প্রশ্ন ফাঁসের ক্যানসার রুখতে হবে
উত্তরদক্ষিণ। সোমবার, ১৫ নভেম্বর ২০২১। আপডেট ১৬:৪০
মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রকোপে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্থগিত ছিলো সব ধরণের নিয়োগ পরীক্ষা। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকায় আবারও শুরু হয়েছে নিয়োগ পরীক্ষা। এছাড়াও গতকাল রবিবার থেকে শুরু হয়েছে এসএসসি পরীক্ষা। আর তাতেই প্রশ্ন ফাঁসের পুরনোব্যাধি নতুন করে আর্বিভাব হওয়া শুরু করেছে। প্রশ্ন ফাঁস এখন যেনো ক্যানসারে পরিণত হয়েছে। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদুজ্জামান সুপ্ত…
বাংলাদেশে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত যে কোনো পরীক্ষার প্রধান সমস্যা হল প্রশ্নপত্র ফাঁস। অনেক সময় গুজব হয়ে রটলেও প্রতিনিয়তই ধরপাকড়ে বেরিয়ে আসছে বাস্তবচিত্র। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়াত্ব পাঁচ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ধরা পড়েছে পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর আর এই প্রশ্নপত্র বিক্রি হয়েছে মোট ৬০ কোটি টাকার এদিকে, গতকাল শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সদস্যদেরকেও আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দিনে দিনে ‘প্রশ্ন ফাঁস’ ক্যানসারের ন্যায় বিস্তার লাভ করছে। আর তাতে পুরো সিস্টেমই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
অন্ধকার ভবিষ্যতের এক চাবিকাঠি: প্রশ্ন ফাঁস শুধু ব্যক্তিকেই কলুষিত করছে না, জাতিকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকার এক ভবিষ্যতের পানে। অযোগ্য ব্যক্তিরা যখন এই প্রক্রিয়ায় পার পেয়ে বসছে মসনদে তখন ওই ব্যক্তির দ্বারা ভালো কিছুর আশা করা নেহাত বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। আর এভাবেই নিরানব্বই শতাংশ মানুষের সততা, নিষ্ঠাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাত্র এক শতাংশ, হয়তো এর চেয়েও কম কিছু মানুষ পুরো জাতির ভবিষ্যত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রশ্নপত্র প্রণয়ণে বাড়াতে হবে নজর: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার সমস্যার সমাধান করতে হলে প্রথমেই আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষার শুরুতে পরীক্ষার্থীদের হাতে যাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিতে। তাহলেই দেখা যাবে কেন ও কীভাবে ফাঁস হচ্ছে এবং পাওয়া যাবে এই সমস্যার সমাধানও।
প্রযুক্তি উভয় পক্ষেরই হাতিয়ার: যে প্রযুক্তির কল্যানে প্রশ্ন ফাঁস একটা ক্যানসারে রূপ নিয়েছে সেই প্রযুক্তি দিয়ে এটা রোধও করা সম্ভব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সাম্প্রতিক সময়ে এই বিষয়ে তৎপর। এছাড়া স্ব স্ব প্রতিষ্ঠান ও মহল এই প্রশ্ন ফাঁস কিভাবে বন্ধ করা যায় তা নিয়ে কাজ করছে।
সর্ষের মধ্যেই ভূত: অপরাধীদের একাংশ মূলত অভ্যন্তরীণ। স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের লোকজনই চক্রের সদস্য হিসেবে কাজ করে। তাতে তারা হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকা। সর্ষের মধ্যেই ভূত যেনো লুকিয়ে থাকে।
মূলহোতাদের খুঁজে বের করতে হবে: একটা অসাধু চক্র অবলীলায় সমাজ ধ্বংসের এই কাজ গুলো করে যাচ্ছে। অনাস্থার পরিবেশটা ক্রমাগত বাড়ছে। তার বড় একটা কারণ হলো, পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি। গোয়েন্দা বাহিনী কিংবা প্রশাসনের দক্ষতা যাই হোক না কেন, কিছু কিছু অপরাধী ধরা পড়ছে। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে না। এর পেছনের মূলহোতাদের খুঁজে বের করতে হবে। এ ধরণের অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে যেনো কেউ এ পথে আর পা না বাড়ায়।
এসএসসি প্রশ্ন ফাঁসের ‘প্রলোভন’: চলমান এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের কথা বলে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রতারক চক্রের দুই গ্র“পের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছেন গোয়েন্দারা। ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র পাইয়ে দেয়ার কথা বলে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রশ্নপ্রতি ৫০০ থেকে দুই হাজার পর্যন্ত হাতিয়ে নিতেন বলে জানিয়েছে ডিবি পুলিশ।
টার্গেট অমনোযোগী শিক্ষার্থীরা: গ্রেপ্তাররা মূলত অমনোযোগী শিক্ষার্থীদেরকে টার্গেট করে প্রশ্নপত্র ফাঁস করার নানা আকর্ষণীয় প্যাকেজের অফার দিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ ইন্টারেনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে।
প্রশ্ন ফাঁসের চেষ্টা হলে কঠোর ব্যবস্থা: শিক্ষামন্ত্রী
চলমান এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ‘সুযোগ নেই’ মন্তব্য করে ‘গুজবে কান না দিতে’ সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। আর প্রশ্ন ফাঁসের চেষ্টা কেউ করলে সরকার কতটা কঠোর হাতে তা দমন করবে, সেই ধারণাও তিনি দিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ার করেন: মাদক, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন ফাঁস করে আমাদের সন্তানদের ভবিষৎ নষ্ট করার অপচেষ্টা যারা করবে, তাদের বিরুদ্ধে এর চেয়ে কম কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। আমি অনুরোধ করব, সবাই যেন এ বিষয়ে সাবধান থাকে।

