বিএনপির সাবেক এমপি মোমিনের পেছনে এবার দুদক
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন ২৫ অক্টোবর ২০১৯ঃ
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে আড়াই বছর ধরে পালিয়ে বেড়ানো বগুড়ার সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা আব্দুল মোমিন তালুকদার ওরফে খোকার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এরইমধ্যে মোমিন তালুকদার, তার স্ত্রী মাসুদা মোমিন ও দুই মেয়ে শামীমা মোমিন ও নাসিমা মোমিন মিলিয়ে চারজনের পরিবারে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের খোঁজ পাওয়ার কথা বলছে দুর্নীতি দমন সংস্থাটি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মোমিন তালুকদার এবং স্ত্রী-মেয়েদের নোটিশ পাঠিয়ে তাদের সম্পদ বিবরণী দাখিল করতে বলেছে দুদক।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, বগুড়া-৩ আসনের (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল মোমিন তালুকদারের দুই কোটি ১৩ লাখ ৯৪ হাজার ৪৩৪ টাকার সম্পদ রয়েছে। তার সর্বশেষ আয়কর রিটার্নে এক কোটি ৬০ লাখ ছয় হাজার ৬৪৪ টাকার সম্পদ দেখানো হয়, যার মধ্যে ৫৯ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯০ টাকার অবৈধ সম্পদ রয়েছে।
অর্থাৎ আব্দুল মোমিন তালুকদারের নামে এক কোটি ১৩ লাখ ২৪ হাজার ৩৮০ টাকার অবৈধ সম্পদের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়ে তাকে সম্পদ বিবরণী দালিখ করতে বলা হয়।
এছাড়া তার স্ত্রী মাসুদার নামে ৮২ লাখ ২০ হাজার ২৬২ টাকা এবং দুই মেয়ে শামীমার ৮০ লাখ টাকা ও নাসিমার নামে ৮৫ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের সন্ধান পাওয়ার কথা উঠে এসেছে দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষরে গত রোববার পাঠানো ওই নোটিশ পেয়ে ২১ কার্যদিবসের মধ্যে মোমিন ও তার স্ত্রী-মেয়েদের সম্পদ বিবরণী দাখিল করতে বলা হয়েছে।
পলাতক মোমিন তালুকদারের অবস্থান সম্পর্কে দুদক কর্মকর্তাদের কোনো ধারণা না থাকলেও তাদের ঢাকার কলাবাগান ও বগুড়ার আদমদিঘীর স্থায়ী ঠিকানায় ওই নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
আড়াই বছর ধরে পলাতক মোমিন দেশে আছেন না কি পালিয়ে গেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনও।
তার মামলা সংশ্লিষ্ট একজন প্রসিকিউটর বলেছেন, গ্রেপ্তারি পারোয়ায়ানা থাকা মোমিন তালুকদারের সীমান্ত পার হওয়ার কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তিনি ‘গা ঢাকা’ দিয়ে দেশেই আছেন বলে তাদের ধারণা। কারণ দেশ ছাড়তে গেলেই ধরা পড়তেন তিনি।
মোমিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষী ও দুপচাঁচিয়ার বাসিন্দা সারোয়ার খান বলেন, পরোয়ানা জারির পর থেকেই মোমিন তালুকদার পলাতক। তার এক মেয়ে বিদেশে থাকেন। আর ঢাকায় অপর মেয়ের সঙ্গে থাকেন মোমিনের স্ত্রী।
আট বছর আগে যুদ্ধাপরাধ মামলা
আদমদীঘি থানার কায়েতপাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ সুবেদ আলী ২০১১ সালের মার্চে বগুড়ার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তৎকালীন সংসদ সদস্য মোমিন তালুকদারের বিরুদ্ধে মামলা করলে পরে তা ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
মামলায় বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর আনুমানিক ১১টার দিকে আদমদীঘি বাজারের পশ্চিমে খারির ব্রিজের উত্তর শ্মশান ঘাটে আব্দুল মোমিন তালুকদার গুলি করে মুক্তিযোদ্ধা মনসুরুল হক তালুকদার টুলু, আব্দুস ছাত্তার, আব্দুল জলিল, আলতাফ হোসেনসহ আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেন।
২০১৭ সালের ১৮ মে যুদ্ধাপরাধের মামলায় আব্দুল মোমিন তালুকদারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এরপর ২০১৮ সালের ৩ মে তার বিরুদ্ধে ১৯ জনকে হত্যা ও গণহত্যা এবং ১৯টি বাড়ি লুট করে অগ্নিসংযোগের পৃথক তিনটি অভিযোগে তদন্ত প্রতিবেদন দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
পরে একই বছরের মে মাসেই মোমিন তালুকদারের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল।
এর মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বগুড়া-৩ আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন মোমিন তালুকদার। পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে পড়েন।
পলাতক এ আসামির বিচার চলছে
বিচারপতি শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আব্দুল মোমিন তালুকদারের বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবাতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার চলছে।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন শুক্রবার বলেন, “এ মামলায় ২৪ জন সাক্ষীর মধ্যে সাতজনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। আগামী রোববার ৮ নম্বর সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করবে ট্রাইব্যুনাল।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমাদের ধারণা, মোমিন তালুকদার দেশেই আছেন। কারণ তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তাই তিনি কোনো বর্ডার ক্রস করতে গেলে গ্রেপ্তার হবেন। তিনি কোনো বর্ডার ক্রস করেছেন বলে এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই।”
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্ত কর্মকর্তা জেড এম আলতাফুর রহমান বলেন, “এই আসামি শুরু থেকেই পলাতক। ট্রাইব্যুনাল থেকে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে। পরে রাষ্ট্র থেকে তারপক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করে এখন বিচার কাজ চলছে।”
আব্দুল মোমিন তালুকদার বগুড়া-৩ আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। নবম সংসদে নির্বাচিত হওয়ার পর বন ও পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিও হয়েছিলেন তিনি।

