অলির মঞ্চে জামায়াত নেতা, হল বিএনপিরও সমালোচনা
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন ২৬ অক্টোবর ২০১৯ ২৩:১০
কয়েক বছর ধরে প্রকাশ্য সভা-সমাবেশ থেকে বিরত থাকা জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা বক্তব্য দিলেন মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমদ নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটি পার্টি-এলডিপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে।
জামায়াতের যুগ্ম সম্পাদক সাবেক সাংসদ হামিদুর রহমান আযাদ শনিবার সন্ধ্যায় রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিউশন মিলনায়তনে এলডিপির ত্রয়োদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই সভায় সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, “চোরের মার বড় গলা। সরকার সংবিধান মানে না, সংবিধান মানলে নিশি রাতে ব্যালট ডাকাতির নির্বাচনের মাধ্যমে সাংবিধানিক অধিকার হরণ হত না। এই অনির্বাচিত সরকার দুই দুই বার আমাদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে।”
যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালে সহিংস আন্দোলন এবং ২০১৫ সালে টানা তিন মাসের অবরোধে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপসহ নাশকতার বিভিন্ন ঘটনায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানিতে চাপে পড়া জামায়াত নেতারা কয়েক বছর প্রকাশ্য সভা-সমাবেশে বক্তব্য দেননি।
এই মাসের প্রথম দিকে বুয়েটছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সভায় বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদের সঙ্গে বক্তব্য দিয়েছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির গোলাম পরওয়ার।
এরপর জামায়াতের দ্বিতীয় নেতা হিসেবে প্রকাশ্য কোনো সভায় বক্তব্য রাখলেন হামিদুর রহমান আযাদ।
এই সভাতেই জোটসঙ্গী বিএনপি নেতাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন এলডিপির এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ। ‘সরকারের সঙ্গে আঁতাত’ করার কারণে তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন করছে না বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
আর এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদ বলছেন, দেশ এখন ‘এক ধরনের দোজখে’ পরিণত হয়েছে।
আর ঘরে বসে থাকলে দেশে শান্তি ফিরবে না বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আসুন ঐক্যবদ্ধ হই দেশকে রক্ষা করি। এতে করে সরকারের বিদায় ঘণ্টার ধ্বনি শোনা যাবে।
“আমি বলতে চাই, যথাসময়ে আইন মান্য করে দলে দলে ঐক্যবদ্ধভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে এই সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য প্রস্তুতি নিন। ইনশাল্লাহ, আমরাই সফল হব।”
দেশে মাদক, ক্যাসিনো, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রদারীদের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা শুধু বড় বড় দুর্নীতিবাজদের ‘রক্ষা করার জন্য’ বলে মনে করছেন অলি আহমদ।
এই বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, “যেসব মন্ত্রী-এমপি ও তাদের পরিবার বস্তায় বস্তায় টাকা নিয়েছে, মার্সিডিজ গাড়ি নিয়েছে- তাদের নাম সুস্পষ্টভাবে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অদ্যবধি তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।”
বর্তমানে নির্বাচন কমিশন ‘বেকার ও বৃদ্ধ পুনর্বাসন কেন্দ্র’ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন ‘সরকারি দলের পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হিসেবে কাজ করছে বলে অভিযোগ করেন অলি আহমদ। ‘নিরপেক্ষ’ ব্যক্তিদের নিয়ে এই দুটি সংস্থাকে ঢেলে সাজানোর দাবি জানান তিনি।
জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদও চলমান শুদ্ধি অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অভিযানে ‘রাঘব-বোয়াল দুর্নীতিবাজদের’ ধরা হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।
সরকারের উন্নয়নকে ‘কসমেটিক’ উন্নয়ন মন্তব্য করে আযাদ বলেন, “প্রধানমন্ত্রী ভারতে গিয়ে যেসব চুক্তি করেছে তা দেশের স্বার্থবিরোধী। সাধারণ জনগণের অধিকার হরণ করা হয়েছে। ভোলায় কী ঘটেছে আপনারা জানেন। রসুল (সা.) ওপর অসম্মান করেছে, তার প্রতিবাদ জানানোর জন্য ধর্মপ্রাণ মানুষগণ রাস্তায় নামতে চেয়েছিল তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
“আবরারকে হত্যা করতে পারবেন, দেশপ্রেমকে হত্যা করতে পারবেন না। বাংলাদেশের জনগণ আজকে উত্তেজিত বিস্ফোরণমুখ অবস্থায় বিরাজমান। আপনাদের অনেক বেশি হয়ে গেছে। আরেকবার বোঝার চেষ্টা করুন। আমরা আপনাদেরকে বোঝার জন্য, পরিস্থিতি উপলব্ধি করার জন্য অনুরোধ করব। সময় পার হয়ে গেলে সামাল দিতে পারবেন না। গোটা বাংলাদেশ আজ উত্তপ্ত হয়ে গেছে।”
সরকার খালেদা জিয়াকে ‘ভয় পায়’ বলেই তাকে আটকে রেখেছে অভিযোগ করে অলির নেতৃত্বে ‘জালিমের অবসানে’ জাতীয় মঞ্চে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান জামায়াতের এই নেতা।

সভাপতির বক্তব্যে এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ বিএনপি নেতাদের সমালোচনা করে বলেন, “খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে বিএনপি রাজপথে আন্দোলন করতে পারে না। নেত্রীর মুক্তির জন্য যারা আজকে রাজপথে নামবে তাদের দলের নেতারা সরকারের সাথে আঁতাত করে কোনো আন্দোলনে যাচ্ছে না। আপনারা অভিশপ্ত নেতৃত্ব, আপনাদেরকে মানুষ কোনো দিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে না- এটুকু আমি এলডিপির মহাসচিব হিসেবে বলতে পারি।
“মওদুদ ভাই বলেন, একমাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে নেত্রীকে বের করব; খন্দকার মোশাররফ বলেন, একমাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে নেত্রীকে বের করব- নেত্রী আর কয়েক দিন পরে মারা যাবেন। আমরা মনে করি, এর দায় শেখ হাসিনাকে নিতে হবে।
“আমাদের ওই রকম শক্তি থাকলে রাজপথ কাঁপিয়ে দিতাম এবং বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার মাধ্যমে এদেশের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতাম। কিন্তু এসব কিছু মূল্যায়ন করে আমাদের নেতা অলি আহমদ বীর বিক্রম বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ ২০ দলীয় জোট ও অনেককে নিয়ে আমরা জাতীয় মঞ্চ গঠন করেছি।
“ইনশাল্লাহ আমরা আশা করি, এই বছরের মধ্যেই জাতীয় মুক্তি মঞ্চের নেতৃত্বে এই দেশ মুক্ত হবে, এই জাতি মুক্ত হবে, এই দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে, এদেশের মানুষরা আবার কথা বলার সুযোগ পাবে, সাংবাদিকরা আবার স্বাধীনভাবে লিখতে পারবে, আমরা সকলেই মাঠে-ময়দানে সকল জায়গায় কথা বলার সুযোগ পাব এবং মিছিল-মিটিং করার সুযোগ পাব।”
বিএনপির নির্বাচিতদের সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্তেরও কঠোর সমালোচনা করেন রেদায়ান আহমেদ, যিনি ওই নির্বাচনে কুমিল্লার একটি আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হয়ে পরাজিত হয়েছিলেন।
দলের যুগ্ম মহাসচিব তমিজউদ্দিন টিটোর পরিচালনায় আলোচনা সভায় কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাগপার সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, জাতীয় দলের সৈয়দ এহসানুল হুদা, এলডিপির কামাল উদ্দিন মোস্তফা, নুরুল আলম, ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল, নিয়ামুল রশীদ, কারিমা খাতুন, ইবরাহিম মিয়া, আবুল হাশেম ভুঁইয়া প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

