মানুষের দোরগোড়ায় কেন উড়ন্ত গাড়ি পৌঁছাচ্ছে না?

মানুষের দোরগোড়ায় কেন উড়ন্ত গাড়ি পৌঁছাচ্ছে না?

উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, আপডেট ০৯:০০

প্রযুক্তির দুনিয়ায় উড়ন্ত গাড়ি, কোল্ড ফিউশন বা পারমাণবিক শক্তির বিপ্লব নিয়ে মাঝেমধ্যেই নানা জল্পনা শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা এবং বাস্তবতাই প্রযুক্তির গতিপথ নির্ধারণ করে। সম্প্রতি এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে প্রখ্যাত কলামিস্ট নোয়া স্মিথ জে. স্টোরস হলের লেখা বহুল আলোচিত বই ‘হোয়ার ইজ মাই ফ্লাইং কার?’-এর সূত্র ধরে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ এবং ইঞ্জিনিয়ারিজমের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

স্ট্রাইপ প্রেসের প্রকাশিত এই বইটি রেট্রোফিউচারিজম (অতীত কল্পবিজ্ঞান)-এর বাস্তব রূপ না পাওয়ার কারণগুলো অনুসন্ধান করে। বইটিতে উড়ন্ত গাড়ি, কোল্ড ফিউশন, ন্যানোটেকনোলজি এবং পারমাণবিক শক্তির মতো প্রযুক্তিগুলোর আড়ালে থাকা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক অনীহার কথা বলা হয়েছে।

তবে নোয়া স্মিথ যুক্তি দিয়েছেন যে, কোনো প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব বলেই সমাজকে তা লুফে নিতে হবে; এমন ধারণা সবসময় সত্য নয়। প্রকৌশলীরা প্রযুক্তি তৈরি করতে ভালোবাসেন এবং সম্পদ বা সুযোগের অভাবে তারা হতাশ হন, যাকে স্মিথ ‘ইঞ্জিনিয়ারিজম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ মূলত বাস্তবসম্মত ও দৈনন্দিন চাহিদা থেকেই প্রযুক্তি গ্রহণ করে।

বইটিতে কোল্ড ফিউশনের মতো অবাস্তব বৈজ্ঞানিক ধারণাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রবণতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। ১৯৮৯ সালে দুজন রসায়নবিদ কোল্ড ফিউশনের মাধ্যমে বিপুল শক্তি উৎপাদনের দাবি করলেও পরবর্তী সময়ে জাপান, টয়োটা, গুগল এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি ডলারের গবেষণা সেই দাবির সত্যতা প্রমাণ করতে পারেনি। তা সত্ত্বেও লেখক হলের দাবি যে ষড়যন্ত্র বা প্রতিকূল পরিবেশের কারণে কোল্ড ফিউশন হারিয়ে গেছে, তাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন স্মিথ।

তার মতে, এটি ‘গ্যালিলিও ভ্রান্তি’র মতো; কেউ কোনো অসম্ভব বিষয়ের বিরোধিত করলেই সে যে গ্যালিলিও হয়ে যায় না, তার বাস্তব প্রমাণ হলো বারবার ব্যর্থ হওয়া গবেষণাগুলো। একইভাবে ন্যানোটেকনোলজির মাধ্যমে অল্প সময়ে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের আশাবাদও অতি আশাবাদী ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

মধ্য শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে যেমন সীমাহীন শক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল, সত্তরের দশকের পর থেকে মানবসমাজে মাথাপিছু শক্তি ব্যবহারের হার সেই তুলনায় স্তিমিত হয়ে পড়ে। শক্তি খাতের এই স্থবিরতাকেই পদার্থ ও প্রযুক্তির স্থবিরতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে শক্তির ব্যবহার কমলেও আধুনিক যুগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জিডিপি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার মূল চাবিকাঠি হলো ডিমেটেরিয়ালাইজেশন বা বস্তুগত নির্ভরতা কমানো। মানুষ এখন শারীরিক পণ্যের চেয়ে সেবামূলক খাত, ডিজিটাল বিনোদন এবং ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতার পেছনে বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করে। আজকের দিনে স্মার্টফোনের পর্দা বা ইন্টারনেট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এমন এক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে যে, উড়ন্ত গাড়ির চেয়ে মানুষ মুঠোফোনে সময় কাটাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

শক্তি বিপ্লবের প্রশ্নে লেখক হলের পারমাণবিক ফিশন শক্তির ওপর অন্ধ আস্থাকেও চ্যালেঞ্জ করেছেন স্মিথ। ফ্রান্সের মতো দেশগুলোতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ বড় ভূমিকা রাখলেও তা বিদ্যুৎকে পানির দামে নামাতে পারেনি। অন্যদিকে, সৌরশক্তি এবং ব্যাটারি প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য বিপ্লবকে লেখক হল এড়িয়ে গেলেও বাস্তবে চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে।

মার্কিন প্রকৌশলীরা পরিবেশবাদীদের প্রতি পুরনো ক্ষোভ ও অনুযোগ থেকে পারমাণবিক শক্তির পক্ষে সাফাই গাইলেও, চীন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সস্তা এবং কার্যকরী সৌরশক্তিকেই বেছে নিয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি খাতে মার্কিন প্রকৌশলীরা রেট্রোফিউচারিস্টিক দিবাস্বপ্নে আটকে থাকলেও বাস্তব দুনিয়া বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত এগিয়ে চলেছে।

কেন মানুষের কাছে উড়ন্ত গাড়ি পৌঁছাচ্ছে না, তার মূল কারণ হিসেবে চাহিদার সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যাতায়াতের ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত দূরত্বের জন্য সাধারণ গাড়ি এবং দীর্ঘ দূরত্বের জন্য বিমান ইতিমধ্যেই যথেষ্ট কার্যকর। এর মাঝে ১৫০ থেকে ৫০০ মাইলের দূরত্বের জন্য উড়ন্ত গাড়ি কিছুটা উপযোগী মনে হলেও মানুষ সাধারণত মুদির দোকান বা রেস্তোরাঁয় যাওয়ার জন্য প্রতিদিন এক থেকে তিন ঘণ্টা ভ্রমণ করতে রাজি নয়। তাছাড়া ইন্টারনেটের কারণে মানুষের যাতায়াতের প্রবণতাও দিন দিন কমে আসছে; বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা দুই দশক আগের তুলনায় অনেক কম পথ ভ্রমণ করে। সব মিলিয়ে, সমাজ পরিচালিত হয় মানুষের আসল চাহিদা ও উপযোগিতার ভিত্তিতে; মহাকাশ জয় বা উড়ন্ত গাড়ির রোমাঞ্চকর স্লোগান যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, প্রযুক্তির প্রকৃত ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় পিতামাতার ডায়াপার কেনার মতো সাধারণ এবং বাস্তবধর্মী প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করেই।

সূত্র: এশিয়া টাইমস

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading