বিপিএল বাণিজ্য ও ক্রিকেটের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে?

বিপিএল বাণিজ্য ও ক্রিকেটের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে?

উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১১:৪৬

‘সালমান বা ক্যাটরিনা আসবে এমন খবর জেনে খোজ নিলাম যে কোন প্রোগ্রামে আসবে, তখন শুনলাম যে সেটা বিপিএলের অনুষ্ঠান,’ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের প্রচার প্রচারণা নিয়ে যখন প্রশ্ন করা হয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদা খানকে তখন তিনি এমন উত্তর দেন। বিপিএলের খেলা কবে বা বিপিএলের কখন কোন দলের খেলা এনিয়ে কোনো বিজ্ঞাপন বা কোনো প্রচার প্রচারণা চোখে পড়েনি এই ক্রিকেট ভক্তের। যিনি নিয়মিত চোখ রাখেন ক্রিকেটের মাঠে। যে বিপিএল আসর শুরু হয়েছে সেখানে ম্যাচ শুরুর সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল দুপুর সাড়ে ১২ টা ও সন্ধ্যা পাঁচটা ২০ মিনিটে। এরপর বিসিবির মিডিয়া কমিটির প্রধান জালাল ইউনুস গণমাধ্যমে জানান, দর্শকের কথা ভেবে সময় পিছিয়ে নেয়া হয়েছে। এখন ম্যাচ শুরু হয় দুপুর দেড়টা ও সন্ধ্যায় সাড়ে ছয়টায়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে, ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ নিয়মিত বিকেল সাড়ে তিনটা ও রাত সাড়ে আটটায় শুরু হয়। এটা একটা দর্শক টানার উপায়ও বলা যায়, যেহেতু পুরো মাসজুড়ে চলা একটি টুর্নামেন্টে কর্মজীবী দর্শক টানার ক্ষেত্রে শুধু ক্রিকেট যে উপকরণ হবে সেটা বলা মুশকিল, এক্ষেত্র ক্রিকেটের বাইরে ম্যাচ শুরুর সময় ও বিনোদনের উপকরণগুলো বেশ কাজে দেয়। আবার আইপিএল যেহেতু আটটি ভেন্যুতে হয় সেক্ষেত্রে প্রতিটি ভেন্যুতে নির্দিষ্ট কিছু ম্যাচ হয় তাই দর্শক উপচে পড়ে ভারতের সেই রাজ্যের ভেন্যুতে। কিন্তু বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ভেন্যু তিনটি, যেখানে ৪৬টি ম্যাচের ২৮টি ম্যাচ হবে একই ভেন্যুতে।

কারণ যে অর্থ বিনিয়োগ করা হয় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে, তার সিংহভাগ উঠে আসে টেলিভিশন স্বত্ত্ব ও অন্যান্য প্রচার মাধ্যমের কপিরাইট বিক্রি করে। তবে কখনো কখনো সেই প্রচার মাধ্যমের সম্প্রচারের মান নিয়েও সমালোচনা শোনা যায়, কারণ এই ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ অন্যান্য লিগ যেমন বিগ ব্যাশ, আইপিএল এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তান সুপার লিগ বা টি-টেনের মতো টুর্নামেন্ট থেকেও পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক নিজামুদ্দিন চৌধুরী অবশ্য বলেছেন, গত আসরে সম্প্রচারে যেসব গাফেলতি বা ভুল ছিল সেগুলো এবার থাকছে না। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামালের অধীনে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ শুরু হয়। এনিয়ে মোট দুটো বোর্ড বিপিএল চালাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রনি, সবগুলো বিপিএল সাংবাদিক হিসেবে কাভার করেছেন। তিনি বলেন, শুরু থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বিপিএল নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট চিন্তা-ভাবনা ছিল না। একটা সময় বিপিএল এর কর্মকর্তারা বলতেন বিপিএল থেকে তারা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটার তুলে আনতে চান। আবার গেল দুই মৌসুম ধরে বিপিএল শুরুর আগে বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড ও বিপিএল সংশ্লিষ্টরা বলেন ক্রিকেটার তুলে আনার মূল মঞ্চ এটা নয়। মি: রনি মনে করেন, বিগ ব্যাশ বা আইপিএলের একটা ব্র্যান্ড ইমেজ আছে যেটা বিপিএল কখনোই ধরতে পারেনি। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের যখন একেকটি মৌসুম আসে তখন গণমাধ্যমে একই কথাগুলো ঘুরে ফিরে আসে। যেমন ভেন্যু বৃদ্ধি করা, মানসম্মত আন্তর্জতিক ক্রিকেটারের অভাব, দর্শককে টানার মতো উপকরণ না থাকা, টেলিভিশন সম্প্রচার নিয়ে নানা অভিযোগ। কিন্তু এসব সমালোচনা এবং তা নিয়ে ব্যখ্যা বিশ্লেষণ যতদিন বিপিএল চলে ঠিক ততদিনই থাকে, এরপর বছরব্যাপী বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বিপিএল নিয়ে কোনো আলাদা পরিকল্পনা দেখা যায় না কিছু বোর্ড বৈঠক ও তারিখ ঠিক করা ছাড়া। আরিফুল ইসলাম রনি বলেন, ‘ব্যবসায়িক ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি কখনো বিপিএল।’ এর একটা বড় কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, বিপিএল কোনদিকে আগাচ্ছে তার কোনো দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি নেই। বিপিএল মানেই একটা নেতিবাচক ভাবনা চলে আসে দর্শক ও ক্রিকেট নিয়ে যারা ভাবেন তাদের মনে। তবে রনি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের সম্ভাবনা ও ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে বলেন, কিছু ক্রিকেটার আছে যারা মানসম্পন্ন ঘরোয়া লেভেলে ওদের ফাইন টিউনিং বিপিএল থেকে হয়। তবে ক্রিকেটের উন্নতির আরো বড় একটা মঞ্চ হতে পারতো। যেটা আদতে সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ যখন শুরু হয় তখনকার সংগঠকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। বিপিএল নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রাথমিক ভাবনা জানতে তার সাথে কথা বলি। তিনি বলেন, একমাত্র মাঠ নিয়ে যে সংকট ছিল সেটায় খানিকটা উন্নতি হয়েছে। লিপু মনে করেন, ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো একেবারেই সফল হয়নি বলে কিছু জায়গায়।‘ফ্র্যাঞ্চাইজির কাজ ছিল তারা তাদের স্ব স্ব অঞ্চলের ক্রিকেট এগিয়ে নিতে কিছু পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, কিন্তু সেটা দেখা যায়নি। তাদের কাজ হওয়ার কথা সারা বছরজুড়ে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ফ্র্যাঞ্চাইজগুলোর কাজ থাকে বিপিএলের মাসে এবং যেদিন খেলোয়াড় নিলাম হয় সেদিন। বিপিএল আইপিএলের যে ব্যবসায়িক মডেল সে অনুযায়ীই আসার কথা কিন্তু বাংলাদেশের মতো ছোট দেশে সেটা পুরোপুরি মেনে চলা সম্ভব হয়নি বলে মনে করেন লিপু। গাজী আশরাফ হোসেন লিপু বলেন, ‘স্পন্সরশিপ থেকে দলগুলোর লাভবান হয়নি, ক্ষেত্র বিশেষে দুইএকটা দল লাভ করেছে কিন্তু অধিকাংশ দল পকেট থেকে ভর্তুকি দিয়েছে। বাকিটা ভর্তুকি দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।’ তবে বিপিএল বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য অর্থ উপার্জনের একটা বড় জায়গা তৈরি করেছে বলে মনে করেন মি: লিপু। ‘বিদেশি ক্রিকেটারদের সাথে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের আয়ের একটা বৈষম্য আছে। সেটা ঘোচানোর ক্ষেত্রে বিপিএল কাজ করেছে বেশ। কারণ বাংলাদেশের যে ৫০ থেকে ৬০জন ক্রিকেটার ভালো খেলে, তারা সবাই কোনোভাবেই জাতীয় দলে খেলতে পারবেন না, সেইক্ষেত্রে বিপিএল একটা জায়গা যেখানে তারা আয় রোজগার করতে পারে।’ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে আর্থিক লাভের সম্ভাবনা নেই বলেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মিডিয়ার কমিটির প্রধান জালাল ইউনুস। জালাল ইউনুস বলেন, ‘এটা জেনেই সবাই এসেছে, এটা একটা বিশেষ এডিশন। এখানে কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজ নেই, আগেও যারা ছিলেন তারাও যে খুব লাভ করতো তা নয়।’ জালাল ইউনুস বলছেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অর্থ উপার্জনের একটা বড় উত্স বিপিএল। আমরা সম্প্রচার স্বত্ত্ব বিক্রি করে আয় করি। তবে মি: জালাল ইউনুস মনে করেন, প্রচার প্রচারণার কোনো কমতি নেই। যেসব বিভাগের নাম নিয়ে খেলছে, তাদের বিভাগের সমর্থন আহ্বান করেছেন তিনি। ‘এর আগে ছুটির দিন বাদে খুব বেশি দর্শক হতো না, তবে ঢাকায় আমরা তেমন দর্শক আসা করি না। সপ্তাহের মাঝে যেসব খেলা হয় আট-দশ হাজার দর্শক যথেষ্ট।’ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজের তত্ত্বাবধানে ছিলেন আব্দুল আউয়াল বুলু। তার সেই দল এখন আর বিপিএলে খেলে না, এমনকি বিপিএলে বরিশালের প্রতিনিধিত্ব করে এমন কোনো দলই নেই এখন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আমরা কখনো লাভের চিন্তাই করিনি, এমনকি বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। মালিকদের মধ্যে অনেকে আছেন শখের বশে এটা করেন।’ তার মতে, বিপিএল এখনো ওভাবে পৃষ্ঠপোষক পায়নি কখনো। অধিকাংশ মালিকদের ক্ষতির অঙ্ক গুণতে হয়েছে বলছেন বুলু। ‘আমরা দুই বছর এই দলের দায়িত্বে ছিলাম। অনেক ক্রিকেটারকে আমরা আনতে চেয়েছি কিন্তু তারা অনেকেই আসতে চাননা। যেমন বিগ ব্যাশ হয়, আবার দুবাইতে একটা প্রোগ্রাম (সস্প্রতি শেষ হওয়া টি-টেন) হচ্ছে।’ এরপর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাছে বিপিএলের লভ্যাংশ থেকে যে আয় হয় সেটার ভাগ চায় ফ্র্যাঞ্চাইজগুলোর মালিকরা।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading