জ্যোতির কি এবার অধিনায়কত্ব ছাড়ার সময়?
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, আপডেট ১৯:৫৫
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটে নিগার সুলতানা জ্যোতির অবদান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ খুব একটা নেই। ব্যাট হাতে যেমন দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তিনি, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বের ভারও সামলাচ্ছেন। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, অধিনায়ক হিসেবে তাঁর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা ততই বাড়ছে। বিশেষ করে বড় দলগুলোর বিপক্ষে বারবার একই ধরনের ব্যর্থতা সামনে আসায় নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সাম্প্রতিক এশিয়া কাপ সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। ইন্ডিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে ৪০ রানের পরাজয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় বাংলাদেশ। ম্যাচটিতে বাংলাদেশের ব্যাটিং আবারও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। প্রতিপক্ষ যখন চাপ তৈরি করেছে, তখন সেই চাপ সামলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার মতো ব্যাটিং দেখা যায়নি।
এখানেই শুধু দলীয় ব্যর্থতার বিষয়টি আটকে নেই। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা বদল এবং চাপের মুহূর্তে ক্রিকেটারদের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ঘাটতি চোখে পড়ছে। অধিনায়ক হিসেবে এসব জায়গায় জ্যোতির দায় পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এদিকে নিগারের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা হয়েছে। চলতি বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪৭ বলে ২৭ রানের ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। স্ট্রাইক রেট ছিল মাত্র ৫৭.৪৫। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এমন ধীরগতির ইনিংস দলের রান সংগ্রহের গতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে বলেই ধারনা করা হচ্ছে।
তবে জ্যোতির সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো পরিসংখ্যানও নেই। বিশ্বকাপে ইন্ডিয়ার বিপক্ষে ৩২ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও ৩২ রান করেন তিনি। পাকিস্তানের বিপক্ষে তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৩৬ রান। অর্থাৎ রান করার সক্ষমতা তাঁর রয়েছে। সমস্যা দেখা দিচ্ছে বড় ম্যাচে সেই সামর্থ্যকে দলের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের অভাব। তুলনামূলক দুর্বল দলগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশ নিজেদের সামর্থ্য দেখাতে পারলেও ইন্ডিয়া, অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের সামনে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
এর পেছনে অবশ্য শুধু অধিনায়ককে দায়ী করলে বাস্তব চিত্রটি পাওয়া যাবে না। দলের ব্যাটিং গভীরতা, আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের অভাব, পাওয়ার হিটিং এবং ফিল্ডিং সব মিলিয়েই বাংলাদেশের কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। তবে ম্যাচ যখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন মাঠের নেতৃত্ব এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। সেই জায়গাতেই জ্যোতির নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
জ্যোতিকে অধিনায়কত্ব থেকে সরানোর আলোচনা উঠলেও এর অর্থ তাঁকে দল থেকে বাদ দেওয়া নয়। বরং উইকেটরক্ষক-ব্যাটার হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা এখনও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে। নেতৃত্বের অতিরিক্ত চাপ সরিয়ে তাঁকে শুধু ব্যাটিং ও উইকেটকিপিংয়ে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ দিলে দল বরং বেশি উপকৃত হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও এখনই জ্যোতির অধিনায়কত্ব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাচ্ছে না। এশিয়ান গেমস পর্যন্ত তাঁকেই দায়িত্বে রাখার সিদ্ধান্ত রয়েছে। এরপর বাংলাদেশের সামনে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে কঠিন সিরিজ রয়েছে। সম্ভবত সেই সময়টিই হতে পারে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার উপযুক্ত সুযোগ।
নিগার সুলতানা বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন এবং দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একজন ক্রিকেটার হিসেবেই থাকবেন এমনটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু একটি দলকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে হলে সময়ের সঙ্গে নেতৃত্বের কাঠামোতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট যদি দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির পরিকল্পনা করে, তাহলে নতুন কাউকে অধিনায়ক হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা অযৌক্তিক নয়। জ্যোতির অভিজ্ঞতাকে দলের কাজে রেখে নেতৃত্বের দায়িত্ব অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়া হলে একদিকে যেমন নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে, অন্যদিকে জ্যোতিও বাড়তি চাপ ছাড়া নিজের খেলায় মনোযোগ দিতে পারবেন।
ইউডি/রেজা

