মহামারীর মধ্যেও বছরের প্রথম দিনে বই বিতরণ শুরু: নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সাফল্য
সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: মঙ্গলবার, ০৫ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১
নতুন বছরের নতুন সকাল। সেই সাথে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ। নতুন বছরের আনন্দের সঙ্গে বই উত্সবের আনন্দ। বইয়ের একেকটি পৃষ্ঠা উল্টিয়ে নতুন গল্প, কবিতা আর নতুন সব বিষয় জানার ইচ্ছাও প্রবল। সব মিলিয়ে নতুন শ্রেণিতে নতুন বই পাওয়ার আনন্দই অন্যরকম। সেই বই যদি পাওয়া যায় বিনামূল্যে, তাহলে তো কথাই নেই। বছরের প্রথম সকাল থেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিকপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মন হয়ে ওঠে নতুন বইয়ের রঙে রঙিন।
এর মধ্যে এক ধরনের সার্বজনীনতাও রয়েছে। কেননা দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের অনেকেরই নতুন বই কেনার সামর্থ্য থাকে না। তারা আগে পুরনো বই দিয়েই বছর পার করতো। এখন সবার হাতে থাকে নতুন বই। টানা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিনামূল্যে পাঠ্যবই প্রদানের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয়- শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
অন্যান্য বছরের মতো এবছর এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও যথাসময়ে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে নতুন বই তুলে দিচ্ছে সরকার। বর্তমান শিক্ষাবর্ষে সর্বমোট ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার ৪১২টি পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। তবে বরাবরের মতো এবার উত্সব করে বই বিতরণ করা হচ্ছে না, করোনা পরিস্থিতির কারণে। বছরের প্রথম দিনই শিশুরা বই হাতে পেলেও এবার শিশুদের সেই বাঁধ ভাঙা উল্লাস চোখে পড়েনি করোনার কারণে। ১ জানুয়ারি সকাল থেকেই স্কুলে স্কুলে বই বিতরণ শুরু হয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে।
নতুন বছর শুরুর আগের দিনই (৩১ ডিসেম্বর সকালে) গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এক অনুষ্ঠানে ২০২১ শিক্ষাবর্ষের প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক স্তর, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ২৩ শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দেন শিক্ষামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) এ দিন সকাল সাড়ে ৯টায় বই উত্সব অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল সাড়ে ১০টার পরে এ অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বই উত্সবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন, শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। ১ জানুয়ারি থেকে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় বই বিতরণ শুরু হয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে তিন দিন করে মোট ১২ দিন ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন বই বিতরণ করা হবে।
মুজিববর্ষ উপলক্ষে এবার বইয়ের প্রচ্ছদেও আনা হয়েছে নতুনত্ব। পাঠ্যপুস্তকের পেছনের (ব্যাক পেজ) মলাটে বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনসহ বর্তমান সরকারের নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন স্থিরচিত্র ক্যাপশনসহ সংযোজন করা হয়েছে।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে মানসম্মত করার লক্ষ্যে এবং ঝরে পড়ার হার রোধ করতে ২০১০ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিবছর ১ জানুয়ারি উত্সবমুখর পরিবেশে ‘বই উত্সব’ করে আসছে। এবার বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের কারণে বই উত্সব করা সম্ভব না হলেও বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা ঠিকই নতুন বইয়ের গন্ধ পেয়েছে। ২০১০ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে প্রায় ৩৩১ কোটি ৪৭ লাখ বই সারাদেশে বিতরণ করা হয়েছে।
বিনামূল্যের বই বিশেষত গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র অভিভাবকদের জন্য এক বড় ধরনের স্বস্তি। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ সহায়তায় তাদের আর্থিক কষ্টের বোঝা অনেকটাই লাঘব হয়।
বিশ্বজুড়ে চলমান করোনা মহামারী পরিস্থিতির মধ্যেও বছরের শুরুতেই সময়মতো বিনামূল্যে বই বিতরণের কাজটি শুরু করতে পারা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি বড় সাফল্য, সেটা স্বীকার করতেই হবে। করোনার এই দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতেও আমাদের সন্তানরা যাতে সুষ্ঠভাবে তাদের পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে সেজন্য এখন আমাদের উচিত্ হবে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করতে সচেষ্ট থাকা। তাহলেই মহামারীর ধাক্কায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব। সেই সাথে আমাদের সবাইকে করোনার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, যাতে দেশে করোনা সংক্রমণ রোধ করে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়া যায়।

