প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ, জিতলেই বিশ্বকাপের মূল পর্বে ওমান
উত্তরদক্ষিণ। মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১ । আপডেট ১৩:৫০
দলে পূর্ণ পেশাদার ক্রিকেটার নেই একজনও। ৯টা-৫টা অন্য চাকরি সামলেই ক্রিকেট খেলতে হয় সবাইকে। অনেক সময় ক্যাম্প কিংবা টুর্নামেন্টের সময়ও ছুটি মেলে না। বোর্ডের সঙ্গে আধা-পেশাদার চুক্তি আছে মাত্র কয়েকজনের। বাকিদের সেই নিশ্চয়তাটুকুও নেই। তবু প্রাণের খোরাক মেটাতে চলছে ক্রিকেটের আঙিনায় তাদের স্বপ্নের চাষ। পরিশ্রম আর ত্যাগের ফসলও মিলছে। আজ মঙ্গলবার তারা মাঠে নামছে বাংলাদেশকে হারিয়ে বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা করে নেওয়ার পথে এগিয়ে যেতে।
ওমান দলটির প্রায় সবার জন্য ক্রিকেটের লড়াই তাদের জীবন যুদ্ধেরই অংশ। আজকের দিনটি হতে পারে তাদের সবার জীবনে, ওমান ক্রিকেটের ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় দিন। দিনের প্রথম ম্যাচে পাপুয়া নিউ গিনির বিপক্ষে স্কটল্যান্ড যদি প্রত্যাশিত জয় পেয়ে যায়, পরের ম্যাচে বাংলাদেশকে হারাতে পারলেই ওমান নিশ্চিত করে ফেলবে এবারের আসরের মূল পর্বে খেলা।
অনেক বাধা, অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে, লড়াইয়ের অনেক পথ পাড়ি দিয়ে তবেই আজকের পর্যায়ে এসেছে ওমান। তাদের ক্রিকেট দাঁড়িয়ে প্রবাসীদের ওপর, সেখানেও প্রাধান্য মূলত উপমহাদেশের। জাতীয় দলের প্রায় সবাই ভারতীয় ও পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত। অন্যান্য পর্যায়েও তাদেরই প্রধান্য। স্থানীয় লিগে বাংলাদেশি ও শ্রীলঙ্কান বংশোদ্ভূতও আছে বেশ এখন।
সম্পূর্ণ প্রবাসীদের ওপর নির্ভর করতে হয় বলেই এখনও পুরো পেশাদার হতে পারছে না ওমান ক্রিকেট। কিছু ক্রিকেটারের সঙ্গে এক ধরনের চুক্তি আছে ওমান ক্রিকেটে, যেটাকে তারা বলেন ‘সেমি-হাইব্রিড’ চুক্তি। খেলার সময় নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে বিনা বেতনে ছুটি মেলে তাদের, ওই সময় বেতন দেয় ওমান ক্রিকেট।
গত বছরের জানুয়ারি থেকে তৃনমূলে ক্রিকেট ছড়িয়ে দেওয়ার কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তবে কোভিড পরিস্থিতিতে তা থমকে যায় অনেকটাই। স্কুল পর্যায়ে ক্রিকেট কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। সেটিও মূলত ভারতীয় ও পাকিস্তানি স্কুলগুলোতেই। সরকারী কিছু স্কুলেও শুরু হয়েছে ক্রিকেট কার্যক্রম।
জাতীয় দলকে কোচিং করানোর পাশাপাশি মাঠের বাইরে পরিকল্পনা ও কাঠামো গড়ে ওমান ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ার আড়ালের নায়ক দুলিপ মেন্ডিস। সাবেক শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক এখন ওমান ক্রিকেটের প্রবাদ পুরুষ। তার তত্ত্বাবধানে গত ১০ বছরে বিশ্ব ক্রিকেটের নিচু পর্যায় থেকে আজ বিশ্বমঞ্চে এমন আলোচিত নাম ওমান।
ওমান ক্রিকেটের সেই উঠে আসার লড়াইয়ের গল্প শোনালেন এখন জাতীয় দলের কোচের পাশাপাশি ওমানে চিফ ডেভেলপমেন্ট অফিসারের দায়িত্ব পালন করা মেন্ডিস। এই দলটার শক্তির জায়গাও তুলে ধরে তিনিবলেন, আমরা ডিভিশন ফাইভ দিয়ে শুরু করেছিলাম একটা সময়। তার প্রতিটি ধাপ বেয়ে এগিয়ে গেছি। অনেক সময় হোঁচট খেয়েছি, আবার উঠে দাঁড়িয়েছি। ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলেছি, এখনকার টেস্ট দল আয়ারল্যান্ডকে হারিয়েছি, ওয়ানডে মর্যাদা পেয়েছি। এবার দ্বিতীয়বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলছি। দারুণ অলরাউন্ড দল আমাদের। খুব ভালো তিনজন ফাস্ট বোলার আছে, সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে সেরা পেসার ওরা। দারুণ কিছু অলরাউন্ডার আছে। স্পিনে খুব ভালো বাঁহাতি স্পিনার আছে, অফ স্পিনার আছে এবং উইকেট শিকারি একজন লেগ স্পিনার আছে।
এই তিন ফাস্ট বোলারের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য বড় হুমকি হতে পারেন বিলাল খান। বাঁহাতি এই পেসার দুই দিকেই বল সুইং করাতে পারেন। বেশ স্কিডও করে তার বল। বাংলাদেশকে ভোগাতে পারেন কালিমউল্লাহ ও মোহাম্মদ নাদিমও। এই তিন পেসারেরই জন্ম পাকিস্তানে।ওমান দলটির মূল শক্তি তারা। ওমানের সঙ্গে গত বিশ্বকাপেও গ্রুপ পর্বে দেখা হয়েছিল বাংলাদেশের। সেই ম্যাচে তামিম ইকবালের সেঞ্চুরিতে বড় জয় পায় বাংলাদেশ। তবে ওমান ক্রিকেটের সেই দিন যে আর নেই, তা মনে করিয়ে দিলেন লেগ স্পিনিং অলরাউন্ডার খাওয়ার আলি। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে তামিম সেঞ্চুরি করেছিল। তবে সেটা ৫ বছর আগের ঘটনা। তখন ওমান ক্রিকেট একরকম ছিল, এখন ভিন্ন।
ওমানের কোচ ও ওমান ক্রিকেটের চিফ ডেভেলপমেন্ট অফিসার দুলিপ মেন্ডিস।ওমানের কোচ ও ওমান ক্রিকেটের চিফ ডেভেলপমেন্ট অফিসার দুলিপ মেন্ডিস।সেই প্রমাণ তারা সাম্প্রতিক সময়ে নানা ম্যাচে দেখিয়েছে। এই টুর্নামেন্টেও প্রথম ম্যাচে দেখিয়েছে পাপুয়া নিউ গিনিকে ১০ উইকেটে উড়িয়ে দিয়ে।
ওমানের জন্য প্রতিটি ম্যাচ স্রেফ একেকটি জয়ের তাড়নাই নয়, ওমান ক্রিকেটের ভিত আরেকটু শক্ত করা, বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রে নিজেদের আরও প্রতিষ্ঠা করার লড়াই।
প্রথম ম্যাচে ৪২ বলে ৭৩ রানের দুর্দান্ত ইনিংস উপহার দেওয়া ওপেনার জাতিন্দর সিং তুলে ধরলেন সেই বাস্তবতা। তিনি বলেন, আমাদের জন্য এটা সুবর্ণ সুযোগ, নিজেদের প্রতিভা ও সামর্থ্য মেলে ধরার। আমরা জিততে পারলে ওমান ক্রিকেটের জন্য দারুণ ব্যাপার হবে। বিশেষ করে স্থানীয়রা ক্রিকেটে উৎসাহী হবে, তৃণমূলে ক্রিকেট ছড়িয়ে পড়বে। পরবর্তী প্রজন্ম ক্রিকেটে আগ্রহী হবে।
বাঁহাতি স্পিনিং অলরাউন্ডার জিশান মাকসুদ দলটির অধিনায়ক। প্রথম ম্যাচে ৪ উইকেট নিয়ে তিনিই ছিলেন ম্যাচের সেরা। সেটা ছিল কেবলই প্রথম পদক্ষেপ। আরও বড় কিছু করার স্বপ্নের কথা সরাসরিই বললেন ৩৩ বছর বয়সী ক্রিকেটার। তিনি জানান, আমরা এটাকে দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছি। মানুষকে বড় আনন্দের উপলক্ষ্য এনে দিতে চাই আমরা। আমার স্বপ্ন দলকে পরবর্তী রাউন্ডে দেখা। আমরা চেষ্টা করব, নিজেদের সেরাটা দেব এবং আশা করি, আমরা পারব।
অধিনায়কের এই কথায় ফুটে উঠছে প্রতয়ের ছাপ। বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচ হেরে চাপে আছে প্রচণ্ড। সব মিলিয়ে ওমান বাধা পার হতে হলে, মাহমুদউল্লাহদের খেলতে হবে হয়তো নিজেদের সেরাটাই।
ইউডি/আব্দুল্লাহ

