হেলেন কেলার; জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক অদম্য নারী

হেলেন কেলার; জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক অদম্য নারী

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ৯ জানুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৭:০৫

হেলেন কেলার শুধু একটি নাম নয় এই মানুষটি সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে তাদের জীবনের সফলতার রাস্তায় চলার অনুপ্রেণা হয়ে রয়েছেন। হেলেন কেলার তার জীবনের শুরুর দিকেই তার চোখে দেখার, কানে শোনার, আর কথা বলার শক্তি হারিয়ে ছিলেন কিন্তু তার পরেও তার জীবনে যে পরিবর্তন আসছিলো তা অনেক স্বাভাবিক মানুষের জীবনকে হার মানায়। হার না মানা অদম্য নারীকে নিয়ে লিখেছেন সাইফুল অনিক

শিশু কালেই হোন প্রতিবন্ধী
হেলেন কেলারের জন্ম হয়েছিল ২৭ জুন ১৮৮০ সালে আমেরিকার তুসাকুম্বিয়া, আলাবামায়। তার পিতার নাম অর্থার এইচ কেলার ছিলেন একজন এডিটর, আর মায়ের নাম কেট এডামস কেলার। জন্মের সময় হেলেন ছিলেন অন্য শিশুর মতই সবল সুস্থ স্বাভাবিক। মাত্র ন’মাসের বাচ্চা মেয়ে হেলেন কেলারের স্কারলেট জ্বর হলো। এই জ্বরের ফলে দেখার, বলার ও শোনার শক্তি হারাতে হয়েছিল তিনি একজন মূক ও বধির হয়ে পড়েন। বাবা-মা ভাবলেন এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে ওর মরে যাওয়াই ভালো ছিলো।

সাধারণ থেকে অনন্যা হয়ে উঠা
তার বাবা-মা অন্ধ বধির ও মূক মেয়েকে স্কুলে পাঠালেন না। কিন্তু হেলেনের খুব ইচ্ছা লেখাপড়া শিখবেন। তাই তার বাবা অগত্যা তার জন্যে একজন গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করলেন নাম মিস্ সুলিভান। মিস্ সুলিভান হেলেনের লেখাপড়ার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহ আর উৎসাহ দেখে খুব খুশি হলেন। মিস্ সুলিভান হেলেন কেলারকে পড়াতে শুরু করলেন। হেলেনের হাতে কলম দিয়ে নিজে তার হাত ধরে তিনবার Water লেখালেন। এভাবে অন্ধ হেলেন শিখলেন কিভাবে কোন্ অক্ষরটি লিখতে হয়। চারবারের পর নিজেই লিখলেন Water। একমাসের মধ্যে কথা বলাও শিখলেন। হেলেন কেলারের দ্রুত শেখা দেখে শিক্ষিকা দারুণ খুশি হলেন। হেলেনেরও স্বপ্ন সত্যি হতে থাকায় আনন্দের সীমা থাকলো না।

একান্ত আগ্রহ, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় সহকারে ব্রেইলি পদ্ধতিতে পড়তে পড়তে এবং বিশেষ পদ্ধতিতে টাইপরাইটারের সাহায্যে লেখার অভ্যাস করে ২৪ বছর বয়সে ১৯০৪ খ্রীস্টাব্দে র্যাডক্লিফ কলেজ থেকে ব্যাচেলর অফ আর্টস এ গ্রাজুয়েট সম্পন্ন করেছেন। পরে এম.এ এবং পি.এইচ.ডি ডিগ্রী লাভ করেন। হেলেন কেলার পৃথিবীর প্রথম মানব যিনি অন্ধ বধির হয়েও পড়াশোনা কমপ্লিট করেছেন।

সমাজ সেবায় পথ প্রদর্শক
নিজে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও সমাজের এই ধরনের মানুষের জন্য সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন। তার জীবদ্দশায় যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রেসিডেন্টের এবং আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, মার্ক টোয়েন, চার্লি চ্যাপলিনের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের সহায়তা পান। হেলেন ১৯১৫ সালে জর্জ কেসলারকে সঙ্গে নিয়ে হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।

সংস্থাটি এখনো বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের অনুরোধে হেলেন কেলার বিভিন্ন হাসপাতালে যুদ্ধাহত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাবিক ও সৈনিকদের দেখতে যেতেন এবং শান্তি ও আশার বাণী শোনাতেন।

অভিজ্ঞ রাজনৈতিক জীবন
রাজনৈতিক বিষয়েও অভিজ্ঞ ছিলেন হেলেন কেলার। এই বিষয় নিয়ে তিনি লেখালেখি করেছেন। তিনি ছিলেন আমেরিকান সোশ্যালিস্ট পার্টির সমর্থক। হেলেন সেখানে ১৯০৯ সালে যোগদান করেন। তিনি আয়ের সুষম বণ্টন দেখতে চাইতেন। ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অসমতার শেষ দেখাই ছিল তার ইচ্ছা। তার বই ‘Out of The Dark’-এ এই বিষয়ে বিস্তারিত রচনা লিখেছেন। ১৯১২ সালে তিনি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ডে যোগদান করেন। হেলেন ছিলেন একজন শান্তিবাদী এবং তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়িত থাকার বিরুদ্ধে ছিলেন।

পরিচয় ছিল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও পরিচয় হয় হেলেনের । কবিকে তিনি খুবই শ্রদ্ধা করতেন । রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রনে হেলেন শান্তিনিকেতনে এসে গভীর আনন্দলাভ করেছিলেন ।

হেলেন কেলারের আত্মজীবনী ও উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
হেলেনের রচিত বইয়ের সংখ্যা ১১টি। তিনি optimism নামক আত্মজীবনীমূলক একটি ছোটগল্প লিখেছেন। তার প্রধান বই হচ্ছে দি স্টোরি অব মাই লাইফ (১৯০৩), লেট আস হ্যাভ ফেইথ, দি ওয়ার্ল্ড আই লিভ ইন (১৯০৮), ওপেন ডোর ইত্যাদি।

খ্যাতি ও সম্মান
১৯৫০ সালে হেলেনের পঞ্চাশ বছরের কর্মময় জীবনকে সম্মান জানাতে প্যারিসে এক বিরাট সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়। ১৯৫৯ সালে হেলেন জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন। দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানিক স্নাতক উপাধিতে ভূষিত করেন। দেশ-বিদেশের বহু সম্মান লাভ করেছেন তিনি। খ্যাতি, সম্মান, অর্থ এই সব কিছুর মধ্যেই নিজের আদর্শকে অটুট রেখেও কর্তব্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে গেছেন হেলেন কেলার।

জীবনের পরিসমাপ্ত
প্রায় দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর মানুষের কল্যানে নিজেকে উৎসর্গ করে কর্মরত অবস্থাতেই ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের পহেলা জুলাই হেলেন কেলারের কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্ত ঘটে। হেলেন কেলারের জীবন বড়ই রোমাঞ্চকর। বিশ্বের অন্ধ পঙ্গু মুক বধিরদের জন্য একটি উজ্জ্বল আদর্শ। ইচ্ছা, আগ্রহ, উৎসাহ, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় থাকলে একজন অন্ধ, ও মূক-বধির লেখাপড়া শিখে যে উচ্চস্তরে পৌঁছতে পারে হেলেন কেলার তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

ইউডি/ অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading