সাতক্ষীরায় ৩ মাসে ১৩৬ জনের অপমৃত্যু: ৬৮৪ অপরাধের ঘটনা
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, আপডেট ১৬:২৯
চলতি বছর মে থেকে জুলাই পর্যন্ত এই তিন মাসে সাতক্ষীরা জেলায় অন্তত ৩৩টি মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটেছে।
সাতক্ষীরা জিআরও অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, তিন মাসে জেলার আটটি থানায় ৬৮৪টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। অপরাধগুলোর মধ্যে ডাকাতি ১, ডাকাতির প্রস্তুতি ৩, দস্যুতা ৩, খুন ৯, দ্রুত বিচার আইনে ৫, ধর্ষণ ২১, বিভিন্নভাবে নারী নির্যাতন ৫০, শিশু নির্যাতন ৭, অপহরণ ৬, সিধেল চুরি ১১, গবাদিপশু চুরি ৩, গাড়িচুরি ৩, অন্যান্য চুরি ১৩, সড়ক দুর্ঘটনায় ৫টি মামলা, পর্নোগ্রাফি আইনে ৪টি, সাইবার নিরাপত্তা আইনে ৫টি, অস্ত্র আইনে ৩টি, চোরাচালান আইনে ১২টি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ২৫১টি, চেতনানাশক খাতে ৪টি এবং অন্যান্য খাতে ৩৪২টি অপরাধে মামলা হযেছে। এর আগের তিনমাসে জেলায় ৬৩২টি অপরাধে মামলা হয়েছিল। মে মাসে জেলায় নিষ্পত্তিঅন্তে নারী, শিশু, মানবপাচার ও পিটিশন মিলে মোট বিচারাধীন মামলা ছিল ৪হাজার ৩২১টি, জুন মাসে তা ৪হাজার ৩২৭টিতে এবং জুলাই মাসে দাঁড়ায় ৪হাজার ৩৩৭টিতে।
মে থেকে জুলাই এই তিনমাসে জেলায় অপমৃত্যু হয়েছে ১৩৬জনের। এরমধ্যে মে মাসে ৪৯, জুন মাসে ৪৪ এবং জুলাই মাসে ৪৩ জনের অপমৃত্যু হয়। একই সময়ে জেলায় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে ৬৫টি। এরমধ্যে মে মাসে ২৬, জুন মাসে ২২ এবং জুলাই মাসে ১৭ জনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন-(এমএসএফ) এর সহযোগিতায় উত্তরণ-ডিএইচআরএনএস প্রকল্পের আওয়াতায় শনিবার বিকেলে ত্রৈমাসিক সভায় এই তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এমএসএফ-এর সেক্রেটারিয়েল সাপোর্ট স্টাফ অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ মুনিরুদ্দীন এই রিপোর্ট পেশ করেন।
অনুষ্ঠানে বিগত ৩ মাসে ঘটে যাওয়া ঘটনার উপর রিপোর্ট পেশ করা হয়।
সভায় ডিস্ট্রিক্ট হিউম্যান রাইটস নেটওয়াক কর্তৃক অর্জনকৃত রিপোর্ট এবং সাতক্ষীরা বিভিন্নভাবে নিরীহ ও সাধারণ মানুষকে হয়রানী ও নির্যাতনের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরা হয়।
প্রধান অতিথি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি আমাদের কাজকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি করে তুলেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার তথ্য অনুযায়ী রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনী, সংখ্যালঘু নির্যাতন অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার, এবং নারীর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালের এপিল মে জুন ৩ মাসে মবের মাধ্যমে ১৯৬টি ঘটনায় ৮৬ জন নিহত এবং ২৪৬জন আহত হয়েছেন। একইভাবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর ধারাবাহিক হামলা এবং সহিংসতার ঘটনাও আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে নেটওয়ার্ককে মানবাধিকার লঙ্ঘন মনিররিং, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট করা, প্রতিবাদ সংগঠিত করতে হবে।
সভায় স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় খবরের সূত্র তুলে ধরে বলা হয় সাতক্ষীরা জেলায় মে থেকে জুলাই এই তিন মাসে মোট ৬৮ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি আহত এবং সুন্দরবনে মাছ ধরার সময় মুক্তিপণের দাবিতে ৩২ জন জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠন ‘উত্তরণ’-এর ডিস্ট্রিক্ট হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার নেটওয়ার্ক (ডিএইচআরএনএস) প্রকল্প থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, তিন মাসে সর্বাধিক ১৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মে মাসে ৩টি, জুনে ৫টি এবং জুলাইয়ে ৭টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত করা হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন (মে মাসে ৪ জন ও জুলাইয়ে ২ জন)। আত্মহত্যা ও মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ৯টি। এ ছাড়া বজ্রপাত ও ঝড়ে ৮ জন এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন ৭ জন। পানিতে ডুবে ৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে জুলাই মাসেই প্রাণ হারিয়েছেন ৫ জন। এ ছাড়া সাপের কামড়, ভীমরুলের আক্রমণ ও বিদেশে ড্রোন হামলায় মৃত্যু মিলিয়ে ৬ জনের প্রাণহানি নথিভুক্ত হয়। গাছ ও ছাদ থেকে পড়ে ৫ জন, কারাগারে ১ জন, পিলার ও দেয়াল চাপায় ১ জন এবং বমি করে অস্বাভাবিকভাবে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
প্রতিবেদনে সীমান্ত ও সামগ্রিক নিরাপত্তার চিত্র তুলে ধরে জানানো হয়, জুন মাসে সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে দুই বাংলাদেশি নাগরিক আহত হন। অন্যদিকে সুন্দরবন অঞ্চলে মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসে মাছ ধরার সময় মুক্তিপণের দাবিতে ডাকাতদের হাতে ৩২ জন জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন।
তথ্য বিবরণী বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেলায় প্রতি মাসে গড়ে ২২টির বেশি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহল ও মানবাধিকারকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন এইচআরডি নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব অ্যাড. মুনিরুদ্দীন।
সাতক্ষীরার ম্যানগোভ সভা কক্ষে সাতক্ষীরা ডিস্ট্রিক্ট হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার নেটওয়ার্কের অ্যাডভোকেসী সভায় সভাপতিত্ব করেন ডিস্টিক্ট হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার নেটওয়ার্ক এর আহবায়ক অ্যাড. আবুল কালাম আজাদ।
প্রধান অতিথি হিসাবে ছিলেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন এর সমন্বয়কারী সোফিয়া হাসিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য প্রদান করেন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ পরিচালক নাজমুন নাহার, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের মনিটরিং অফিসার সাহিদ মাহফুজ। অতিথি হিসাবে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য প্রদান করেন এইচআরডি নেটওয়ার্কের যুগ্ম আহবায়ক মাধব চন্দ্র দত্ত, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসার আব্দুল হামিদ, অধ্যক্ষ পবিত্র মোহন সরকার, সিনিয়র সাংবাদিক কল্যান ব্যানার্জী, জার্নালিস্ট এইচআরডি নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল, অধ্যক্ষ এ আর এম মোবাশ্বেরুল হক জ্যোতি। এ ছাড়া আরো বক্তব্য রাখেন নারী নেত্রী সাবেক কাউন্সিলর ফরিদা আক্তার বিউটি ও সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম প্রমুখ।
ইউডি/রেজা

