুমে চাল উৎপাদনে নতুন রেকর্ড হয়েছে। সমাপ্ত চলতি মৌসুমে প্রথমবারের মতো ৩ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ লাখ ৭ হাজার ২৬৩ টন চাল। টানা বর্ষণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে এক হাজার ২০ হেক্টরের বেশি জমির বোরোর ফসল নষ্ট হওয়ার পরও আগের অর্থবছরের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে ৯ হাজার ৭০৭ টন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনাবাদি জমি আবাদে আনা, উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের সম্প্রসারণ, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মাঠ পর্যায়ে নিবিড় তদারকির কারণে উৎপাদনে এই অগ্রগতি দেখে গেছে।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বোরো মৌসুমে চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় বোরোর আবাদ হয় ৩ লাখ ৮৩৩ হেক্টর জমিতে এবং উৎপাদন হয়েছে রেকর্ড ১৩ লাখ ৭ হাজার ২৬৩ টন চাল। বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে ২ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমি এবং উৎপাদন বেড়েছে ৯ হাজার ৭০৭ টন।

এ মৌসুমেই প্রথমবারের মতো ৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ করেন কৃষকেরা। যদিও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায় এক হাজার ২২০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে।

এই অঞ্চলে মোট ১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৪ হেক্টর হাইব্রীড ধানের আবাদে উৎপাদন ৭ লাখ ২৮ হাজার ৯৬ টন, উফশী ১ লাখ ৪৮ হাজার ৯৬২ হেক্টরে উৎপাদন ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৭৭১ টন চাল এবং ১৯০ হেক্টর স্থানীয় জাতের ধানে উৎপাদন হয়েছে ৩৯৬ টন চালের। হেক্টর প্রতি হাইব্রীডে গড় উৎপাদন ৪ দশমিক ৮৪ টন, উফশীতে ৩ দশমিক ৮৯ টন এবং স্থানীয় জাতের গড় উৎপাদন ২ দশমিক ০৮ টন।

জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলায় হাইব্রিড, উফশি ধানের আবাদ হয় ৭০ হাজার ৯৩০ হেক্টর জমিতে, যা মধ্যে ১২ হেক্টর জমির ধান প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে নষ্ট হয়েছে। এই জমিতে উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ২০৮ টন। বছরের ব্যবধানে আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৫৬৯ হেক্টর ও ৬ হাজার ৯৫৮ টন। কক্সবাজার জেলায় উফশী, হাইব্রীড ও স্থানীয় জাতের ধানের আবাদ হয়েছে ৫৫ হাজার ৬১১ হেক্টর ও উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার ৬৫৮ টন। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে উৎপাদন ৭৯ হেক্টর জমিতে কম হলেও উৎপাদন বেড়েছে ৭ হাজার ৩৫৯ টন চালের।

ফেনী জেলায় আবাদ হয়েছে ৩১ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমিতে ও উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৩০ টন। জেলাটিতে বছরের ব্যবধানে আবাদ কমেছে ১৫ হেক্টর এবং উৎপাদন বেড়েছে ১ হাজার ৩২৩ টন। জেলায় প্রায় ৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। লক্ষীপুর জেলায় ৩৮ হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৪৩৯ টন চাল। বছরের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়েছে ৬৪০ হেক্টর এবং উৎপাদন কমেছে ৫ হাজার ১৩৬ চন চাল।

বোরো মৌসুমে এই অঞ্চলের শীর্ষ আবাদ হয় নোয়াখালীতে চলতি মৌসুমে টানা বর্ষণে নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় এক হাজার ২০০ হেক্টর জমির হাইব্রিড জাতের ধান নষ্ট হয়েছে। জেলাটিতে ক্ষতিবাদে মোট আবাদ হয় ১ লাখ ২ হাজার ৯০০ হেক্টর এবং উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯২৮ টন চালের। বছরের ব্যবধানে আবাদ ১ হাজার ১৮৬ হেক্টর এবং উৎপাদন কমেছে ৭৮৭ টন চালের। অর্থাৎ চলতি মৌসুমে জমির ধান নষ্ট না হলে জেলাটিতে ৫ লাখ টনের বেশি চাল উৎপাদন হতো। জেলাটিতে ৮৯ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধান উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৯৫৪ টন এবং উফশিতে ১৩ হাজার ২৪০ হেক্টরে উৎপাদন ৫০ হাজার ৯৭৪ টন চাল।

বিগত অর্থবছরগুলোতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে উৎপাদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ মৌসুমে ১২ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫৬ টন চাল উৎপাদন হয়। এছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২ লাখ ৪৯ হাজার ৮৯৩ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ লাখ ১৭ হাজার ৮৮৮ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১ লাখ ৭৭ হাজার টন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৯ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫০ টন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৮ লাখ ৮৪ হাজার ৫৬৯ টন চাল উৎপাদন হয়েছিল। অর্থাৎ গত ১৪ বছরে এই অঞ্চলে উৎপাদন বেড়েছে ৪ লাখ ২২ হাজার ৬৯৪ টন চালের এবং আবাদ বেড়েছে ৭৪ হাজার ৫৬৯ হেক্টর।

কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রামে অনাবাদি জমিগুলোকে আবাদের আওতায় আনার চেষ্টার কারণে প্রতিবছর রবি মৌসুমে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়ছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং উৎপাদন বাড়াতে অনাবাদি জমিগুলোকে আবাদি জমির তালিকায় সংযোগ করা হচ্ছে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে হাইব্রিড জাতের ধান আবাদের কৃষকদের আগ্রহ বেশি থাকায় কৃষি বিভাগ কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সকল ধরনের সহায়তার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রণোদনাও দিচ্ছে। কৃষকদের নিয়মিত গাইড করা, চাষাবাদে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, মাঠ ও ফসল নিয়মিত মনিটারিং করা, রোগ বালাইমুক্ত রাখতে কম ক্ষতিসম্পন্ন কীটনাশক ব্যবহারের কারণে উৎপাদন বেড়েছে।

তবে সম্প্রতি টানা ভারী বৃষ্টিপাত এবং বন্যায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, আনোয়ারা, বোয়ালখালী, ফটিকছড়িতে কৃষকের ঘরে থাকা বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বিশেষ করে বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায় মাটির ঘর বা ধানের গোলা ধসে পড়ায় বাড়িতে থাকা হাজার হাজার মন ধান বন্যার পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে বাঁশখালীর কাথরিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম বাগমারা গ্রামের বাসিন্দা মো. নাসির উদ্দিন বলেন, বন্যায় আমার ধানের গোলায় প্রায় ১৫০ মনের মতো বোরো ধান ছিলো। বাবা-মা বৃদ্ধ হওয়ায় আমরা দুইভাই পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষি কাজ করে এই ধান সারাবছর খাওয়া ও বিক্রির জন্য রেখেছিলাম। কিন্তু মাটির ঘর হওয়ায় ধানের গোলা ধসে পড়ে সব ধান নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের গ্রামের বেশীরভাগ বাড়িতে যারা এমন ধান রেখেছিলেন তারা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (চট্টগ্রাম অঞ্চল) অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, প্রতিবছর উৎপাদন বাড়াতে মাঠ পর্যায়ে কাজ চলিয়ে যাচ্ছে। বোরো ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। ১৩ লাখ টনের বেশি চালের উৎপাদন হয়েছে। তবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় কৃষি জমি নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে, টপ সয়েল কেটে ফেলা হচ্ছে সাথে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে। কৃষি জমি রক্ষায় সব দফতরের সাথে সমন্বয় প্রয়োজন। তবে সম্প্রতি বন্যায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের সরকারিভাবে কী ধরনের সহায়তা করা যায় সেই বিষয়ে আলোচনা চলছে।

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading