করোনায় স্বাস্থ্যখাতে জরুরি কেনাকাটা: ‘দুর্নীতি’ দেখছে টিআইবি
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার ২০ জুন ২০২০ । আপডেট ২২:৪০
দেশে করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে মাস্কসহ সুরক্ষা সামগ্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় ‘অনিয়ম-দুর্নীতি উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করে টিআইবি। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি বলেছে, এখন সুনির্দিষ্ট কোনও নীতিমালা অনুসরণ না করে স্বাস্থ্যখাতের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে কেনাকাটা করা হচ্ছে এবং তাতে অনেক জিনিস বাজার মূল্যের কয়েকগুণ বেশি দামে কেনার মতো অনিয়ম হচ্ছে।
মহামারির সময় পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে স্বাস্থ্যখাতের এক শ্রেণীর কর্মকর্তার সহায়তায় কেনাকাটায় অনিয়ম দুর্নীতি করার চিত্র তাদের গবেষণায় ফুঁটে উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন বলেছে, দেশে করোনাভাইরাস শুরুর আগের কয়েকমাসে তারা স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির অভিযোগে ১১টি মামলা করেছে এবং এখন সুরক্ষা সামগ্রীর দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিচ্ছিন্ন দু’একটি ঘটনা ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের সব কেনাকাটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে করা হচ্ছে।

অবশ্য দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর পরই গত মার্চ মাসে সরকারের কেন্দ্রীয় ঔষাধাগার থেকে সরবরাহ করা এন৯৫ মাস্ক এবং পিপিইসহ স্বার্স্থকর্মিদের সুরক্ষা সামগ্রীর মান নিয়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। ঢাকার মুগদা জেনারেল হাসপাতাল থেকে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছেল যে, প্যাকেটে এন৯৫ লেখা থাকলেও নিম্নমানের মাস্ক এবং পিপিই দেয়া হয়েছে। তখন ব্যাপক আলোচনার মুখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তদন্ত করলেও তার ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি।
দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সুরক্ষা সামগ্রীতেই দুর্নীতি থেমে থাকেনি। চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনকহারে দুর্নীতি বৃদ্ধির তথ্য তারা গবেষণায় পেয়েছেন। তিনি বলেন, “ব্যাপকভাবে আলোচনা শুরু হয় এন৯৫ মাস্ক ক্রয়ের কেলেংকারি নিয়ে। এরপরে আরও দেখা যাচ্ছে,কেনাকাটায় এই একই ধরণের অনিয়ম হচ্ছে। এমনকি মৌখিকভাবে কার্যাদেশ দেয়া হচ্ছে। আসলে এটা যোগসাজশ করে আদায় করা হচ্ছে। যে ব্যবসায়ী বা সরবরাহকারী রয়েছে, তাদের সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার সাথে থাকা কর্মকর্তাদেরও কেউ কেউ এই অনিয়মের অংশীদার হচ্ছেন।”
তিনি আরও বলেন, “স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামো দূর্বল, এটা নতুন কথা নয়। কিন্তু এখন কোভিড-১৯ সংকটের কারণে এটা আরও ব্যাপকভাবে প্রকাশ হলো বা জানা গেলো। দেখা যাচ্ছে, যে সব জিনিস ক্রয় করা হচ্ছে, সেটার জন্য বাজারের যে মূল্য, তার থেকে পাঁচ থেকে দশ গূণ বেশি মূল্যে কেনা হচ্ছে। এ রকম সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে। এটা ব্যাপকহারে হচ্ছে।”
ড. ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্য হচ্ছে, যেহেতু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহালদশা অনেক পুরোনো। সেজন্য এখন মহামারি সামাল দিতে এই খাতে চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যাপকহারে কিনতে হচ্ছে। আর এই কেনাকাটা তাৎক্ষণিক নির্দেশে এবং অনেক ক্ষেত্রে মৌখিকভাবে করা হচ্ছে, এমন চিত্র তারা পেয়েছেন। মাস্কসহ সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক কোন ব্যবস্থা না নেয়ার কারণেও দুর্নীতি বন্ধ করা যায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা মনে করেন, স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটায় দুর্নীতির সাথে যে ঠিকাদার বা সরবরাহকারিরা জড়িত থাকে বিভিন্ন সময়, এখন করোনাভাইরাস দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে সেই শ্রেণি আর নগ্নভাবে তা করছে। “স্বাস্থ্য খাতে যে দুর্নীতি, তা কোভিড-১৯ এর প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কতটা দুর্নীতি হয়। কেনাকাটার ক্ষেত্রেই দুর্নীতিটা বেশি হচ্ছে। মেডিসিন যেসব সরকারিভাবে কেনা হচ্ছে, সেগুলো ভাল কোম্পানি থেকে নেয়া হচ্ছে না।এমন সব কোম্পানি থেকে এমন সব ঔষধ নেয়া হচ্ছে, যেগুলো ডাক্তাররা প্রেসক্রিপশনেও লেখে না।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের আইসিইউ এর অভাব আছে, অক্সিজেনের অভাব আছে। বিভিন্ন জিনিসের অভাব আছে। আর এসব কেনাকাটায় আমরা দুই টাকার জিনিস ২০০০ টাকা পর্যন্ত দেখাচ্ছি। এখন এই দুর্যোগে যে সঠিক জিনিসটা দেয়া প্রয়োজন, তারা সেটাই ভুলে গিয়েছে।”
দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর আগের চার মাসে অর্থাৎ গত বছরের নভেম্বর থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়ে পর্দা কেলেংকারিসহ স্বাস্থ্যখাতে দুদক ১১টি দুর্নীতির মামলা করেছে। এখন মাস্কসহ সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, “স্বাস্থ্য খাতে অভিযোগ আমরা আগে থেকেই পাচ্ছিলাম। আমরা এ পর্যন্ত প্রায় ১১টি মামলা করেছি স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটার বিষয় নিয়ে। অনেকেই বিহাইন্ড দ্য বার গেছেন। অনেকে আবার দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। ১১টি মামলার আসামি অনেক। এখানে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা কর্মচারীরাও রয়েছে। আমরা এই দুর্নীতিগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করছিলাম। এরই মাঝে মাস্ক, পিপিই নিয়ে অভিযোগ এসেছে এবং তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।”
তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেছেন, মাস্কসহ সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সূত্র: বিবিসি।

