ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
উত্তরদক্ষিণ ২৯ এপ্রিল ২০২০ । ১২:০৫
লাইফ সাপোর্টে থাকা এক রোগীকে স্থানান্তর করতে গিয়ে রাজধানী ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী ডা. খালিদ মাহমুদ। তিনি অভিযোগ করেছেন, তার মা বেসরকারি ওই হাসপাতালটিতে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।সেখানে তার মা চিকিৎসাধীন থাকার সময় কোভিড-১৯ পজিটিভ হওয়ার কারণে ভেন্টিলেশনে থাকার পরও তাকে বের করে দেয়া হয়।
কোভিড আক্রান্ত হওয়ার কারণে যখন তাকে কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় তখন আইসিইউ সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা পাননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ডা. খালিদ মাহমুদ বলেন, ইউনাইটেড হাসপাতালের মতো একটা জায়গায় আম্মাকে ট্রান্সফারের জন্য ভেন্টিলেটরসহ একটা অ্যাম্বুলেন্স পাবো না, সেটা আসলে আমরা মেনে নিতে পারি না। তিনি জানান, বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে করে অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করতে হয়েছে। যে অ্যাম্বুলেন্সটি তারা পেয়েছিলেন সেটিও একজন অজ্ঞান রোগীর জন্য যার ভেন্টিলেটর দরকার, তার জন্য অপ্রতুল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মা মেশিনের উপর নির্ভরশীল ছিলেন উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, তারা ভেন্টিলেটরটা খুলে আমাদের কোনও অ্যাম্বুলেন্স দিলো না!
অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার বলেন, আমরা কাউকে বের করে দেইনি। তিনি বলেন, রোগীকে ইনকিউবেটেড অবস্থায় বা কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের সাহায্যে লাগানোর গলায় যে টিউব লাগানো হয় সেটিসহ আম্বুব্যাগের সাহায্যে(যে যন্ত্র দিয়ে হাতে পাম্প করে রোগীকে অক্সিজেন দেয়া যায়) রোগীকে স্থানান্তর করা হয়েছে। তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটা একটি প্রচলিত ব্যবস্থা। কোভিডের সংক্রমণ না থাকলেও আইসিইউ বা ভেন্টিলেটরে থাকা রোগীদের এভাবে স্থানান্তর করা হয় বলেও তিনি জানান।
এ বিষয়ে বেসরকারি একটি হাসপাতালের মালিক এবং চিকিৎসক ডা লেনিন চৌধুরী বলেন, লাইফ সাপোর্টে থাকা কোনও রোগীকে স্থানান্তর করতে হলে তাকে অবশ্যই আইসিইউ সুবিধা রয়েছে এমন অ্যাম্বুলেন্স যেখানে ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা রয়েছে বা ভেন্টিলেটর বসানো যাবে এমন সুবিধা সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্সে করে পরিবহন করতে হবে। কারণ ভেন্টিলেটর খুলে ফেললে রোগী শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারবে না।
তবে স্থানান্তরের আগে রোগীর ফুসফুসের অবস্থাটাও ভালভাবে পরীক্ষা করে নিতে হবে। ভেন্টিলেটর খুলে পরীক্ষা করে দেখতে হবে যে রোগীকে কতক্ষণ ভেন্টিলেটর ছাড়া রাখা সম্ভব। যদি দেখা যায় যে, আধাঘণ্টাও রাখা সম্ভব- তবে সে সময়টাকেই কাজে লাগাতে হবে, বলেন ডা. লেনিন চৌধুরী।
নিজের মাকে স্থানান্তর এবং মৃত্যু নিয়ে ডা. খালিদ মাহমুদ ও তার ভাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্টও দিয়েছেন। যেখানে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়া জানিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে ডা. সাগুফা আনোয়ার বলেন, তারা ফেসবুকের পোস্ট দেখেছেন কিন্তু এ বিষয়ে রোগীর পক্ষের কেউ হাসপাতালে কোনও ধরণের অভিযোগ করেনি।
ডা. খালিদ মাহমুদ জানান, গত ৪ এপ্রিল তার মাকে গ্রামের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা হয়। এর পর তিনি জ্বর, কাশি ও গলাব্যথা দেখা দিলে বাড়িতেই তার চিকিৎসা করানো হয়। ডা. মাহমুদ জানান, তিনিসহ তাদের পরিবারের তিনজন চিকিৎসক উপস্থিত থাকায় এমন সিদ্ধান্ত নেন তারা। কিন্তু কয়েক দিন পর অবস্থা আরো খারাপ হলে এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হলে উত্তরার একটি হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালে গেলেও করোনাভাইরাসের পরীক্ষা না করানোর কারণে ভর্তি নেয়া হয় না। পরে গত ১১ এপ্রিল কোভিড চিকিৎসা দেয়া হয় এমন একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেদিনই নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআর-এর প্রতিনিধিদল। পরের দিন পরীক্ষার ফলে জানানো হয় যে, তার মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নেই।
এই ফল পাওয়ার পর ১২ এপ্রিল রাতে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সার্টিফিকেট দেখিয়ে ভর্তি করানো হয়। পরে তাকে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হয়। কিন্তু এর এক দিন পর অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে জানানো হয় যে, তার মায়ের মধ্যে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ রয়েছে এবং তাকে বিল পরিশোধ করে নিয়ে যেতে বলা হয়। হাসপাতালের পক্ষ থেকে আইইডিসিআর এর মাধ্যমে ওই পরীক্ষা করানোর কথা জানানো হয়।
হাসপাতাল থেকে স্থানান্তরের বিষয়ে ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার বলেন, রোগীকে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা দেয় এমন হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেই। কারণ ইউনাইটেড হাসপাতালে কোভিড রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয় না। অন্যান্য রোগীদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার অভাব বলেও অভিযোগ তোলেন ডা. খালিদ মাহমুদ। তিনি বলেন, ইউনাইটেড হসপিটাল যদি একটু মানবিকতার কথা চিন্তা করে, রোগীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে একটু ভেন্টিলেটর দিতো বা অন্য কোথাও থেকে যোগাড় করে দিতো। কিন্তু কোনও ব্যবস্থাপনার মধ্যে না গিয়ে একটা রোগীর ভেন্টিলেশন খুলে ছেড়ে দেয়া, গেট থেকে বিদায় দিয়ে দেওয়া, এটা জাতিগতভাবে লজ্জার ব্যাপার। তথ্য সহায়তা বিবিসি বাংলা।

