করোনা ঝুঁকির মধ্যে বাংলাদেশসহ ৪ দেশের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা

করোনা ঝুঁকির মধ্যে বাংলাদেশসহ ৪ দেশের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা

উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ । আপডেট: ০৯:২২

অল্প স্বাস্থ্যসুরক্ষা সরঞ্জাম ও সীমিত হ্যান্ডওয়াশ এবং অন্যান্য জীবাণুমুক্তকরণ সুবিধাহীনতার মধ্যেই বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার আরও তিনটি দেশের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন বলে ওয়াটারএইডের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সেফটি অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং অব স্যানিটেশন ওয়ার্কার্স ডিউরিং কোভিড-১৯ ইন সাউথ এশিয়া শীর্ষক এ প্রতিবেদনে কোভিড-১৯ মহামারি কীভাবে দক্ষিণ এশিয়ার পরিচ্ছন্নতা ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্মীদের জীবনকে প্রভাবিত করছে সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সমাজের অন্যতম একটি গুরুদায়িত্ব পালন করে থাকেন। যা করোনার লকডাউনের সময়ও অব্যাহত ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদেরকে অধিকাংশ সময়েই স্বল্প বেতনের বিনিময়ে একটি অনিশ্চয়তাপূর্ণ জীবনযাপন করতে হয় যার সাথে যুক্ত হয় চিরায়ত সামাজিক গোঁড়ামি ও বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি।

এ নিয়ে এপ্রিলের শেষ থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ছয় সপ্তাহব্যাপী বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানে একটি গবেষণা চালানো হয়। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের বিভিন্ন ধারার সাথে জড়িত কর্মীদেরকে এ গবেষণার আওতায় সাক্ষাতকার নেয়া হয়। যাদের মধ্যে বর্জ্য সংগ্রহকারী, ঝাড়ুদার, ল্যাট্রিন এবং হাসপাতাল পরিষ্কারকর্মীরা ছিলেন বলে বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) সংস্থাটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে, কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের মাঝে রোগ সংক্রমণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি চারটি গবেষণার প্রতিটিতেই উঠে এসেছে। বাংলাদেশ থেকে সাক্ষাতকার দেয়া ১০জন কর্মীর আটজনই বলেছেন, পেশাই তাদেরকে উচ্চতর ঝুঁকির সম্মুখীন করেছে।

অধিকাংশ কর্মীর মধ্যেই ঝুঁকি রোধে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) ব্যবহার প্রসঙ্গে স্পষ্ট ধারণা থাকা সত্ত্বেও এর যথাযথ সরবরাহ ও ব্যবহার ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে পিপিই সরবরাহ করা হলেও এর মাপ, গুণগত মান ও পর্যাপ্ততা প্রসঙ্গে অসঙ্গতি দেখা গেছে।

মাস্ক এবং গ্লাভসের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে পর্যাপ্ত দেখা গেলেও অন্যান্য বিশেষায়িত উপকরণ, যেমন অ্যাপ্রন বা গগলসের ক্ষেত্রে সরবরাহ ও ব্যবহার ছিল অপ্রতুল। এমনকি হাসপাতাল পরিষ্কারকর্মীদের মতো উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রেও এ অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। নেপালের মোট পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের এক তৃতীয়াংশকে তাদের নিয়োগকারীদের কাছ থেকে কোনো পিপিই দেয়া হয়নি। ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের কর্মীরাও গরমের মধ্যে পিপিই পরে কাজ করতে গিয়ে সমস্যা অনুভব করেছেন বলে জানিয়েছেন।

পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিজ কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হয়ে থাকেন, এমনকি বিভিন্নভাবে আহত বা নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। কোভিড-১৯ মহামারি তাদের এ পেশাগত ঝুঁকিকে আরও বহুগুনে বাড়িয়ে দিয়েছে এবং তাদের অনেকেই সীমিত স্বাস্থ্য সুরক্ষার মাঝে প্রায় কোনো স্পষ্ট দিক নির্দেশনা ছাড়াই কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

সাবান ও পানির পর্যাপ্ততার ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত হাত ধোয়ার চর্চাটিও ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন চিত্রের জন্ম দিয়েছে। ভারতে অধিকাংশ কর্মীই একেকটি কর্মদিবসে অন্তত দুইবার হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজ করার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ৪০ ভাগ কর্মী জানিয়েছেন, তাদের কর্মস্থলে কোনো নির্ধারিত হ্যান্ড ওয়াশিং স্টেশন নেই এবং প্রায়শই কোভিড-১৯ সংক্রান্ত ক্রান্তিকালেও সকলের মাঝে হাতধোয়ার চর্চাটি নিয়মিত ছিল না।

চারটি দেশের অসংখ্য পরিচ্ছন্নতাকর্মী তাদের জীবিকা সংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অন্তত অর্ধেক অংশগ্রহণকারী তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন বলে জানান। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সরঞ্জামের মূল্যবৃদ্ধি সমস্যাটিকে আরও প্রকট করে তোলে। অল্প কিছু সংখ্যক কর্মী বাদে অধিকাংশ পরিচ্ছন্নতাকর্মীরই সামাজিক ঝুঁকি নিরসন ও জরুরি সেবা নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য চেষ্টা ছিল না।

ওয়াটারএইডের সাউথ এশিয়ার রিজিওনাল অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার ভানিতা সুনেজা বলেন, ‘মহামারিকালেও কাজ করে যাওয়া ছাড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আর খুব বেশি কিছু করার নেই। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা এ কাজটি করে যাচ্ছেন যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা বা কোনো বিশেষ পুরষ্কারের প্রত্যাশা ছাড়াই।’

তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সরকারের উচিত ঝুঁকির মাঝে কাজ করে যাওয়া এ পরিচ্ছন্নতাকর্মীদেরকে একটি নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় নিয়ে আসা। যাতে হেলথ ইন্স্যুরেন্স, গাইডলাইন ও ট্রেনিং সুবিধা থাকবে। কেবলমাত্র যথাযোগ্য স্বীকৃতি এবং নিরাপত্তার মাধ্যমেই এ স্বার্থহীন মানুষগুলো সুস্থ থেকে সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করে যেতে পারবেন।’

বিদ্যমান ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অতিসত্ত্বর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কর্ম পরিবেশ ও জীবনযাপনের অবস্থার দীর্ঘমেয়াদী উত্তরণ ঘটিয়ে বহুবছর ধরে টিকে থাকা সামাজিক গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসতেও একাগ্র প্রচেষ্টার প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্র – ইউএনবি

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading