তদন্ত ছাড়াই মামলা ও মধ্যরাতে গ্রেপ্তার: থানার পোস্টে হয়রানির শিকার সাংবাদিক নান্নু

তদন্ত ছাড়াই মামলা ও মধ্যরাতে গ্রেপ্তার: থানার পোস্টে হয়রানির শিকার সাংবাদিক নান্নু

উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, আপডেট ২১:০০

‘তদন্ত ছাড়াই মামলা, রাতের আঁধারে গ্রেপ্তার’—এমন অভিযোগ করেছেন দিনাজপুরের বোচাগঞ্জের সাংবাদিক এহসানুল মতিন নান্নু। এরই মধ্যে থানার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে নিয়মিত মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির ছবি ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের সঙ্গে প্রকাশ করায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এতে সামাজিক ও পেশাগতভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন ওই সাংবাদিক।

এহসানুল মতিন নান্নু নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘যুগবার্তা’র বোচাগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।

সম্প্রতি বোচাগঞ্জ থানার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, “নিয়মিত মামলায় অভিযুক্ত ০১ জন ও গ্রেফতারি পরোয়ানা মূলে ০১ জন আসামিকে আদালতে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগারে প্রেরণ করা হলো।” ওই পোস্টে প্রকাশিত ছবিতে নিয়মিত মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিক এহসানুল মতিন নান্নুকেও ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে একই ফ্রেমে দেখা যায়।

সাংবাদিক নান্নুর দাবি, তিনি কোনো মাদক মামলার আসামি নন। তার বিরুদ্ধে জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় নিয়মিত মামলা করা হয়েছে।

নান্নু বলেন, “গত ২৩ জুলাই রাত ১১টার দিকে আমার বিরুদ্ধে বোচাগঞ্জ থানায় মামলা হয়েছে। মামলার বিষয়টি আমি আগে জানতাম না। শুক্রবার ভোরে পুলিশ আমাকে বাসা থেকে নিয়ে যায়। আমার দাবি, কোনো তদন্ত ছাড়াই আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

জমি সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের সঙ্গে জমি বিক্রির বায়নানামা করা হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি জমিটি রেজিস্ট্রি করে নেননি। জমিটি নেওয়ার জন্য একাধিকবার অনুরোধ করার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউপি সদস্যকেও বিষয়টি জানানো হয়েছিল। পরে গত ১৩ জুলাই ২০২৬ জমিটি অন্য একজনের কাছে বিক্রি করেন বলে দাবি করেন তিনি।

নান্নু আরও বলেন, “শখ করে জমিটি বায়না করিনি। আমার টাকার প্রয়োজন ছিল। আমি জিয়াউর রহমানকে জমিটি নেওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করেছি। স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউপি সদস্যকেও জানিয়েছি। কিন্তু তিনি সময়মতো জমিটি নেননি।”

তবে বায়নানামার কাগজপত্রে দেখা যায়, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে ১৯ লাখ টাকা মূল্যের ০.০৬৩৩ একর জমি বিক্রির জন্য বায়না করা হয়। এতে ৩ লাখ টাকা বায়না নেওয়া এবং বাকি ১৬ লাখ টাকা পরিশোধ করে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করার কথা উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমিটি অন্যত্র বিক্রি, দান বা হস্তান্তর না করার শর্তও রয়েছে।

এ বিষয়ে ৬ নম্বর রণগাঁও ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সাদেকুল ইসলাম বলেন, “বায়নানামার বিষয়টি আমি জানি। নান্নু সাহেব জমিটি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান বলছিলেন, জমি নিয়ে জটিলতা আছে এবং তার ভাইদের শনাক্ত করার বিষয় রয়েছে। এ কারণে শেষ পর্যন্ত জমিটি রেজিস্ট্রি করা হয়নি।”

এদিকে থানার ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ছবিতে নিয়মিত মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিক ও ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের একই ফ্রেমে উপস্থাপন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও পোস্টের ক্যাপশনে নিয়মিত মামলার অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্তদের আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবু একই ছবিতে তাদের উপস্থাপনের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

আইনজীবীদের মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হওয়া এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক বিষয় নয়। মামলা হওয়ার পর তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং পরবর্তীতে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণিত হতে হয়। তাই কোনো মামলার আসামিকে আদালতে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে একই ছবিতে উপস্থাপন করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে ছবির উপস্থাপনার কারণে যদি ওই ব্যক্তিকে সাজাপ্রাপ্ত বা অন্য কোনো মামলার আসামি হিসেবে ভুল বোঝার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে বিষয়টি আইনগত ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

এদিকে মামলার বাদী জিয়াউর রহমানের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিকের পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ফোন কেটে দে।

সেতাবগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মুক্তার হোসেন বলেন, “একজন সাংবাদিক যদি কোনো মামলার আসামি হয়ে থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মামলার ধরন ও ব্যক্তির আইনগত অবস্থান বিবেচনা না করে তাকে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের সঙ্গে একই ছবিতে উপস্থাপন করা কতটা যৌক্তিক, সেটি পরিষ্কার হওয়া দরকার। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।

এ বিষয়ে বোচাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, “এটি নিয়মিত মামলা ছিল। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় মামলা হয়েছে। তবে ছবির বিষয়ে আমরা পরবর্তীতে আরও সতর্ক ও সাবধানতার সঙ্গে ছবি দেওয়ার বিষয়টি দেখব।”

ইউডি/লিখন বনিক শুভ

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading