সবটুকু সাধ্য দিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাবো: প্রধানমন্ত্রী

সবটুকু সাধ্য দিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাবো: প্রধানমন্ত্রী

উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০ । আপডেট: ১৪:৫৪

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সাধ্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। তিনি একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ গড়তে চেয়েছিলেন। এদেশকে করতে চেয়েছিলেন সোনার বাংলা। ঘাতকরা তাকে সে সময় দেয়নি। কিন্তু আমি আমার সবটুকু সাধ্য দিয়ে কাজ করে যাবো তার সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে, যাতে তার আত্মা শান্তি পায় এবং রক্ত বৃথা না যায়।’

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে ‘মুজিব বর্ষ’ উপলক্ষে ইতোমধ্যে সম্পন্ন ৫০ হাজার বার পবিত্র কোরআন খতম এবং জাতির জনকের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে তিনি এই কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে যারা হত্যা করেছে তারা ঘৃণ্য। ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে দিয়ে তাদের বিচার করতে পেরেছি। এতে আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া আদায় করি। কৃতজ্ঞতা জানাই বাংলাদেশের মানুষকে, যারা আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। আমার দল আওয়ামী লীগসহ সব সহযোগী সংগঠনের পাশে থেকে কার্যত আমার পাশে থেকেই আমাকে শক্তি জুগিয়েছেন একটা পরিবারের মতো।’

অনুষ্ঠানে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে জাতির জনকের আজীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন তার বড় মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা, নিজের ছয় বছর নির্বাসিত জীবন এবং দেশে ফেরার পর প্রতিকূল পরিস্থিতিও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘মানুষ একটা শোক সইতে পারে না। আর আমরা কী সহ্য করে আছি। শুধু একটা চিন্তা করে যে, এই দেশটা আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন করেছেন। তিনি এদেশের দুখী মানুষের মেুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন। তাদের মুখে যাতে খাবার থাকে, যাতে তারা সুখে-শান্তিতে থাকে, খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসা পায়। পাশাপাশি বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ যেন স্বমহিমায় উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আর সেজন্য তিনি সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। ত্যাগ ও শ্রমে তার স্বপ্নের প্রাথমিক বাস্তবায়ন করেছেন দেশ স্বাধীন করে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী তাকে সম্পূর্ণ লক্ষ্য পূরণের আগেই সপরিবারে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে।’ এদেশে যাতে আর এমন নির্মম-নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড না ঘটে সে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় তিনি নিজে (শেখ হাসিনা) কাজ করছেন বলে জানান।

মিলাদে অংশ নেওয়া এতিম শিশুদের উদ্দেশে সরকারপ্রধান বলেন, ‘নিজেরা এতিম হয়েছি বলে এতিমের কষ্টটা আমরা খুব ভালো বুঝি। বাবা-মা না থাকার কষ্টটা আমি বুঝি। এই কষ্ট আরও বুঝলাম ৭৫ এর ১৫ আগস্ট। একদিন সকালে উঠে যখন শুনলাম আমাদের কেউ নেই। এই ১৫ আগস্ট আমি হারিয়েছি আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। আমার মা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সব সময় ছায়ার মতো বাবার সঙ্গে ছিলেন।’

জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার ছোট ভাই, আমার চেয়ে দুই বছরের ছোট ছিল। ক্যাপ্টেন শেখ কামাল সে মুক্তিযোদ্ধা ছিল। তাকে হত্যা করে। তার নবপরিণিতা বধূ সুলতানা কামালকেও হত্যা করে। যার হাতের মেহেদীর রঙ তখনও মোছেনি। তার বুকের রক্তে তার হাত যেন আরও রাঙিয়ে যায়। তার থেকে ছোট লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, সে সেনাবাহিনীর একজন অফিসার। বিলাতে মিলিটারি একাডেমি থেকে ট্রেনিং নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছিল। তাকেও এই খুনিরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীরই কিছু বিপথগামী সদস্য এবং কিছু উচ্চপদস্থ ছিল যারা এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত, নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। হত্যা করেছিল তারও নবপরিণিতা বধূ রোজী জামালকে। যে আমার ছোট ফুফুর মেয়ে ছিল। অনেক শখ করে তাকে ঘরে আনা হয়েছিল। আমার একমাত্র চাচা শেখ আবু নাসের। তিনিও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি পঙ্গু ছিলেন। কিন্তু তিনিও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।’

আবেগাক্রান্ত হয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ছোট ভাইটি! আমি এখনও এই প্রশ্নের উত্তর পাই না। তার মাত্র ১০ বছর বয়স। তার জীবনের স্বপ্ন ছিল সে একদিন সেনাবাহিনীতেই যোগদান করবে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস তাকে সেই সেনাবাহিনীর সদস্যরাই নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করলো। তার অপরাধ কী?’ ‌’কর্নেল জামিল যিনি আমার বাবার মিলিটারি সেক্রেটারি ছিলেন। এই খবর পেয়ে তিনি ছুটে এসেছিলেন। তাকেও তারা হত্যা করেছিল। তিনি তো সামরিক বাহিনীর বড় অফিসার ছিলেন। কিন্তু এই সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।’

‘আমি আর আমার ছোট বোন বিদেশে ছিলাম। আমার স্বামী তখন জার্মানিতে। আমি সেখানে গিয়েছিলাম অল্প কিছু দিনের জন্য। কিন্তু আর দেশে ফিরতে পারিনি। ছয় বছর আমাদের দেশে আসতে দেওয়া হয়নি। আমার বাবার লাশও দেখতে পারিনি। কবরও জিয়ারত করতে পারিনি। আসতেও পারিনি। এতিম হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে বিদেশের মাটিতে রিফিউজি হয়ে থাকার মতো কী কষ্ট এটা আমাদের মতো যারা ছিল তারা জানে। আমাদের পরিবারের আত্মীয়-স্বজন যারা গুলিতে আহত, যারা কোনোমতো বেঁচে ছিল তারাও ওভাবে রিফিউজি হয়ে ছিল দিনের পর দিন।’ আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘৮১ সালে আমি দেশে ফিরে আসি। স্বাভাবিক ভাবে আমার চেষ্টাই ছিল যে বাংলাদেশের মানুষের জন্য আমার বাবা সারা জীবন সংগ্রাম করে গেছেন, জেল জুলুম অত্যাচার সয়েছেন, এদেশের সেই মানুষের জন্য কিছু করে যাবো। সেটাই ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য।’

সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজ একটা হত্যাকাণ্ড হলে সবাই বিচার চাইতে পারে, মামলা করতে পারে। ১৫ আগস্ট আমরা যারা আপনজন হারিয়েছিলাম আমাদের কারও মামলা করার বা বিচার চাওয়ার অধিকার ছিল না। সেই অধিকারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ইনডেমনিটি অর্ডিনেন্স জারি করে। খুনিদের সমস্ত দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। তারা পুরস্কৃত হয়েছিল এই খুন করার জন্য। নারী হত্যাকারী, শিশু হত্যাকারী, রাষ্ট্রপতি হত্যাকারী তাদের পুরস্কৃত করা হয়। এই রকম ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেছে। আমি সেই অবস্থা থেকে পরিবর্তন আনতে চাই। এদেশে সব মানুষ যেন নিরাপদে থাকতে পারে, সব মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে, ন্যায়পরায়ণতা যেন সৃষ্টি হয়। মানুষের অধিকার যেন সমুন্নত থাকে সেদিকে আমরা লক্ষ্য রাখি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীনতার পর জাতির পিতা সমাজকল্যাণে অনেক অনেক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সংবিধানেও আমাদের শিশুদের অধিকারের কথা বলেছেন। শিশু অধিকার আইন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই করে দিয়ে গেছেন। আমাদের সব সময় প্রচেষ্টা থাকবে যারা এতিম, মা-বাবা হারা তারা যেন সুষ্ঠুভাবে মানুষ হতে পারে।’

এ অনুষ্ঠানে গণভবন প্রান্তে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সমাজসেবা অধিদফতর প্রান্তে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, প্রতিমন্ত্রী মো. আশরাফ উদ্দিন খান খসরু এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জয়নুল বারীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তথ্য সহায়তা বাংলাট্রিবিউন।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading