বড় ভাইকে খুঁজতে গিয়ে নিজেই হারিয়ে গেলেন
উত্তরদক্ষিণ | শনিবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২১ | আপডেট : ১৬:২০
জহির রায়হান আপাদমস্তক ছিলেন শিল্পী। স্টপ জেনোসাইড, বার্থ অব আ নেশন পরিচালনা কিংবা লিবারেশন ফাইটার্স, ইনোসেন্ট মিলিয়নস প্রযোজনা করে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিভৎসতা তুলে ধরেছিলেন পুরো বিশ্বে। স্বাধীনতা–পরবর্তীকালে জহির রায়হান তাই একজন কথাশিল্পী, আলোকচিত্রী, সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, ভাষাসংগ্রামী আর মুক্তিযোদ্ধার অভিধা ছাপিয়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে।
কেবলই একজন ঔপন্যাসিক নন। আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্য কিংবা আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রে কারো অবদানের কথা যদি বলা হয়, তবে সবার আগে উঠে আসবে জহির রায়হানের নাম। তিনি একাধারে ছিলেন একজন সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্র পরিচালক এবং প্রযোজক। বিনোদন ও সাহিত্য জগৎ ছাড়াও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ছিল তার অসামান্য অবদান। পেশাদার জীবনের সকল ক্ষেত্রেই তিনি বাঙালির উপর অত্যাচারের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। মাত্র ৩৭ বছরের জীবনকালে তার অর্জন তাকে বাংলার ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর জহির রায়হান ঢাকায় ফেরেন। ফিরে জানতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট চলার সময় রাজাকার আল বদর বাহিনী তার বড় ভাই প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে অপহরণ করেছে। মানুষ যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে গড়ার কাজে ব্যস্ত, তখন তিনি বিভিন্নভাবে নিখোঁজ ভাইকে খোঁজার অভিযান শুরু করেন।
১৯৭২ সালের ২৮শে জানুয়ারি সকালে এক রহস্যময় ব্যক্তি তাকে ফোন করে জানান যে, তার ভাইকে মিরপুর ১২ নাম্বারে একটি হাউজিং সেক্টরে আটকে রাখা হয়েছে। একথা শুনেই তিনি ভাইয়ের খোঁজে মিরপুর যান এবং আর ফিরে আসেননি।
জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে অনেক ধরনের থিওরি রয়েছে। এমন বলা হয় যে, তিনি একটি সার্চ পার্টি নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখানে পাক হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য ছদ্মবেশে ছিল। তারা তাকে লুকিয়ে আটক করে হত্যা ও গুম করে ফেলে।
তার ছোট ভাই হাবীবের ভাষ্যমতে, তিনি জহির রায়হানকে মিরপুর পুলিশ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তার দেখা পাননি। এমন খবরও শোনা যায় যে মিরপুর পুলিশ স্টেশন থেকে জহির রায়হানকে জানানো হয়েছিল, মিরপুর ১২ নাম্বারে কিছু পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকার ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে। সেখানে না গিয়ে আগে তাকে কল ট্রেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর তিনি নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বেরিয়ে যান। আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় আরো অনেক গুজব ছড়িয়েছে, যা আদৌ সত্যি না মিথ্যা, কেউ জানে না। তার মৃতদেহও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার নিখোঁজ হওয়ার কোনো তদন্তের দিকেও কেউ কখনো আলোকপাত করেনি।
১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তার মৃত্যুদিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেদিন তিনি রহস্যময় ফোনকলটি বিশ্বাস না করে যদি ঘরে থেকে যেতেন, তাহলে হয়ত বাঙালি এই কিংবদন্তিকে এত অল্প বয়সে হারাতো না। আমরা হয়ত আরো অনেক কালজয়ী উপন্যাস এবং চলচ্চিত্র পেতাম।

