লকডাউনের পথে বাংলাদেশ!
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ২৪ মার্চ ২০২০ । আপডেট ২২:৩০
সব ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলা। মঙ্গলবার (২৪ মার্জ) থেকে বাংলাদেশের সব জেলার সাথে রাজধানী ঢাকার ট্রেন, বিমান ও নৌযান চলাচল বন্ধ হয়েছে। আর বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) থেকে বাস চলাচল বন্ধ হওয়ার কথা রয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ জানান, মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে অভ্যন্তরীণ সব রুটে বিমান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরআগে রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে সব ধরণের যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে। এরইমধ্যে যেসব ট্রেনগুলো বেইজ স্টেশন থেকে ছেড়ে এসেছে সেগুলো আবার ফিরে যাবে।
সেসময় যাত্রী পরিবহন করা হবে কিনা এমন প্রশ্নে রেলমন্ত্রী বলেন, যদিও আমরা পরিবহনের উদ্দেশ্যে পরিচালনা করছি না, তবে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে কেউ ট্রেনে উঠে বসলে সেটা ভিন্ন বিষয়। তবে পণ্য পরিবহনের জন্য মালবাহী ট্রেনগুলো চলাচল করবে বলেও জানান তিনি।
এর আগে, মঙ্গলবার থেকে সারাদেশে নৌপথে লঞ্চ, ছোট নৌকাসহ সব ধরণের যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সোমবার (২৩ মার্চ) নৌ পরিবহনমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, যাত্রীবাহী নৌযান না চললেও পণ্যবাহী নৌযানগুলো চলাচল করবে। অবশ্য মঙ্গলবার ঢাকা থেকে কোনও যাত্রীবাহী লঞ্চ না ছাড়লেও পাটুয়ারিয়া-দৌলদিয়ায় ফেরি চলাচল করে।
এদিকে মঙ্গলবার সকালে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশে সব ধরণের গণপরিবহন বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) থেকে ‘লকডাউন’ করা হবে। বাংলাদেশের কোনও সড়কে কোনও রকম যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল করবে না। এই লকডাউন কার্যকর থাকবে পরবর্তী ১০দিন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
তবে লকডাউন উপেক্ষা করেই সোমবার ছুটি ঘোষণার পর রাজধানী ঢাকা ছেড়েছেন অনেকেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন স্টেশন ও বাস স্টেশনে মানুষের ভিড়ের ছবিও ছড়িয়ে পড়ে। সোমবারই লক্ষ্মীপুরে ফিরেছেন আল আমিন। তিনি জানান, সোমবারও সায়েদাবাদে উপচে পড়া মানুষের ভিড় ছিল। তিনি আলাদাভাবে বাস ভাড়া করে ফিরলেও তার এক বন্ধু সায়েদাবাদ বাস স্টেশনে সোমবার বিকেলে গিয়ে টিকেট না পেয়ে গভীর রাতে বাসে করে বাড়ি ফেরেন।
ট্রেনে করে নীলফামারি ফিরতে চেয়েছিলেন এইচএম ফরহাদ আর তার ছোট ভাই। তারা জানান, ছুটি ঘোষণার পর পরিবারের চাপেই ঢাকা থেকে নীলফামারি ফেরার জন্য সোমবার ট্রেনের টিকেট করে রাখেন তিনি। তবে মঙ্গলবার সব ধরণের ট্রেন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করার পর তাদের যাওয়াটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে পরিবহন বন্ধের ঘোষণা আসার আগেই লঞ্চে করে লক্ষ্মীপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন সবুজ আলম ফিরোজ। ঢাকায় বন্দী অবস্থায় থাকতে হবে বলে গ্রামের বাড়িতে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা জানান মিস্টার আলম। তিনি বলেন, বাসা থেকে বের হয়ে লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে দেখতে পান, শুধু তিনি একা নন, তার মতো আরো অনেক মানুষ বাড়ি ফিরছে। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে যে, ঈদের ছুটির মতো মানুষ ফিরছে।
করোনাভাইরাস সংক্রমণের এই সময়টাতে কেন বাড়ি ফিরছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বাড়ির লোকজন চিন্তা করছে বলেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। বুঝি যে, না গেলেই বেটার হতো। কারণ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে পুরো একটা গ্রামও সাফ হয়ে যেতে পারে। আমি বুঝি। কিন্তু মা যেতে বলেছে আর মনও মানছে না,- বলেন তিনি।
এদিকে মঙ্গলবারও নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে, গণপরিবহন ব্যবহারে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআর এর পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। ছুটি পেয়ে বাসে করে মঙ্গলবার রাতে গ্রামের বাড়ি শেরপুরে ফিরছেন গৃহকর্মী শাহিদা বেগম। তিনি জানান, রোগের কথা জানেন তিনি। তবে ঢাকায় পরিচিত কেউ না থাকায় সংকটের মুহূর্তে গ্রামেই ফিরে যাচ্ছেন তিনি। সবাই যাইতেছে। যে বাসায় থাকি, তার সব কিছু খালি হইয়া যাইতেছে। একলা কি করুম। তাই যাইতেছি,- তিনি বলেন। শাহিদা আরও বলেন, দেশ-গেরামে তো মা-বাপ-ভাই-বোন সবাই আছে। এই খানে তো কিছু হইলে কেউ কাউরে ধরে না, কাছে আসবো না। ওই খানে তো কেউ ডরায় না, তাই যাইতেছি।
ঝুঁকি কতটা বাড়ছে?: আইইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, এমন অবস্থায় ঝুঁকি তো কিছুটা থাকেই। তার মতে, সংক্রমণের হার কম থাকলে ঝুঁকিও তেমন একটা থাকে না। তবে সংক্রমণের হারটা বেশি থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু আমরা তো আসলে জানতে পারছি না যে আক্রান্তের হারটা কেমন।
ভ্রমণ করলে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি এমনিতেই বাড়ে বলে জানান তিনি। আর এর কারণেই আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়। মানুষ যে গ্রামে ফিরছে এতে করে মিক্সিং হওয়ার একটা শঙ্কা আছে। অর্থাৎ গ্রাম থেকে সংক্রমণ শহরে আসতে পারে আবার শহর থেকেও গ্রামে যেতে পারে।
মঙ্গলবার থেকে বিমান, ট্রেন ও নৌযান চলাচল সারাদেশে বন্ধ থাকলেও সড়ক পরিবহন অর্থাৎ যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ হবে বৃহস্পতিবার থেকে। আর ২৬ তারিখ থেকে ছুটি ঘোষণা হওয়ায় এই মাঝের সময়টাতে মানুষ গ্রামে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়। এমন সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী কিনা এমন প্রশ্নে আইইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, সেক্ষেত্রে বলতে হবে যে, সরকারের সিদ্ধান্তে কৌশলগত ত্রুটি ছিল। সেক্ষেত্রে আমি বলবো স্ট্রাটেজিটা প্রোপার হয়নি।
ঢাকায় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। গণপরিবহনসহ সব ধরনের যানবাহন রাজধানীতে কমে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কায়কাউস মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করে সবাইকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। রাজধানীতে অতি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ এখন আর খুব একটা বেরও হচ্ছেন না। যা লকডাইনের মতো। ধারণা করা হচ্ছে, পরিস্থিতি দ্রুতই লকডাইনের দিকে যেতে পারে। এর আগে বুধবার (২৫ মার্চ) জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে ভাষণ দেয়ার কথা রয়েছে, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা থাকবে বলেই দেশবাসীর ধারণা। সচেতন মানুষের প্রত্যাশা, সবাই সরকারের বিধি-নিষেধ মেনে চললে করোনার মহামারি পরিস্থিতিতে থেকে উত্তরণ সম্ভব হতে পারে।

