শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে বিদ্যুতের লোডশেডিং ঠেকানোর চেষ্টা
উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, আপডেট ১৯:৫৫
সংকট সামাল দিতে শিল্পে সরবরাহ কমিয়ে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে বিদ্যুতে। এতে করে গতকালের (১২ আগস্ট) তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও লোডশেডিং বন্ধ করা যায়নি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
অন্য সব খাতেই সরবরাহ কমিয়ে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিদ্যুতে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২১ জুলাই এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) বন্ধের পর থেকে ৭০০ মিলিয়নের নিচে সরবরাহ দিয়ে আসছে পেট্রোবাংলা। একই সঙ্গে কয়লা সরবরাহ কম থাকায় পটুয়াখালী কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র ও আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ঘাটতি কারণে ১২ আগস্ট ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়।
বিদ্যুতে গ্যাস বাড়িয়ে দেওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপদে রয়েছে শিল্প, সারকারখানা ও অন্যান্য খাত। ৯ আগস্ট এসব খাতে ১৫৪০ মিলিয়ন সরবরাহ দেওয়া হলেও এখন ১০০০ মিলিয়নে নেমে গেছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে শিল্পের উৎপাদনে ধস নেমে আসার শঙ্কা করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান টার্মিনাল পুরোমাত্রার চালু হলে সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরবে। এখন মোট ২০০০ মিলিয়নের মতো সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। যা বেড়ে ২৭০০ মিলিয়নের কাছাকাছি যাবে। তবে তার জন্য মার্কিন কোম্পানির ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি ২দিনের জন্য পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে। অন্যদিকে সাগর উত্তাল থাকায় ১২ আগস্ট হতে অপর ভাসমান টার্মিনাল থেকে এলএনজি খালাস করা যাচ্ছে না। যে কারণে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার উদ্বেগ বাড়ছে।
গ্যাস ঘাটতির বিষয়টি কিছুটা যান্ত্রিক ত্রুটি আর প্রকৃতিগত হলেও কয়লা সংকটের বিষয়টি পুরোপুরি আর্থিক দৈন্যতা। যথাসময়ে পেমেন্ট না পাওয়ায় কয়লা আমদানি ব্যহত হচ্ছে। মাতারবাড়ি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রাকসমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের সাগর বছরে কমপক্ষে ২ দফায় উত্তাল থাকে। এছাড়া বৃষ্টি হলেও জাহাজ থেকে কয়লা খালাস বন্ধ থাকে।
এসব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে হলে কমপক্ষে ৪৫দিনে থেকে ৬০ দিনের কয়লার মজুদ রাখতে বলা হয়। কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্রেই সেই পরিমাণ মজুদ নেই। রুরাল পাওয়ার কোম্পানির পটুয়াখালী বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মজুদ রয়েছে মাত্র ৩৭ হাজার টন। এই কয়লা দিয়ে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪দিন চালু রাখা সম্ভব। সর্বোচ্চ পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ২০ দিনের মতো (১ লাখ ৭৫ হাজার টন) মজুদ রয়েছে বলে জানা গেছে।
আগের দিনের তুলনায় গ্যাস দিয়ে উৎপাদন বেড়ে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫ টায় ১৪ হাজার ৮৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। তারপরও সারাদেশ থেকে লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। রাতে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ওই পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে গেলে দৈনিক কমপক্ষে ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ ছাড়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে বিপিডিবি। কারণ তাদের গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎউৎপাদন করতে পারে। সেখানে গতকাল উৎপাদন পাওয়া গেছে মাত্র ৪ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি সামাল দিয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে গিয়ে ত্রাহী অবস্থা বিপিডিবির। গ্যাস দিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে (জ্বালানি খরচ) খরচ হয় ৩.৬০ টাকা, কয়লায় প্রায় ৬ টাকা আর ফার্নেস অয়েলে প্রায় ২২ টাকা। এতে করে ঘাটতি আরও বেড়ে যাওয়া নিশ্চিত বলা যায়।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই।
মন্ত্রী বলেন, ‘এইটুকুই বলতে চাই, আমরা কাজ করছি। এই ক্রাইসিসের সময় আসলে এখন আমার কিছু করার নাই। কারণ, এখন আমি গ্যাসও উত্তোলন করতে পারব না বা উইদাউট এফএসআরইউ আমার যে গ্যাস আছে, সেটাও নামাতে পারব না। নতুন করে হঠাৎ গ্যাস উত্তোলন করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি এফএসআরইউ সচল না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান গ্যাস খালাস করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়াও সম্ভব নয়।
ইউডি/রেজা

