সীমিত পরিসরে মার্কেট খুলেছে, ঝুঁকি থাকছেই!
উত্তরদক্ষিণ রবিবার ১০ মে ২০২০। ১৭:৫০
দেশে আজ রবিবার (১০ মে) থেকে সীমিত পরিসরে মার্কেট খুলতে শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা। এর আগেই খুলে দেয়া হয়েছে তৈরি পোশাক কারখানাগুলো। মসজিদেও জামাতে নামাজ আদায় করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেন মুসল্লিরা এখন মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করছেন।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে রবিবারই একদিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৮৮৭ জনের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে, যা এ পর্যন্ত দেশে সর্বোচ্চ। এদিন মৃত্যুর পরিমাণ বেশি ১৪ জন।
এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন যে, লকডাউন শিথিল করে মার্কেটসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হলে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়বে। অপরদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শীর্ষনেতারা বলছেন, লকডাউন শিথিল করা হলে সরকারের জন্য বুমেরাং হয়ে যাবে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত পুনরায় বিবেচনার করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন ১৪ দলের নেতারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে ধীরে ধীরে মার্কেটসহ অন্যান্য সব কিছু খুলে দিতেই হবে। তবে সেটাও করতে হবে স্বাস্থ্যবিধি বা শর্ত মেনে। তা নাহলে আক্রান্তের সংখ্যা ব্যাপকহারে বাড়তে পারে। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও বাংলাদেশে লকডাউন শিথিল করার সময় জনস্বাস্থ্য বিধিগুলো মেনে নেয়া হয়নি। ফলে তারা ধারণা করছেন যে, এর ফলে সংক্রমণ আরো বেশি দৃষ্টিগোচর হবে।
লেনিন চৌধুরীর মতে, এর ফলে দুই ধরণের ফল আসতে পারে। এক হচ্ছে, আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ হেলদি ক্যারিয়ার বা উপসর্গ বিহীন ভাইরাস বাহী হয়ে সমাজে ঘুরে বেড়াবে। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একটু কম, বয়স বেশি বা অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে তাদের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যেতে হবে।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং এখন কিউরেটিভ বেজড বা চিকিৎসা নির্ভর মহামারি মোকাবিলার কার্যক্রম নেয়া হচ্ছে। তিনি মনে করেন, এ ধরণের ব্যবস্থা সুফলের চেয়ে কুফলই বেশি বয়ে আনবে। মৃতের সংখ্যাও বেড়ে যাবে। ভোগান্তির সংখ্যাও বাড়বে। এটিকে যোগ-বিয়োগ করলে, অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালু করার মধ্য দিয়ে যতটা লাভবান হওয়ার কথা ভাবছি, স্বাস্থ্য খাতে খরচ এবং ভার বেড়ে যাওয়ার কারণে তা না হয়ে অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। কারণ, মানুষ যদি অসুস্থ হয় তাহলে সরকারের সাথে সাথে পরিবারের অর্থনীতিতেও খরচ বেড়ে যাবে।
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই দেশে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে মাত্র দেড় লাখ হাসপাতাল শয্যা রয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা। লকডাউন শিথিল করার কারণে নতুন কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এর জন্যই তো নতুন (বসুন্ধরায় ২ হাজার বেডের) হাসপাতাল হলো, দরকার হলে আরো হবে।’
সংক্রমণের সংখ্যা বেড়ে গেলে বর্তমান স্বাস্থ্য সুবিধা দিয়ে তা সামাল দেয়া সম্ভব কিনা তা নিয়ে আলাদা মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বাংলাদেশে সামনের দিনগুলোতে করোনাভাইরাসের রোগীর সংখ্যা বাড়লে তা সামাল দেয়া যাবে কিনা তা বুঝতে হলে বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হবে। এ বিষয়ে তিনি সম্প্রতি মারা যাওয়া এক সচিবের উদাহরণ টেনে বলেন, একজন অতিরিক্ত সচিব হাসপাতাল হাসপাতালে ঘুরেও ভর্তি হতে না পেরে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু আইসিইউ সেবা না পেয়ে তার মৃত্যু হয়।
লেনিন চৌধুরী বলেন, এর থেকে এটাই বোঝা যায় যে, এখন যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আছে তা বর্তমান চ্যালেঞ্জকেই সামাল দিতে পারছে না। সামনে যদি হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বেড়ে যায়, তাহলে চিকিৎসা স্বাস্থ্য সেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে। তবে এর থেকে ভিন্ন মত দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক বে-নজীর আহমেদ। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই যদি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে হয়তো সামনের দিনগুলোতে রোগীর চাপ সামাল দেয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, মানুষকে কীভাবে পুরো চিকিৎসা দেয়া হবে- তার একটা পরিকল্পনা করতে হবে।
কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে নন কোভিড রোগীরাও যাতে বাদ না পড়েন সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্যে বর্তমানে বেসরকারি চিকিৎসা খাত ইনঅ্যাকটিভ বা নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে। এটাকে অ্যাকটিভ বা সক্রিয় করা হলে চিকিৎসা সক্ষমতা বেড়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি। “সরকারি ব্যবস্থা থেকে যদি মানুষ ২০% স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে থাকে তাহলে প্রাইভেট সেক্টর থেকে ৮০% নেয়।” এছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে গিয়ে যাতে কেউ সংক্রমিত হয়ে না পড়ে সে বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সূত্র: বিবিসি।

