মিশ্রণ বীজে ধান চাষ, বিপাকে হাওরের কৃষক

মিশ্রণ বীজে ধান চাষ, বিপাকে হাওরের কৃষক

উত্তরদক্ষিণ। বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, আপডেট ১৫:০৫

হাওরে এখন বোরো মৌসুম। বৈশাখ মানেই নতুন ধান কেটে ফসল ঘরে তোলার উৎসব। অল্প অল্প করে কিছু জায়গায় শুরুও হয়েছে ধান কাটা। তবে, এরই মাঝে কৃষকদের বিপাকে ফেলেছে মিশ্রণ বীজের ধান চাষ।

যারা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ব্রি-ধান ৮৮ জাত চাষ করেছেন, তারা পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। তাদের ক্ষেতে এক জাতের নয়, দেখা যাচ্ছে নানা জাতের ধান। ফলে কীভাবে ধান কাটবেন তা নিয়ে চিন্তায় চাষিরা।

তাদের ভাষ্য, নানা জাতের ধান ধরায় কোনোটা পেঁকে গেছে, কোনোটা আধাপাঁকা, আবার কোথাও ধানের শীষই বের হয়নি। পাঁকা ধান কাটার চেষ্টা করলে নষ্ট হবে আধাপাঁকা ধান। অপেক্ষা করলে ঝরে পড়বে পাঁকা ধানের শীষ ।

কিশোরগঞ্জের ইটনা ও করিমগঞ্জের কয়েকটি হাওরে ব্রি-ধান ৮৮ চাষে দেখা দিয়েছে এমন অস্বাভাবিকতা। এ অবস্থায় কৃষকরা তাদের ফসল একসঙ্গে কাটতে পারবেন না। কৃষকদের অভিযোগ বিএডিসির সরবরাহ করা ব্রি-ধান ৮৮- এর বীজে মিশ্রণের কারণে তারা এ ভোগান্তিতে পড়েছেন।

করিমগঞ্জ উপজেলার গুণধর ইউনিয়নের মদন গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান (৫০)। দুপুরে কড়া রোদের মধ্যে নিজের ক্ষেতের পাশে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে। জমিতে থাকা ধান সম্পর্কে তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, মোট ১৩ কানি জায়গায় বিএডিসি থেকে ব্রি-ধান ৮৮ বীজ সংগ্রহ করে চাষ করেছিলেন। এখন ধানের চেহারা চেনাই মুশকিল। কোনো ধান পেঁকেছে, কোনো ধান মাত্র উঠতে শুরু করেছে। আবার কোনো ধানের শীষ এখনো কাঁচা। এখন ধান কোনটা কাটবেন তা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

তিনি বলেন, “ধার কইরা জমি চাষ করছি। কমপক্ষে ৪০০ মণ ধান অইলো অইলে (হতো)। অহন (এখন) ১০০ম ণ ফাইয়াম (পাবো) কি-না সন্দেহ। অহন আমার এ ক্ষতিপূরণ কেলা (কে) দিব।”

আরেক কৃষক ওমর সিদ্দিক জানান, ১৫ বিঘা জমিতে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন। যা ছিল কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী ক্ষেত। সেখানেও একই অবস্থা। এ ক্ষেতে বিভিন্ন জাতের ধান হয়েছে। যারা ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন, সবার ক্ষেতেই মিশ্রণ ঢুকে গেছে। ফলে প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। যারা ঋণ করে চাষাবাদ করেছেন, তাদের পথে বসা ছাড়া উপায় নেই। ক্ষেতের এই অস্বাভাবিক চিত্র দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, কৃষি ও বীজ অফিসে দৌড়ঝাঁপ করেও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না। কেউ কেউ বলছেন, বিএডিসি চুক্তিভিত্তিক চাষিদের উৎপাদিত মানসম্মত বীজ সরবরাহের কথা থাকলেও এবার তাদের বীজে ভেজাল ছিল। আর সেই ভেজালের খেসারত গুনছে কৃষক।

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবার পুরো জেলায় বোরো ধান চাষ হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ হয়েছে প্রায় ১৯হাজার হেক্টর জমিতে। ইটনা ও করিমগঞ্জের কিছু হাওরে এ জাতের অস্বাভাবিক ফলন দেখা গেছে। কৃষি বিভাগ বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান জানান, মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের সেখানে গিয়েছেন এবং ব্রি-ধান ৮৮-এর বীজে মিশ্রনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। বিভিন্ন জাতের ধানের মিশ্রণ ছিল বীজের প্যাকেটে। এখন কতটুকু জমি বা কতজন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার তালিকা করা হচ্ছে। বিএডিসিকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।

কিশোরগঞ্জ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) উপ-পরিচালক (বীজ বিপনন) মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, “আমরাও মাঠ পর্যায়ে গিয়ে এমন কিছু সমস্যা দেখতে পেয়েছি। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি, কোথা থেকে এমন বীজ কৃষকদের হাতে গেল। কোনো ডিলার যদি

কৃষকদের বিএডিসির প্যাকেটে নকল বীজ দিয়ে থাকেন আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। এছাড়া, আর কোন উৎস থেকে এমন মিশ্রনযুক্ত বীজ এলো তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

ইউডি/কেএস

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading