কালিদাসের মূর্খ থেকে মহাকবি হয়ে উঠার গল্প

কালিদাসের মূর্খ থেকে মহাকবি হয়ে উঠার গল্প

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৭:৫৫

মহাকবি কালিদাস প্রাচীন ভারতের মহান ও শ্রেষ্ট কবি। প্রাচীনকাল থেকেই তাকে ইন্ডিয়ার সাংস্কৃতিক ভাষার সেরা কবির উপাধি দেয়া হয়েছে। তিনি মহারাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্নের মধ্যে একজন ছিলেন। তার প্রতিটি রচনা মহাকাব্যিক উপাখ্যান হয়ে রয়েছে। ইতিহাস ও সাহিত্য জগতে তার বহুল বিখ্যাত কাব্যটি হচ্ছে মেঘনাদ বধ। আরও অনেক লেখার মাধ্যমে তার পান্ডিত্ব প্রশংসিত হয়েছে। মূর্খ থেকে মহাকবি হয়ে উঠা কালিদাসকে নিয়ে লিখেছেন সাইফুল অনিক

কালিদাসের আবির্ভাবকাল
প্রাচ্য-পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের মধ্যে মহাকবি কালিদাসের আবির্ভাব কাল এবং আবির্ভাস্থান নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ মনে করেন, মহাকবি কালিদাস খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে (খ্রিষ্টপূর্ব ১৮৫-৪৮ অব্দ) জন্মগ্রহণ করেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, যিশুখ্রিস্টের জন্মের অনেক পরে কালিদাসের জন্ম। তাদের মতে, কালিদাসের জন্ম হয়েছিল খ্রিস্টীয় চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি। কেননা, কালিদাস বিক্রমাদিত্য নামে পরিচিত এক গুপ্ত সম্রাটের সভাকবি ছিলেন। কালিদাসের অনেক রচনায় চন্দ্রগুপ্তের রাজ্য, রাজধানী উজ্জয়িনী ও রাজসভার উল্লেখ পাওয়া যায়।

মূর্খ থেকে মহাকবি হয়ে উঠার গল্প
কথিত আছে প্রাচীন রাজ্য উজ্জয়িনীতে কমলা নামে এক বিদূষী ও অহংকারী রাজকন্যা ছিলো। সে প্রতিজ্ঞা করে যে, যে তাকে শাস্ত্রীয় তর্কে হারাতে পারবে, তাকেই সে স্বামী বলে গ্রহণ করবে। কিন্তু তর্কে তাকে কেউ আর হারাতে পারে না। শিপ্রা নদীর কুলে উজ্জয়িনীনগরের কাছে বাস করতেন কালিদাস নামে এক নিরক্ষর ও বোকা ব্যক্তি। লোকটা এতোই নির্বোধ ছিলো যে, যে কাঠের সন্ধানে গাছে উঠে, যে ডালে বসতেন তারই গোড়া কাটতে শুরু করতেন। কাটা ডালের সঙ্গে এক সময় যে তাকেও মাটিতে ছিটকে পড়তে হবে সেই সামান্য বোধটুকুও নাকি তার ছিলনা। রাজ্যের সব পন্ডিত যুক্তি করে রাজকন্যাকে জব্দ করার জন্য বেছে বেছে সেই বোকা লোকটাকে পাঠালেন রাজকন্যার কাছে। বোকার ভূমিকায় অভিনয় করে রাজকন্যাকে হারিয়ে দিলো কালিদাস।

অতঃপর নির্বোধ লোকটার সাথে শর্ত মোতাবেক রাজকন্যার বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু রাজকন্যা কমলা জানতো না তার স্বামী এক মহামূর্খ। বাসর ঘরে গিয়েই বুঝতে পারলো স্বামীর আসল পরিচয়। তখন রাজকন্যা রাগে দুঃখে উন্মত্ত হয়ে স্বামীকে বাসর ঘর থেকেই বের করে দিলো। বললো –‘কোনোদিন যদি জ্ঞানার্জন করে মানুষ হতে পারও তবেই ফিরে এসো। স্ত্রীর কাছে অপমানিত লাঞ্ছিত হয়ে বিদ্যার্জনের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ জন্মে তার। শুরু করেন বিদ্যার্জন। অবশেষে বেদ, পূরাণ, ইতিহাস, অর্থশাস্ত্র ও কাব্যে সুপন্ডিত হয়ে সগৌরবে স্ত্রীর কাছে ফিরে আসেন। রাজকন্যা কমলার মুর্খ ও বোকা স্বামীই সংস্কৃত সাহিত্যের অমর কাব্য ‘মেঘদূত’ এর কবি মহাকবি কালিদাস।

সাহিত্যে তার সমকক্ষ বিরল
কালিদাস ছিলেন সংস্কৃত ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা একশোরও বেশি। প্রাচীন ইন্ডিয়ার সাহিত্য রচিত হয়েছে সংস্কৃত ভাষায়। মহাকবি কালিদাসের রচনা সংস্কৃত সাহিত্যের কাব্য গীতিকাব্য ও নাটক এই তিনটি ধারাকেই পুষ্ট ও সমৃদ্ধ করেছে। কালিদাস পরবর্তীকালে উজ্জয়িনী অবন্তী ও দর্শনা দেশের রাজধানী যার বর্তমান নাম মালব (প্রাচীন উত্তর–পশ্চিম ভারতে অবস্থিত) গমন করেন এবং রাজা যশোধর্ম দেবের রাজসভায় চাকরি গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বিক্রমাদিত্য যশোধর্ম দেবের নবরত্ন সভার অন্যতম রত্ন। এরপর তিনি এই উজ্জয়িনী থেকেই তার যাবতীয় সংস্কৃত কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। সেই যুগে রামায়ন এবং মহাভারতের বাইরে সংস্কৃত সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য কবিতা লিখিত হয়নি। কালিদাস স্থির করলেন তিনি কাব্য রচনা করবেন। সেই ভাবেই চেষ্টা করতেই তার ভেতরের সুপ্ত কবিত্ব প্রতিভা জেগে উঠল।

এরপরই একে একে তার কলম থেকে রচিত হয়েছে নানা কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ। কবিতার মত ছন্দে সৃষ্টি হল অভিজ্ঞান শকুন্তলম, রঘুবংশম, কুমার সম্ভবম, মেঘদূত, মালবিকাগ্নিমিত্র, বিক্ৰমোবশী প্রভৃতি অসাধারণ রচনা। অপর একটি গীতিকাব্য ঋতুসংহার সাধারনভাবে তার রচনা বলে স্বীকৃত হলেও কেউ কেউ ভিন্নমত পোষণ করেন। এছাড়া কালিদাসের রচনা নয় অথচ তার নামে প্রচারিত এমন কিছু গ্রন্থও রয়েছে, যেমন লোদয় পুষ্পবানবিলাস, শৃঙ্গারতিলক, ভ্রমরাষ্টক, শ্রুতবোধ, শৃঙ্গারসার, মঙ্গলাষ্টক প্রভৃতি। তার রচনায় ব্যবহৃত অনুপম উপমাও তার কৃতিত্বের পরিচায়ক। মহাকবি কালিদাস রচিত পুস্তকভান্ডার দেশ বিদেশের বিদগ্ধ ও রসিকজনের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছে।

একুশ শতকে কালিদাস চর্চা
ইন্ডিয়ার ইতিহাসের এক সুবর্ণ যুগের প্রতিনিধি স্বরূপ বাণীর বরপুত্র মহাকবি। বিশ ও একুশ শতকে এসেও কালিদাস প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। অভিজ্ঞান শকুন্তলম অবলম্বনে ১৯৩০ সালে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র ‘স্ত্রী’। তাকে নিয়ে তামিল ও তেলেগু ভাষায় নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র। তার সমকক্ষ কবি কেবল তার যুগেই নয়; পরবর্তী ভারতীয় ভাষাগুলোতেও বিরল। কালিদাস শুধু কবিতা বা নাটকের কারণেই আজকের দিনে গুরুত্বপূর্ণ নন। তার লেখালেখিতে রয়েছে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, ভূগোল ও রাজনৈতিক নানা উপাদান। তাকে নিয়ে হয়ত গবেষণা চলতে থাকবে আরও দীর্ঘকাল।

স্বর্গলোক যাত্রা
কালিদাসের জন্মকাল নিয়ে যেমন মতভেদ আছে, তার মৃত্যু নিয়েও আছে। মনে করা হয়, তিনি খ্রিষ্টীয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতাব্দীর শেষ দিকে স্বর্গলোক গমন করেছেন।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading