স্বপ্নের পদ্মা সেতু: ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে জাতির সাফল্যের প্রতীক
শব্দনীল | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১
পদ্মা সেতুর শেষ স্প্যান বসবে আজ। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের বহুকাঙ্খিত স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের প্রাণের ও সর্বস্তরের একটাই দাবি ছিল পদ্মা সেতু। ৪১তম স্প্যান বসার ফলে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটারের সম্পূর্ণ সেতুটি দৃশ্যমান হচ্ছে। এর আগে বসানো হয়েছে ৪০টি স্প্যান। ৪১তম স্প্যান (২-এফ) বসবে সেতুর ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারের ওপর। তবে, মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের মাওয়ার কুমারভোগ কন্সট্রাকশন ইয়ার্ডের স্টিল ট্রাস জেটি থেকে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ধূসর রঙের স্প্যানটি গতকাল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভাসমান ক্রেন তিয়ান-ই-তে করে কাঙ্ক্ষিত পিলারের কাছে চলে আসে। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান বসে ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। যদিও স্প্যান নয়, কোটি মানুষের স্বপ্নের বীজ বপন হয়েছিলো সেদিন। ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আজ ৪১তম স্প্যান বসানোর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন দেখানো জাতির সাফল্যে প্রতিক সম্পূণ দৃশ্যমান হচ্ছে।
স্বপ্নপূরণের শুরু এতটা সহজ ছিলো না বরঞ্চ এটি একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়ও ছিলো আমাদের কাছে। বিশ্বে আমাজন নদীর পর অন্যতম দীর্ঘতম ও খরস্রোতা নদী পদ্মা। এই নদীর গভীরতা ও স্রোতের প্রখরতা জয় করে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করার আগে আমাদের জয়ী হতে হয়েছে ঋণ দাতা সংস্থার রাজনীতিক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের সবচেয়ে দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক ছাড়াও আরও অনেক দাতা সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে বাস্তবায়ন হচ্ছে অনেক বড়বড় প্রকল্প। বাস্তবায়ন ও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে অসংখ্য কর্মসূচি। তবে এই দেশের উন্নয়নমূলক কর্মসূচি তাদের অংশগ্রহণ একেবারে নিংস্বার্থ নয়। যতটা না তারা আমাদের সহযোগিতা করছে, তার কোনও অংশেই পিছিয়ে নেই নিজেদের ও বহির্বিশ্বের প্রভুদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন সফল করতে এবং ছোট দেশগুলোর উপর নিজেদের চাবি ঘোরাতে। প্রকল্প প্রস্তুতির শুরুর দিকে কিছু লোকের দুর্নীতির অভিযোগ উঠিয়ে বিশ্বব্যাংকসহ কয়েকটি দাতা সংস্থা ২০১৩ সালে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকার পদ্মা সেতু নিজেস্ব অর্থায়নে নির্মানের এক যুগান্তকারী সিন্ধান্ত নেয়। এতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রমাণ পায়।
পদ্মা সেতু বাংলাদেশের পদ্মা নদীর উপর নির্মাণাধীন একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। এর মাধ্যমে লৌহজং, মুন্সিগঞ্জের সাথে শরিয়তপুর ও মাদারীপুর যুক্ত হবে, ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সাথে উত্তর-পূর্ব অংশের সংযোগ ঘটবে। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য পদ্মা সেতু হতে যাচ্ছে ইতিহাসের একটি চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। দুই স্তর বিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাস ব্রিজটির ওপরের স্তরে থাকবে চার লেনের সড়ক পথ এবং নিচের স্তরটিতে থাকবে একটি একক রেলপথ। পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর আববাহিকায় ১৫০মিটার দৈর্ঘ্যর ৪১টি স্পান বসবে, ৬.১৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৮.১০ মিটার প্রস্থ পরিকল্পনায় নির্মিত হচ্ছে দেশটির সবচেয়ে বড় সেতু। সরকারের পরিকল্পনা অনুসারে ২০২০ সালের শেষের দিকে এটি যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও করোনা জন্য পরিকল্পনা পেছানো হয়েছে। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষে স্বপ্নের পদ্মা সেতু সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভাবনা আছে।
প্রকল্পটি শুরুর দিকে তিনটি জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করবে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া পয়েন্টের উত্তর পাড় থেকে শরীয়তপুর এবং মাদারীপুরের জঞ্জিরার দক্ষিণ পাড় থেকে সেতুর জন্য ৯১৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ‘ইকম’ এর ডিজাইনে পদ্মা নদীর উপর বহুমুখী আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প ‘পদ্মা বহুমুখী সেতুর’ নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০১১ সালে এবং শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৩ সালে। মূল প্রকল্পের পরিকল্পনা করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ২৮ আগস্ট ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকার বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু প্রকল্প পাস করেছিল। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এসে রেলপথ সংযুক্ত করে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম দফায় সেতুর ব্যয় সংশোধন করে। তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। পদ্মা সেতুর ব্যয় আরও আট হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়। ফলে পদ্মা সেতুর ব্যয় দাঁড়িয়ে যায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ২০১০ সালের এপ্রিলে প্রকল্পের জন্য প্রাক যোগ্যতা দরপত্র আহবান করে এবং ২০১১ সালের শুরুর দিকে সেতুর নির্মাণ কাজ আরম্ভ হওয়ার কথা ছিল এবং ২০১৩ সালের মধ্যে প্রধান কাজগুলো শেষ করে ২০১৫ সালে জনসাধারনের জন্য উন্মুক্ত করার কথা থাকলেও সম্ভব হয়নি দুর্নীতির অভিযোগ উঠায়। যদিও কানাডিয়ান আদালতে বিশ্বব্যাংকের করা মামলায় দুর্নীতির কোনও অভিযোগের পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন বাধাবিপত্তি কারণে সঠিক সময়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি তবে ২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
পদ্মা একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য দীর্ঘস্থায়ী চাহিদা। প্রথম থেকেই পদ্মা সেতু নিয়ে বিতর্ক ও ষড়যন্ত্র ছিল। অভ্যান্তরীণ সরকার বিরোধী এবং দেশদ্রোহী পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ ব্যাহত করতে। এ কারণে প্রথমদিকে দুর্নীতি মামলা এবং পরবর্তীকালে পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে এরকম গুজব ছড়ানোও হয়। পদ্মা সেতু নির্মানে দক্ষিণ বঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থার সংযোগ চালু হবে। দেশের ২টি প্রধান সমুদ্র বন্দর মংলা ও চট্টগ্রাম। পদ্মাসেতু নির্মিত হলে বেনাপোল স্থলবন্দর ও মংলা বন্দরের মাধ্যমে অধিক বাণিজ্য সুবিধা পাওয়া যাবে। পদ্ম সেতু নির্মানে যানবাহনের চলাচল বৃদ্ধি পাবে। টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, প্রাকিতিক গ্যাস পরিবহনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। শিল্প- বাণিজ্য ক্ষেত্রে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। জাইকার সমীক্ষা মতে, পদ্মাসেতুর মাধ্যমে প্রতিদিন ২১,৩০০ যানবাহন যাতায়াতে সক্ষম হবে আর ২০২৫ সালে এর পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ৪১,৬০০ তে।
স্বপ্নের সেতুর ফলে দেশের ১.২ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধি পেয়ে আঞ্চলিক জিডিপি বৃদ্ধি দাঁড়াবে ৩.৫ শতাংশে। দক্ষিণবঙ্গে শিল্পায়নের গতি ব্যাপক বেড়ে যাবে। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অসামান্য অবকাঠামোগুলো একটি। এই সেতু নির্মানের ফলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এবং দক্ষিণ পশ্চিমের জনগণের অর্থনৈতিক, ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

