ক্লিন ফিড: সঙ্কট কোথায়; উত্তরণ কীভাবে
উত্তরদক্ষিণ। রবিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২১ । আপডেট ২২:৩০
বাংলাদেশের বাজার ছোট বলে ‘ক্লিন ফিড’ সরবরাহ ‘করবে না’ ব্রডকাস্টাররা (চ্যানেল কর্তৃপক্ষ), ফিড ‘ক্লিন’ করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নেই দেশের পরিবেশক ও কেবল অপারেটরদের; অন্যদিকে ‘ক্লিন ফিড’ ছাড়া বিদেশি চ্যানেল বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনার মধ্যে অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে হাঁটছে দেশের কেবল ইন্ডাস্ট্রি।
সরকারি নির্দেশনা মানতে গিয়ে এখন অনুষ্ঠানের ফাঁকে বিজ্ঞাপন প্রচার করে এমন বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার বন্ধ রেখেছে বাংলাদেশের পরিবেশক ও কেবল অপারেটররা।
তবে সঙ্কট নিরসনে সরকারের কাছে আরও সময় চেয়ে আবেদন করেছেন পরিবেশক ও অপারেটররা।
কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬-এর ১৯(১৩) ধারায় বলা হয়েছে, বিদেশি কোনো চ্যানেলের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন সম্প্রচার বা সঞ্চালন করা যাবে না।
আইন ভেঙে ‘ক্লিন ফিড’ ছাড়া বিদেশি চ্যানেল সম্প্রচার বন্ধে পরিবেশক ও কেবল অপারেটরদের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল সরকার; নির্ধারিত সময়ের পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের মধ্যে বিজ্ঞাপন ছাড়া বিদেশি চ্যানেল সম্প্রচারের প্রযুক্তি না থাকায় চ্যানেলই বন্ধ করে দিয়েছেন অপারেটর ও পরিবেশকরা।
বন্ধ থাকার মধ্যে বিবিসি, সিএনএন, স্টার স্পোর্টস, টেন স্পোর্টস, জি বাংলা, স্টার জলসা, সনি লিভসহ অন্তত ৬০টির মতো বিদেশি টিভি চ্যানেল রয়েছে; যে চ্যানেলগুলো বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
বিষয়টি নিয়ে দর্শকদের মধ্যে তুমুল আলোচনার মধ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী পরিষ্কার বলছেন, সরকার কোনো চ্যানেল বন্ধ করেনি। বিজ্ঞাপন ছাড়া (ক্লিন ফিড) বিদেশি টিভি চ্যানেল সম্প্রচারে কোনো বাধা নেই।
টেলিভিশনের ফিড ‘ক্লিন’ করবে কে?
বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক মহাপরিচালক হারুন-অর-রশিদ জানান, বিশ্বজুড়ে ‘ক্লিন ফিড’ পাওয়ার প্রচলিত দুটি পন্থা রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশে ব্রডকাস্টাররা (চ্যানেল কর্তৃপক্ষ) আপ লিংকের সময় দেশভেদে আলাদা আলদা ফিড (ক্লিন) সরবরাহ করেন; ব্রডকাস্টারদের তরফ থেকে ক্লিন ফিড পেলে পরিবেশকরা কাঁটছাঁট ছাড়াই প্রচার করতে পারেন।
অন্যদিকে, ব্রডকাস্টারদের কাছ থেকে ‘ক্লিন ফিড’ না পেলে পরিবেশকরাও ডাউন লিংকের পর সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুমে বিজ্ঞাপন ছেঁটে তা প্রচার করতে পারেন।
কোনো বিদেশি চ্যানেল প্রচারের জন্য পরিবেশকদের প্রথমে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়। দেশে সম্প্রচার কমিশন না থাকায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সেই বিদেশি চ্যানেল ডাউন লিংক করে উপযোগিতা যাচাই করে বাংলাদেশ টেলিভিশন। বিটিভির মতামতের ভিত্তিতেই পরিবেশকদের বিদেশি চ্যানেল ডাউন লিংকের অনুমতি দেয় সরকার।
ব্রডকাস্টাররা বাংলাদেশে ‘ক্লিন ফিড’ দিচ্ছে না কেন?
হারুন বলছেন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচের সব দেশে ভারতীয় ব্রডকাস্টাররা ‘ক্লিন ফিড’ সরবরাহ করে থাকে।
“মিডল ইস্টে ভারতের চ্যানেল চলছে, সেখানে ভারতের কোনো বিজ্ঞাপন নাই। মিডল ইস্টের বিজ্ঞাপন প্রচার হয়। এমনকি আরবি ভাষায় ডাব করেও চালাচ্ছে। বাংলাদেশ এত বড় একটা মার্কেট; তারা (ব্রডকাস্টার) সেখানে হুবহু ফিড দিবে-এটা তো হতে পারে না।
হারুন বলেন, “তারা সৌদি আরবের দর্শকদের জন্য আপ লিংক দেয় তখন আরবি কনটেন্টকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের ফিড দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে ফিড দেওয়ার জন্য আলাদা করে বিজ্ঞাপন জুড়ে দেওয়া হয়; সেটা শুধু বাংলাদেশেই দেখা যায়; কলকাতায়ও সেটা দেখবেন না। মানে সে বিজ্ঞাপনটা দিচ্ছে বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য।“
ব্রডকাস্টাররা অন্য দেশে ‘ক্লিন ফিড’ দিলে বাংলাদেশে দিচ্ছে না কেন-এ প্রশ্নের জবাবে বিদেশি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ওয়ান এলায়েন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বি এম সাইফুল হোসেন সোহেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাংলাদেশের মার্কেটের আকারের কারণে ব্রডকাস্টাররা ‘ক্লিন ফিড’ দিচ্ছে না।
ভারতের কালারস গ্রুপের কয়েকটি চ্যানেল বাংলাদেশে বিপণন করে ওয়ান এলায়েন্স।
কেবল অপারেটরদের সংগঠন কোয়াবের সাবেক সভাপতি সোহেল বলেন, “বাংলাদেশে মার্কেটের যে সাইজ সেই অনুযায়ী ব্রডকাস্টাররা খরচে কুলাতে পারছে না। সেই খরচটা তারা বহন করতে পারছে না। সৌদি আরব, আমেরিকা কিংবা ইংল্যান্ডে সার্ভিসটা নেওয়ার জন্য ২৫ ডলার পে করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। আমরা দেড়শ’ দুই’শ টাকায় সার্ভিস দিচ্ছি।
“এই সেক্টরে ডিজিটালাইজেশন হলে সরকারের রেভিনিউয়ের সঙ্গে ব্রডকাস্টারদের আয়ও বাড়বে। তখন হয়তো তারা ভাবনায় পরিবর্তন আনতে পারে।”
বাংলাদেশে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে কালারস গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানিয়ে সোহেল বলছেন, “তারা আমাকে বলেছেন, ‘এখন চাইলেই ‘ক্লিন ফিড’ সরবরাহ করতে পারব না। আমাদের সময় দিতে হবে। সরকার সময় না দিলে আমরা সুইচ বন্ধ করে দেব। আমরা সক্ষম না হলে সেখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে আনা ছাড়া কোনো উপায় নেই’।”
পরিবেশকরা পারছেন না কেন?
বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে ডাউন লিংকের অনুমতি নিয়ে চারটি পরিবেশক প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৬০টির মতো টিভি চ্যানেল সম্প্রচার করে।
এর মধ্যে জি নেটওয়ার্ক (জি টিভি, জি বাংলা, জি বাংলা সিনেমাসহ), সনি গ্রুপ (সনি টিভি, সনি লিভসহ), টেন স্পোর্টস, ডিসকোভারি গ্রুপের চ্যানেগুলোসহ সবচেয়ে বেশি বিদেশি টিভি চ্যানেলের বিপণন করে মিডিয়া কেয়ার লিমিটেড।
১৯৯৮ সালে বেঙ্গল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান নেশনওয়াইড মিডিয়া বাংলাদেশে সিএনএন, কার্টুন নেটওয়ার্কের পরিবেশক হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আফসার খায়ের মিঠু।
আরেক পরিবেশক প্রতিষ্ঠান জাদু ভিশন স্টার জলসাসহ অন্যান্য চ্যানেলগুলো বাংলাদেশে পরিবেশন করে। জাদু ভিশনের মালিকানা ঢাকা উত্তরের মেয়র প্রয়াত আনিসুল হকের ছেলে নাভিদুল হকের।
কালারস নেটওয়ার্কের চ্যানেলগুলো বাংলাদেশে পরিবেশন করে ওয়ান এলাইন্স।
পরিবেশক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্রডকাস্টারদের কাছ থেকে বিদেশি চ্যানেল ‘ডাউন লিংক’ করার পর কেবল অপারেটরদের মাধ্যমে গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছায়।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রডকাস্টারা ‘ক্লিন ফিড’ না দিলে তা ‘ক্লিন’ করার মূল দায়িত্ব বাংলাদেশি পরিবেশকদের উপর বর্তায়; কারণ তারাই চ্যানেলগুলো আমদানি করে। তাদের মাঝখানে বাংলাদেশে আর কোনো ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেই; কেবল অপারেটরা এখানে মাধ্যমমাত্র।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রীলংকা, নেপাল, পাকিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশেই পরিবেশকরা ‘ফিড ক্লিন’ করে সম্প্রচার করেন।
তাহলে বাংলাদেশে সম্ভব হচ্ছে না কেন?-এমন প্রশ্নের জবাবে পরিবেশকরা বলছেন, প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে তারা চাইলেও ফিড ‘ক্লিন’ করতে পারছে না। এই সেক্টর এখনও পুরোপুরি ডিজিটাল হয়নি; ডিজিটাল না হলে কাজটা তাদের জন্য কঠিন হবে। রাতারাতি কোনো সমাধান পাওয়া যাবে না; তার জন্য সময় প্রয়োজন।

