রোকেয়া আশা’র ছোটগল্প ।। ল্যাম্পপোস্ট

রোকেয়া আশা’র ছোটগল্প ।। ল্যাম্পপোস্ট

শিল্প-সাহিত্য । উত্তরদক্ষিণ
মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। আপডেট: ১৩:৩৩

আমার প্যারিসে বসবাসটা রুপকথার মতো হতে পারতো। কিংবা হ্যাঁ, কিছুটা রুপকথা তো নিশ্চয়ই। এখানে এখন আমি ভবঘুরে এক তরুণ। প্রতি শনিবার রাতে রাস্তার মোড়ে মোড়ে বেহালা বাজিয়ে বেড়াই। লোকে ছুটে ছুটে যাওয়ার সময় পয়সা ছুড়ে দেয়। আমি স্মিত হেসে সেসব পয়সা কুড়িয়ে আমার পকেটে রাখি। যদিও এই পয়সাগুলো আমি কখনো খরচ করি না। পেশাগত জীবনে আমি একজন লেখক। বই লিখে যা রয়্যালটি পাই তাতে আমার বেশ চলে যায়। তারপরও আমি প্রতি শনিবার রাতে একজন সর্বহারা বেহালাবাদক সেঁজে রাস্তার মোড়ে দাঁড়াই। এই অদ্ভুত শখটা ছিলো বটে একজনের। আমার নয়। আমি বেহালা বাজাতাম না আগে। বেহালা বাজাতো সুজাতা।

সুজাতার সাথে আমার পরিচয় হয় কলকাতায়। আমি ক্যালিফোর্নিয়ার ছেলে। ভারতে সেবার গিয়েছিলাম ক্রিস্টমাসের এক সপ্তাহ আগে। ছুটি কাটাতে। কলেজ বন্ধ ছিলো। আর কলেজে নৃবিজ্ঞানে ভর্তি হওয়া প্রথম বর্ষের ছাত্র আমি আমার সারাবছর ধরে জমানো টাকাটা যে ভারতের ট্রিপের জন্য খরচ করতে চাইবো তা আমার বাবাও ভাবেননি। কিন্তু আমি তখন ম্যালিনোস্কির আদর্শে উদ্ভুদ্ধ এক তরুণ। নিজের চোখে ভিন্ন একটা জাতিগোষ্ঠী দেখার প্রবল আগ্রহ, তার ওপরে আঠারো বছর পেরিয়ে গেছে আমার তখন। কাজেই আমি আমার নিজের রোজগারের টাকা দিয়ে আমার ছুটি কীভাবে কাটাবো সে বিষয়ে বাবার কিছু বলার ছিলো না।

কলকাতায় আমার দ্বিতীয় রাতে আমি একাই বের হই। রাতের বেলা গাইড রেখে বাড়তি টাকা খরচের ইচ্ছে আমার মোটেও ছিলো না। একা একাই ইতস্তত হাঁটতে হাঁটতে আমি পার্কস্ট্রিট পেরোনোর সময় থমকে দাঁড়াই। ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ানো তাকে দেখে। কিশোরী। সাদা উলের টুপির নিচ থেকে দু’কাঁধে ঝোলা দুটো বেণি, লাল ওভারকোট, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগে উকুলেলে, নাকি বেহালা তখনো জানি না। তবে আমাকে সেখানে থামিয়ে দিয়েছিলো তার বড় বড় ঝকমকে দুটো এম্বার রঙের চোখ। ভারতীয়দের এই চোখগুলো ভারি অদ্ভুত। বড় উজ্জ্বল।

সেদিন ছিলো শনিবার। আমি এগিয়ে যাই। সে তার বড়ো চোখ দুটো তুলে আমার দিকে তাকায়। তারপর কথা হয়। সে তার নাম জানায়, সুজাতা সেন। মিশনারি স্কুলে পড়ছে, ক্লাস ইলেভেন। সতেরো বছর বয়স। মিশনারি স্কুলের ছাত্রী বলেই কি না, ভালো ইংরেজি বলে। কোন দ্বিধাহীন সেই কিশোরী আমার সাথে হাঁটলো কিছুদূর। না, বেশি  দূর যায়নি। তার বাবা কাছাকাছিই ছিলো। ভদ্রলোক এগিয়ে এসে সুজাতার কাঁধে হাত রাখলেন। কথা বললেন তিনিও। আমি ভারতকে জানতে এসেছি শুনে খুশি হয়ে আমায় নিমন্ত্রণ জানালেন তার বাড়িতে। পরেরদিন অবশ্যই।

সেই পরেরদিনই আমি সুজাতার বাড়ি যাই। ভারি সাদামাটা বাড়ি। পলেস্তারা খসে পড়া দেয়াল অথচ ঝকঝকে পরিষ্কার। তাদের বসার ঘরটায় কেবল পুরনো একটা সোফাসেট, একপাশে নিচু ডিভানের মতো পাতা। পরে নাম জেনেছি, ওটা চৌকি। আমার আজও তার উচ্চারণ ঠিকমতো আসে না। একটা শোকেস। কাঠের টেবিলে টেলিভিশন। সুজাতার মা এসেছিলেন, মেটালের একটা বাটিতে করে ডেজার্ট নিয়ে। পায়েস। আরেকটা থালায় বেগুন ভাজা, পাশে লুচি।

ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে দেখি সেই একইরকম এম্বার রঙের বড়ো দুটো চোখ। লাল পাড়ের ল্যাভেন্ডার রঙের শাড়ি। আঁচল মাথায় তুলে দেওয়া। আর মাথার মাঝবরাবর টকটকে লাল একটা নদীর মতো সিঁদুর। দুপাশে ঘন কালো উঁচু ডাঙা। কপালেও সেই একই লাল বড় একটা বৃত্ত। আর তার নাকে জ্বলজ্বলে একটা ছোট্ট পাথর। আমি ভাবি, সুজাতাও নিশ্চয়ই বিয়ের পরে এমনই দেখতে হবে। এমনই টিপ, সিঁদুর আর নাকফুল পরবে। এমনই শাড়ি পরবে।

আমার ধ্যান ভাঙে মিস্টার সেনের ডাকে। তিনি খাবারগুলো দেখিয়ে জানান, ওগুলো বাঙালি খাবার। ভারত বহু জাতির দেশ। বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে কথা বললেন তিনি। আমি মাথা নেড়ে কথা শোনার ভান করছিলাম। যদিও আমার চোখ খুঁজছে তখন সুজাতাকে। সে আসেনি এ ঘরে। সুজাতা বেরিয়ে আসে তার কিছুক্ষণ পর। তখন বেলা এগারোটা। শীত তেমন নেই। ওর পরনে টিয়া রঙের চুড়িদার। শিফনের ওড়না। সুজাতা আর ওর বাবা বের হয় আমাকে কলকাতা ঘুরিয়ে দেখাতে।

এরপরের স্মৃতি আমার কাছে তত স্পষ্ট নয়। শুধু মনে পড়ে সুজাতা বলেছিলো তার বোহেমিয়ান স্বপ্নের কথা। সে চেয়েছিলো প্যারিসে গিয়ে রাস্তার মোড়ে মোড়ে বেহালা বাজিয়ে বেড়াবে।

পরিশিষ্ট: স্যাম নামের তরুণ বেহালাবাদককে আরও একটি শনিবার এক মার্সিডিজ নিয়ে আসা ভদ্রলোক জোর করে ধরে নিয়ে যায় ল্যুভরের বিপরীত পাশের ল্যাম্পপোস্টের নিচ থেকে। ভদ্রলোকের চোখে যখন অশ্রু। তিনি স্যামের বাবা, লুই। স্যামের ক্যালিফোর্নিয়ান মা সুজান ছিলেন একজন বেহালাশিল্পী। যার বোহেমিয়ান স্বপ্ন ছিলো প্রতি শনিবার প্যারিসের রাস্তার ধারে বেহালা বাজানো।

স্যাম এবং লুইয়ের দুর্ভাগ্য। স্যামের জন্মের পর থেকে আটবছর শয্যাশায়ী থেকে সুজান এক ডিসেম্বরের রাতে রুগ্ন শরীরটাকে জোর করে টেনে নিয়ে যান বাড়ির বিপরীতের ল্যাম্পপোস্টের নিচে। সেখানে দাঁড়িয়ে বেহালা বাজাতে বাজাতে সুজানের মৃত্যু হয়৷ স্যাম কখনো কলেজে যায়নি। স্যাম কখনো ভারতে যায়নি৷

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading