মুজিববর্ষে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচী ও সামাজিক বনায়নে আমাদের কর্তব্য
সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১
একটা সময়ে এদেশের মানুষের আর্থসামাজিক জীবনে গাছ গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। গ্রামের হাটবাজার বসত বড় কোনো গাছের তলায়। ক্লান্ত পথচারী বিশ্রাম নিত রাস্তার পাশের বড় বৃক্ষের ছায়ায়। সময়ের পরিক্রমায় আজ হারিয়ে যেতে বসেছে সমাজের গাছকেন্দ্রিক উপাদানগুলো। সবুজ-শ্যামলে ভরপুর বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু গাছের জন্য অনুকূল বলে অসংখ্য জাতের গাছগাছালি দেখা যেত সবখানে। কিন্তু এখন নানা প্রয়োজনে গাছ কাটা হলেও আমাদের মাঝে গাছ লাগানো ও এর পরিচর্যা করার প্রবণতা নেই। তাই কমে যাচ্ছে গাছের সংখ্যা। ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে মানুষসহ বহু জাতের প্রাণীও।
দেশে সবুজ বনভূমির পরিমাণ বাড়ানোর মাধ্যমে পরিবেশের হারানো সমৃদ্ধি ফেরাতে দরকার সামাজিক বনায়ন। সামাজিক বনায়ন হলো এমন এক ধরনের বনায়ন, যার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকেন স্থানীয় জনগণ। সাধারণত, স্থানীয় দরিদ্র জনগণকে উপকারভোগী হিসেবে সম্পৃক্ত করে পরিচালিত হয় বনায়ন কার্যক্রম, যার প্রত্যক্ষ সুফলভোগী ও উপকারভোগী হয়ে থাকেন তারা। সামাজিক বনায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা, বনজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা, লভ্যাংশ বণ্টন ও পুনঃবনায়ন সব কাজেই স্থানীয় দরিদ্র জনগণ ওতোপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। ভূমিহীন, দরিদ্র, বিধবা ও দুর্দশাগ্রস্থ গ্রামীণ জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করাই সামাজিক বনায়নের প্রধান লক্ষ্য। সামাজিক বনায়নের মূল উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র জনগোষ্ঠির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে তাদের স্বনির্ভর হতে সহায়তা করা এবং তাদের খাদ্য, পশুখাদ্য, জ্বালানি, আসবাবপত্র ও মূলধনের চাহিদা পূরণ করা। নার্সারি সৃজন, প্রান্তিক ও পতিত ভূমিতে বৃক্ষরোপণ করে বনজ সম্পদ সৃষ্টি, মরুময়তারোধ, ক্ষয়িষ্ণু বনাঞ্চল রক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধি, পরিবেশ উন্নয়ন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নারীর ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্ব সৃষ্টি এবং সর্বোপরি কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য নিরসনে সামাজিক বনায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একটি দেশের মোট ভূখণ্ডের কমপক্ষে ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা দরকার। বাংলাদেশের বর্তমানে আছে মাত্র ১৭.৫ ভাগ। দিন দিন তা কমে আসছে। তবে এ বছরের জুলাইয়ে ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী তথা মুজিববর্ষ’ উদযাপনের অংশ হিসেবে সারা দেশে এক কোটি চারা বিতরণ ও রোপণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে তিনি ‘জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ২০২০’রও উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী গণভবনে তেঁতুল, ছাতিয়ান ও চালতা গাছের চারা রোপণ করেন। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বেশকিছু আশা জাগানিয়া কথা বলেছেন।
সেসময় তিনি বলেছেন, করোনাভাইরাস যদিও আমাদের সব অগ্রযাত্রা সাময়িকভাবে থামিয়ে দিয়েছে, আমার আশা জনগণ এর থেকে মুক্তি পাবে এবং আমরা আবারও এগিয়ে যাব। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা যেমন দরকার, তেমনি দরকার জনগণের খাদ্য ও পুষ্টি।
স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে বৃক্ষরোপণ করে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৪ সাল থেকে প্রতি বছর পহেলা আষাঢ় আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন কৃষক লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করে আসছে। এবার মুজিববর্ষ উপলক্ষে বিশেষভাবে এই কর্মসূচিটি পালিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর ডাকে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রত্যেক নাগরিকেরই উচিৎ এই কর্মসূচি যথাযথভাবে পালনে এগিয়ে আসা। বস্তুত ফলদ, বনজ ও ভেষজ- এ তিন ধরনের বৃক্ষরোপণের যে তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, তা শুধু আর্থিকভাবেই দেশের জন্য ফলপ্রসূ হবে না, সারা দেশে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে। প্রধানমন্ত্রী এ লক্ষ্যেই যে যেখানে অবস্থান করছেন, যার যতটুকু জায়গা রয়েছে, সেখানে বৃক্ষরোপণ করতে বলেছেন। যারা শহরে বাস করেন, তারাও ব্যালকনি কিংবা ছাদে টবে গাছ লাগাতে পারেন।
দেশে বায়ুদূষণ থেকে শুরু করে নানা ধরনের দূষণ বিরাজ করছে। সারা দেশে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে পারলে এসব দূষণ থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাছাড়া বৃক্ষরোপণের আর্থিক উপযোগিতাও রয়েছে। এক কথায়, সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে, দূষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে, সর্বোপরি আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে হলেও বৃক্ষরোপণের বিক্ল্প নেই। তাই আমাদের উচিত শুধুমাত্র মুজিববর্ষ বলে কথা নয়, সারাবছরই যার যার নিজ অবস্থান থেকে বৃক্ষরোপণ ও তা সংরক্ষণে উদ্যোগী হওয়া।

