সন্তানদের প্রতি ঢামেক অধ্যক্ষের আবেগঘন খোলা চিঠি

সন্তানদের প্রতি ঢামেক অধ্যক্ষের আবেগঘন খোলা চিঠি

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার ১২ জুন ২০২০ । ১৭:০০

নিজের দুই চিকিৎসক সন্তানকে উপদেশ দিয়ে একটি আবেগঘন খোলা চিঠি লিখেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাঃ খান আবুল কালাম আজাদ। করোনা মহামারির মধ্যে অসহায় মানুষের চিকিৎসা সেবায় আন্তরিকতা নিয়ে কাজে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পিতার লেখা সেই খোলা চিঠিটি নিম্নে হুবহু তুলে ধরা হলো-

আমার সন্তানদের জন্য খোলা চিঠি
একজন সন্তান বাবা-মা’র কাছে বড়ো আদরের৷ বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডের সকল সম্পদের চাইতেও বড়ো সম্পদ নিজের সন্তান-নিজের নিঃশ্বাস-রক্ত-মাংস দিয়ে গড়া সন্তান; ভালোবাসার ও আদরের সন্তান। সন্তানকে আকড়ে ধরে পিতা-মাতা আনন্দ পায়, গভীরভাবে শ্বাস নেবার ক্ষমতা পায়। নিজের বিজয়ের প্রতিরূপ দেখে সন্তানের অবয়বের আঁধারে। সপ্ন দেখে আগামী দিনের সফলতার; ব্যর্থতার গ্লানি থেকে মুক্ত থাকার প্রার্থনায় নিয়োজিত থাকার।

আজ কেন এ কথা লিখছি আমার সন্তানেরা; তোমাদের সুস্থতাই কি সব? অবশ্যই আমার সন্তানেরা সুস্থতা নিয়ে দিনগুলো অতিক্রম করবে- মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন-এর কাছে সেতো প্রধান প্রার্থনা। এর সাথে রয়েছে আজ একটি বিশ্বাস। দায়িত্ববোধের বিশ্বাস; বিশ্বাস- সংগ্রামের, ভালোবাসার, পেশায় আন্তরিকতার এবং বিজয়ী হয়ে ফিরে আসবার।

যে ভাবনায় নাড়িত, উদ্বেলিত, শঙ্কিত আজ সকল মানুষেরা, তাতো আমরা অবলোকন করছি কয়টি মাস ধরেই। কোনো একটি শব্দ এভাবে আমাদের সকল মানুষকে আন্দোলিত করেনি একই সময়ে একই অনুভূতি নিয়ে গত শত বছরেও। একটি অদৃশ্য শত্রুর মুখোমখি আজ সারা বিশ্ব। অমিত শক্তিধর এ প্রতিপক্ষ!

বেশতো ভালই চলছিল মানুষের জীবন। স্বপ্ন দেখা আর সপ্ন পূরণে ব্যস্ত জীবন। হাসি-কান্নার জীবন। চাওয়া না পাওয়ার জীবন। একেবারে রুটিন মাফিক। জীবনে দ্বন্দ্ব থাকলেও ছন্দের অভাব ছিল না। অনেকে কম খেলেও খাদ্যের কমতি ছিল না। বাতাসে প্রচুর অক্সিজেন। খাল নদী সমুদ্রে প্রবাহমান পানির অনন্তধারা ইচ্ছে করলেই আকাশ ছোঁয়ার প্রেরণা।

প্রকৃতি যেমন অবলীলায় মানুষের জন্য বিছিয়ে রেখেছে শত সহস্ত্র উপহারের, তেমনই কখনো ঠেলে দিয়েছে জীবনযুদ্ধে। এসেছে ঝড় বন্যা দুর্ভিক্ষ কিংবা মহামারী। আজ এমনি এক মহামারীর সাথে জীবন যাপন আমাদের। মানুষ দিশা হারিয়ে ভাবহীন হয়ে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এগিয়ে যাচ্ছে অমোঘ পরিণতির দিকে। কোভিড-১৯ একটি রোগের নাম, একটি মহামারীর নাম। ধনী-গরীবের ব্যবধান ঘুচিয়ে করাল থাবা বসিয়েছে সকল প্রান্তে এই বিশ্বের। মানুষ এত অসহায় কখনো বোধ করেনি।

এই মহামারীতে অতন্দ্র প্রহরীর মতো মানুষের জন্য জেগে রয়েছেন যারা তাদের আমার অভিবাদন। মানুষের জন্য, জীবনের জন্য, আগামী দিনকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে উপহার দেবার জন্য যারা অকুতোভয় চিত্তে দিবারাত্রি কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের কি বলে সম্মান জানাবো তার ভাষা আজ আমি প্রকাশে অপারগ।

আমাদের চিকিৎসা কর্মীরা অতীতের অনেক বারের মতো এবারও দ্বিধা করেননি। আমাদের ডাক্তার-নার্স, টেকনোলজিস্ট, টেকনিশিয়ান, ওয়ার্ডবয়, আয়া, ক্লিনার এবং অন্যান্যরা একজোট হয়ে কাজ করছেন। সবাইকে আমার শ্রদ্ধা। এ যুদ্ধে জয়ী না হয় নিজেরা পরাজিত হবেন না- এ দোয়া মহান আল্লাহর কাছে আমাদের।

আমাদের সন্তানেরা আজ যুদ্ধে। আমাদের বড় সন্তান মার্ক আজকেও ঐ সব মানুষদের জন্য হাসপাতালে কাজ করছে। ছোট সন্তান ইশমাম প্রস্তুতি নিচ্ছে কাল থেকে একইস্থানে কাজে যোগদানের জন্য। বাবা হিসেবে একটু চিন্তা তো হয়। কিন্তু এ দেশের মানুষের জন্য আমাদের চিন্তা বেশি। মানুষদের বাঁচাতে হবে বাবা। আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করো বাবা। অন্য সহকর্মী চিকিৎসকদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দৃঢ়তার সাথে মোকাবেলা করবে কঠিন সময়কে। সকল চিকিৎসা কর্মী আমাদের সন্তান, তোমাদেরই মতো। আমার ভেতরে স্বার্থপরতা ভুতকে হত্যা করে তোমাদের এগিয়ে দিতে পেরেছি এ বড় আনন্দের।

তোমরা ভয় পেয়ো না, আমরা প্রার্থনায় থাকবো। আমাদের মানুষদের ভালোবাসা দাও, সান্তনা দাও, চিকিৎসা দাও মমত্ব দিয়ে। আমরা প্রতীক্ষায় বাবা! (লেখাটি তার ফেইসবুক থেকে নেয়া)।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading