অপরাধীরা এখন কথিত সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী!
পেশাদার সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি এখন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার উপক্রম
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ১ নভেম্বর ২০১৯ । ১৮ঃ১০
ধারাবাহিক প্রতিবেদন : রাজধানীসহ পাশ্ববর্তী এলাকায় অনলাইন, আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা ও কথিত টিভি চ্যানেলের অভাব নেই। এর পাশাপাশি রয়েছে তথা কথিত সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠন। নাম-ঠিকানা যাই হোক আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে মানুষকে ফাঁদে ফেলে টু-পাইস আয় করা এদের উদ্দেশ্য।
তথ্যমতে- দেশের বিভিন্ন এলাকার অপরাধী, বহু মামলার আসামী, বেকার, অশিক্ষিত, কু-শিক্ষিত, ধান্দাবাজরা এখন সাংবাদিক, সাংবাদিক নেতা, মানবাধিকার কর্মী বনে গেছে। এদের দাপট দেখে মনে হয় অনেক বড় মাপের সাংবাদিক। অথচ কখনও তাদের সংবাদ বা ছবি কোন পত্রিকা বা অনলাইনে প্রকাশ পায়নি। মানবাধিকার কর্মী পরিচয়ে একটি চক্র পত্রিকার সংবাদকে পুঁজি করে তার কপি হাতে নিয়ে দারস্থ হয় ভুক্তভোগীদের কাছে। এরপর খোলস পাল্টে চলে অর্থ বাণিজ্য।
কথিত অনলাইন টিভি, আইপি টিভি, ফেসবুক টিভি এবং তার সাংবাদিকদের বিচরণও কম নয়। এরা ক্যামেরা, মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে চষে বেড়ায় দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত। এদের খপ্পরে পরে সর্বশান্ত হয় সাধারণ মানুষ।
বিভিন্ন সংঘবদ্ধ চক্র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী পরিচয়ে ভয়ংকর অপরাধ করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে নাজেহাল হয়েছেন অনেকেই। ফোনে অফিসে বা গোপন স্থানে ডেকে চাঁদা আদায় করা, ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখে ব্ল্যাক মেইল করে টাকা উপার্জ্জন করা, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, মাদক সেবনসহ নানা অপরাধ করার অভিযোগ রয়েছে এসব কথিত সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে।
রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, ঢাকা জেলার সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই, কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা এখন কথিত সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের অভয়ারণ্য। জনবহুল এ এলাকায় খুব সহজেই দাপিয়ে বেড়ানো যায় বলে এখানে বাড়ছে সাংবাদিকতার নামে অপরাধ। অনেক পতিতা, দালাল, মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারীরা পরিচয় দিচ্ছে সংবাদকর্মী হিসেবে।
ভুয়া সাংবাদিকেরা বিভিন্ন প্রতারণার ফাঁদ পেতে এবং তথাকথিত মানবাধিকার সংগঠনের সদস্য-সমর্থকরা নিজেদেরকে ‘মানবাধিকার সাংবাদিক’ পরিচয় দিয়ে নিরীহ লোকজনকে নানাভাবে হয়রানি করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিক পরিচয়ে এরা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জমি দখল, দোকানপাট দখল, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্মে জড়িত হয়ে পড়ছে। এই চক্রে বিতর্কিত নারী সদস্যও থাকেন। এরা খ্যাত-অখ্যাত একাধিক গণমাধ্যমের ৪/৫টি আইডি কার্ড বুকে পিঠে ঝুলিয়ে- মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসে ‘প্রেস’ কিংবা ‘সংবাদপত্র’ লিখে দাপিয়ে বেড়ায় সর্বত্র। তারা মূলত পুলিশ, র্যাব, ডিবি’র সোর্সের দায়িত্ব পালনেই বেশি ব্যস্ত। ভ‚য়া সাংবাদিক আর কথিত মানবাধিকার কর্মিদের নানা অপকর্মের কারণে প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি এখন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
মুছকান টিভি নামে এক ইউটিউব চ্যানেলের আওতাতেও রাজধানীর উপকন্ঠ এলাকাগুলোতে দুই শতাধিক সাংবাদিক কার্ড বিতরণ করার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে মাদক ব্যবসায়ী, সেলুন কর্মি, চা-বিক্রেতা, পরিবহন হেলপার, মাছ-সবজি বিক্রেতাসহ যে কোনো পেশার মানুষ, নাম লেখার যোগ্যতা থাকুক না থাকুক ন্যূনতম এক হাজার টাকা জমা দিয়েই ‘ক্রাইম রিপোর্টার’ পদবীযুক্ত আইডি কার্ড পেয়ে যাচ্ছেন।
বৃহত্তর উত্তরা জুড়ে আরো ভয়াবহ অবস্থা চলছে। সেখানে অবস্থানরত একজন সিনিয়র সাংবাদিক জানিয়েছেন, উত্তরা এলাকায় অন্তত পাঁচশ ভূয়া সাংবাদিক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সাংবাদিক ও মিডিয়ার নাম ব্যবহার করে এক ডজনেরও বেশি ক্লাব-সংগঠনও গড়ে উঠেছে। মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কেউ সংযুক্ত না থাকলেও নিজেরাই একাধিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল খুলে সাংবাদিক-সম্পাদক বনে যাচ্ছেন। তাদের অনলাইন পোর্টালে যা ইচ্ছে তাই লিখে দিচ্ছেন-যাকে খুশি তার পক্ষে লিখছেন, চাঁদা না পেলেই ডুবিয়ে দিচ্ছেন। এসব অনলাইন পোর্টালগুলো আবার পত্রিকা আকারে প্রিন্ট করেও লিফলেটের মতো ছড়িয়ে দেন তারা।
ঢাকার সাভার, আশুলিয়া, ধামরাইয়ের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, পুলিশ কর্মকর্তা ও সচেতন মহলের সাথে আলাপ করে জানাগেছে, এসব এলাকায় প্রায় এক হাজারেরও বেশী কথিত সাংবাদিক রয়েছে। মানবাধিকার কর্মী রয়েছে প্রায় আরো দুই হাজারের মত। যেন ঘরে ঘরে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী। নতুন করে গোয়েন্দা সাংবাদিক, মানবাধিকার সাংবাদিক, ইউটিউব ও ফেসবুক সাংবাদিকদের অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ট হয়ে পরেছে। সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে তথা কথিত সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠনের অফিস। এসব অফিস ইতিমধ্যেই টর্চার সেল নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
পাঠক, আগামী সংখ্যায় সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ে কথিত সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের নামসহ থাকছে প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব।

