৮ মাসেও খোঁজ মেলেনি গোডাউন মালিকের

৮ মাসেও খোঁজ মেলেনি গোডাউন মালিকের

উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ০৫ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১১:১৮

পুরনো ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় কেমিক্যাল গোডাউনে আগুন লেগেছিল আট মাস আগে, গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে। কেমিক্যাল গোডাউনে লাগা এ আগুনে নারী ও শিশুসহ ৭১ জন মানুষ পুড়ে অঙ্গার হয়ে যান। অনেকেরই পরিচয় জানতে হয়েছে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে। সেই ঘটনার তদন্ত শেষ হয়নি আজও। গোডাউন মালিকের খোঁজ পাননি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। গ্রেফতারও হননি কেউ। ওই ভবনে থাকা অন্য কেমিক্যাল গোডাউন মালিকদেরও নাম-পরিচয় সম্পর্কে সঠিক কোনও তথ্য পাননি তারা।

জানা গেছে, আগুনের ঘটনার পর ওয়াহিদ ম্যানশন নামের ভবনটির মালিক দুই সহোদর মো. হাসান (৫০) ও মো.সোহেল (৪৫) আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তদন্ত শেষ করা যায়নি এখনও। কবে নাগাদ শেষ হবে তা সঠিকভাবে বলতে পারেননি তারা। চুড়িহাট্টার স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ঘটনার পর ওই ভবনের মালিক দুই সহোদর হাসান ও সোহেল দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। জামিনে বেরিয়ে এসে  বর্তমানে প্রকাশ্যে রয়েছেন তারা। ভবনের দোতলায় থাকা কেমিক্যাল গোডাউনের কাউকে আট  মাসেও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পর পুড়ে মারা যাওয়া জুম্মন নামে এক ব্যক্তির ছেলে আসিফ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক হাসান ও সোহেল ওরফে শহীদকে এ মামলায় আসামি করা হয়। এছাড়া, অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনের কথা উল্লেখ করা হয় এজাহারে। ভয়াবহ এই আগুনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত কর্মকর্তা  চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কবির হোসেন হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘চুড়িহাট্টার ঘটনাটি নিয়ে আমাদের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। মামলার পরপরই ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকদের গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছিল। এছাড়া, বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ করে সেই অনুযায়ী তদন্ত হচ্ছে।’ কেমিক্যাল গোডাউনের মালিকদের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. কবির  বলেন, ‘তাদের কারও অবস্থানই শনাক্ত করা যায়নি। তাদের ঠিকানা, পাসপোর্ট, ট্রেড লাইসেন্স সম্পর্কেও সঠিক কোনও তথ্য মেলেনি। যতটুকু জানতে পেরেছি, গোডাউনের মালিক ভারতের মারোয়ারি গোত্রের লোক ছিল। বাংলাদেশে তাদের স্থায়ী কোনও ঠিকানা পাওয়া যায়নি। এরপরও তাদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।’ চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনার তদন্তে ফায়ার সার্ভিস,স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিস্ফোরক পরিদফতর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন এই পাঁচটি সংস্থার পাঁচটি তদন্ত কমিটি কাজ করে। মাঠ পর্যায়ে সরেজমিনে ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে এবং ঘটনাস্থলের বিভিন্ন আলামত বিচার বিশ্লেষণের পর কমিটিগুলো তদন্ত প্রতিবেদনও তৈরি করে। তবে সবগুলো প্রতিবেদনেই আগুনের সূত্রপাত ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলার কেমিক্যাল গোডাউন থেকে হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

আগুনের ঘটনার পর পরই ঘটনাস্থলের কাছে পাওয়া পারফিউমের (বডি স্প্রে) একটি বোতলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নামের সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালায়। অনুসন্ধানকালে ওই এলাকার কসমেটিকস ও সুগন্ধী আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা জানান, পার্ল ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান বিদেশি সুগন্ধী কেমিক্যাল আমদানি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল সুগন্ধী ক্যান তৈরি করতো। এসব ক্যানেই নতুন করে রিফিল করার সময় তা বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। আর সুগন্ধী যেমন দাহ্য কেমিক্যাল  এর সঙ্গে গ্যাসও দাহ্য। রিফিলের কারণেই ওই গোডাউনে গ্যাস চেম্বার তৈরি হয়। এছাড়াও চুড়িহাট্টা মোড়ে অনেক ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মোড়ে প্রায় সব সময় (বডি স্প্রে) সুগন্ধীর ঘ্রাণ পাওয়া যেত। অনুসন্ধানে ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলার কেমিক্যাল গোডাউন মালিকদের পরিচয় উদ্ঘাটিত হয়। ‘পার্ল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলাকে গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করতো। এই প্রতিষ্ঠানটি অন্তত তিন দশক ধরে সুগন্ধী ও কসমেটিকস জাতীয় পণ্য আমদানি ও সরবরাহ করে আসছিল। পার্ল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের মূল অফিস ছিল পুরান ঢাকার চকবাজারের ৬৬ মৌলভী বাজারের তাজমহল মার্কেটে। এছাড়া, হাতিরপুলে ১৩/১ নম্বর সোনারগাঁও রোডে কাশেম সেন্টারের ছয় তলায় তাদের আরেকটি অফিস ছিল। এসব ঠিকানায় সরেজমিনে গিয়ে অফিসে তালা বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। ঘটনার পর থেকে পার্ল ইন্টারন্যাশনালের অন্যতম নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ কাশিফ এবং দুই পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ ও মোজাম্মেল ইকবাল আত্মগোপনে চলে যান। এরপর থেকে এখনও পর্যন্ত তাদের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সেলস বিভাগে কর্মরত কারও মোবাইল নম্বরও খোলা পাওয়া যায়নি। মামলার বাদী মো. আসিফ বলেন, ‘চুড়িহাট্টার ঘটনায় আমার বাবা মারা গেছেন। কিন্তু এই আগুনের জন্য যারা দোষী, পুলিশ তাদের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। ওয়াহিদ ম্যানশনের মালিক দুই ভাইকেও গ্রেফতার করেনি। তারা পলাতক থাকার পর আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়ে এসেছেন। বর্তমানে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।আমি তাদের বিচার চাই।’

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading