শিশু জিহাদের মৃত্যুর চার আসামি হাইকোর্টে খালাস

শিশু জিহাদের মৃত্যুর চার আসামি হাইকোর্টে খালাস

উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২০ । আপডেট ১৭ঃ৫৮

রাজধানীর শাহজাহানপুরে রেলের পরিত্যক্ত নলকূপে পড়ে শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনায় নিম্ন আদালতে দশ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামিকেই খালাস দিয়েছে হাই কোর্ট। আসামিদের আপিল মঞ্জুর করে বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি এএসএম আবদুল মবিনের হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ বুধবার (১২ ফেব্রুয়ারী) এই রায় দেয়।

খালাস পাওয়া ওই চারজন হলেন- শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিতে পানির পাম্প বসানোর প্রকল্প পরিচালক রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ উপ সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএসআর এর মালিক প্রকৌশলী আব্দুস সালাম, কমলাপুর রেলওয়ের সহকারী প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন ও ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার আবু জাফর আহমেদ শাকির। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে রেল কলোনিতে এক গভীর নলকূপের পাইপে পড়ে চার বছর বয়সী জিহাদের মৃত্যু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সেই উদ্ধার অভিযান ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

ঢাকার জজ আদালত দুই বছর আগে এ মামলার রায়ে চার আসামিকে অবহেলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানা করেন। ওই চার আসামির সবাইকে খালাস দিয়ে হাই কোর্ট বলেছে, যে ধারায় নিম্ন আদালত ওই চারজনকে শাস্তি দিয়েছে, ওই ধারায় দশ বছর সাজার সুযোগই নেই। তাছাড়া নলকূপের পাইপের মুখ ঢাকা না থাকার বিষয়টি ওই আসামিদের অবহেলা বলে চিহ্নিত কর যায় না।

আসামিদের পক্ষে হাই কোর্টে শুনানি করেন আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, এসএম শাহজাহান, এম সারোয়ার আহমেদ, আনোয়ারুল ইসলাম শাহীন ও এম আলী মর্তুজা। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আমিনুল ইসলাম। রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আমিনুল ইসলাম বলেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করবে রাষ্ট্রপক্ষ।

চার বছরের জিহাদচার বছরের জিহাদকী ঘটেছিল শাহজাহানপুরে?


২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর শাহজাহানপুর রেল কলোনিতে খোলা থাকা কয়েকশ ফুট গভীর এক নলকূপের পাইপে পড়ে যায় শিশু জিহাদ। প্রায় ২৩ ঘণ্টা রুদ্ধশ্বাস অভিযানে অনেক নিচে ক্যামেরা নামিয়েও ফায়ার সার্ভিস কোনো মানুষের ছবি না পাওয়ায় পাইপে জিহাদের অস্তিত্ব থাকা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। ওই সন্দেহ রেখেই উদ্ধার অভিযান স্থগিতের ঘোষণা দেয় ফায়ার সার্ভিস।

এর কয়েক মিনিটের মধ্যে কয়েকজন তরুণের তৎপরতায় তৈরি করা যন্ত্রে পাইপের নিচ থেকে উঠে আসে অচেতন জিহাদ। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, শিশুটি বেঁচে নেই। জিহাদের মৃত্যুর ওই ঘটনা সে সময় সারাদেশে আলো্চনার জন্ম দেয়। এর জন্য দায়ীদের শাস্তিরও দাবি ওঠে। এরপর জিহাদের বাবা অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যুর অভিযোগ এনে শাহজাহানপুর থানায় মামলা করেন।

মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা শাহজাহানপুর থানার পরিদর্শক আবু জাফর ২০১৫ সালের এপ্রিল যে অভিযোগপত্র দেন তাতে শাহজাহানপুর রেল কলোনিতে পানির পাম্প বসানোর প্রকল্প পরিচালক রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ উপ সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএসআর এর মালিক প্রকৌশলী আব্দুস সালামকে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ‘অপরাধজনক প্রাণনাশের’ অভিযোগ আনা হয়।

পরে বাদীর নারাজি আবেদনে ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ আরও চারজনকে যুক্ত করে নতুন করে অভিযোগপত্র দেন গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মিজানুর রহমান। তাতে জাহাঙ্গীর ও সালাম ছাড়াও বাংলাদেশ রেলওয়ের সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম, কমলাপুর রেলওয়ের সহকারী প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন, ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার আবু আহমেদ শাকি, সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) দিপক কুমার ভৌমিককে আসামি করা হয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, রেল কলোনির একটি পানির পাম্পে লোহার পাইপ দিয়ে কূপ খনন করা হয়। কূপে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা না করে মুখ খোলা অবস্থায় দীর্ঘদিন পরিত্যক্তভাবে ফেলে রাখা হয়। ফলে বাদীর ছেলে জিহাদ কূপের পাশে খেলার সময় পড়ে মারা যায়। ২০১৬ সালের ৪ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে এ মামলার বিচার শুরু করে আদালত। বাদীপক্ষে ১১ জনের সাক্ষ্য শুনে ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান ২০১৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণা করেন।

আসামিদের মধ্যে জাহাঙ্গীর, সালাম, নাসির ও জাফরকে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে দশ বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি দুই লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, এই আসামিদের ‘অবহেলার কারণে’ একটি চার বছরের শিশুর অকাল মৃত্যু হয়েছে খেলতে গিয়ে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অপর দুই আসামি দিপক কুমার ভৌমিক ও সাইফুল ইসলামকে খালাস দেন বিচারক।

ক্ষতিপূরণ
জিহাদের মৃত্যুর দুই দিন পর চিলড্রেন চ্যারিটি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী হাই কোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। তাতে জিহাদের মৃত্যুর জন্য ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আরজি জানানো হয়। ওই রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি হাই কোর্ট রুল জারি করে। জিহাদের মৃত্যুর জন্য ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় ওই রুলে।

পরে ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ক্ষতিপূরণের পক্ষে রায় দেয় হাই কোর্ট। রায়ে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়ে রেলওয়েকে ১০ লাখ এবং ফায়ার সার্ভিসকে ১০ লাখ টাকা দিতে বলা হয়। ফায়ার সার্ভিস ও রেল কর্তৃপক্ষ ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে গেলেও তাদের লিভ টু আপিল খারিজ হয়ে যায়। ফলে ক্ষতিপূরণের রায় বহাল থাকে এবং ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সেই ২০ লাখ টাকা জিহাদের বাবা-মায়ের ব্যাংক হিসাবে জমা পড়ে।

হাই কোর্টে যে কারণে খালাস

বুধবার হাই কোর্টের রায়ে বলা হয়, বিচারিক আদালত দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে চার আসামিকে ১০ বছরের সাজা দিয়েছিল। কিন্তু ৩০৪ এর ক ধারায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এবং খ থারায় সর্বোচ্চ তিন বছরের শাস্তির বিধান আছে, ১০ বছর কারাদণ্ড দেওয়ার সুযোগ নেই। জিহাদের মৃত্যুর পেছনে আসামিদের অবহেলা ছিল- এই বিবেচনা থেকে জজ আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করেছিল। কিন্তু হাই কোর্ট রায়ে বলেছে, জিহাদের মৃত্যুর ঘটনায় সুনির্দিষ্টভাবে ওই চার আসামির অবহেলা প্রমাণিত হয় না, কারণ খোলা পাইপ ঢেকে রাখার দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায় না।

এছাড়া একটি রিট মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে ভিকটিমের পরিবার যেহেতু ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছে, সেহেতু আসামিদের সবাইকে খালাস দেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত মনে করেছে হাই কোর্ট।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading