টাকার অভাবে এনআইসিইউতে নবজাতক রেখে উধাও বাবা-মা, টাকা দিলেন এসপি
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০ । ১১:৫০
টাকার অভাবে কুমিল্লা নগরীর বেসরকারি একটি হাসপাতালের এনআইসিইউতে নবজাতক সন্তানকে ভর্তি করে উধাও হয়ে গেছেন বাবা-মা। লক্ষাধিক টাকা বিল পরিশোধের ভয়ে এ সন্তানকে দেখতে আসেননি শিশুটির বাবা-মাসহ স্বজনরা। ফলে শিশুটিকে নিয়ে বিপাকে পড়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে তারা শিশুটির চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়লে নজরে আসে পুলিশ সুপার (এসপি) সৈয়দ নুরুল ইসলামের। এরপরই শিশুর সার্বিক ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব নেন তিনি। পরে এ খবর শুনে রবিবার (১২ জুলাই) হাসপাতালে ছুটে আসেন শিশুটির বাবা-মা।
জানা যায়, ৫ জুলাই দুপুরে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সদর উপজেলার আড়াইওরা গ্রামের হতদরিদ্র মিজানুর রহমানের স্ত্রী শিরীন আক্তার জমজ সন্তানের জন্ম দেন। জন্মের পর একটি শিশু মারা যায় এবং অপর মেয়ে শিশুটির জীবন সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসক তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। কিন্তু ওই পরিবারটির ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় তাকে নগরীর ঝাউতলা এলাকার কুমিল্লা মা ও শিশু স্পেশালাইজড হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে উধাও নবজাতকের বাবা। হাসপাতালে ভর্তির সময় শিশুটির বাবা মিজানুর রহমান যে নম্বর দিয়েছিলেন তাতে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ৮ জুলাই কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে শিশুটির মা শিরীন আক্তারকে নবজাতকের বিষয়ে অবগত করে হাসপাতালের লোকজন। এরপরই হাসপাতালে ছুটে আসেন শিশুটির মা। পরে তিনি উধাও হয়ে যান। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নজরে আসে কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলামের। এরপরই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিশুটির সার্বিক ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব নেন। এ খবর পেয়ে রবিবার দুপুরে হাসপাতালে ছুটে আসেন শিশুটির বাবা-মা।
হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. এমরান বলেন, ‘শিশুটি প্রি-ম্যাচিউর। ভর্তির সময় তার ওজন ছিল সাড়ে ৭০০ গ্রাম। অন্য শিশুকে যে ধরনের সাপোর্ট দিয়ে থাকি, এর ক্ষেত্রেও আমরা একই ধরনের সাপোর্ট দিয়েছি। মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। বর্তমানে শিশুটি উন্নতির দিকে রয়েছে।’ জানা যায়, ৭ দিনে চিকিৎসা বাবদ বিল আসে ১ লাখ ৩০ হাজার ১০৭ টাকা।
এ নিয়ে শিশুটির বাবা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার টাকা দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। তাই ফোন রিসিভ করিনি এবং হাসপাতালে আসিনি।’
শিশুটির মা শিরিন আক্তার বলেন, ‘সন্তান ভর্তির পর টাকার জন্য হাসপাতালে আসতে পারছি না। এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে। এ কারণে আমার স্বামী হাসপাতালে আসতে পারেননি।
তিনি বলেন, আমার অসুস্থতা স্বত্ত্বেও হাসপাতালের বিল পরিশোধের জন্য অনেকের কাছে টাকার জন্য ছুটে গিয়েছি। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি, আমাদের পাশে কেউ এসে দাঁড়ায়নি। মেয়ের জন্য আমার মন কাঁদলেও তাকে দেখতে হাসপাতালে আসতে পারিনি। আমরা একেবারেই নিরুপায় হয়ে পড়েছিলাম। এসপি স্যার আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমরা স্যারের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আমার কাছে মনে হয়েছে আল্লাহ যেন এসপি স্যারকে একজন ফেরেশতা হিসেবে আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন।
এসপি বলেন, ‘এখানে ৭ দিনে যে বিল এসেছে হতদরিদ্র এ দম্পতির তা পরিশোধের সামর্থ্য নেই। আমরা খোঁজ নিয়ে এর সত্যতা পেয়েছি। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে শিশুটি সুস্থ হওয়া পর্যন্ত আমরা চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি শিশুটি যেন বেঁচে থাকে এবং দৃষ্টান্ত হিসেবেই যেন সে পৃথিবীতে থাকে। মানুষের সহযোগিতায় যে বেঁচে থাকা যায় বা আর্থিক সঙ্গতি না থাকলেও কেউ না কেউ এগিয়ে আসে, এটা কুমিল্লা জেলা পুলিশ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।’ সূত্র – বাংলা ট্রিবিউন।

