কালজয়ী বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম

কালজয়ী বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৪:৪০

লৌকিক বাংলায় যুগে যুগে অসংখ্য বাউল, সাধক, মরমী কবি ও লোক-সংগীত শিল্পীর আবির্ভাব হয়েছে। তাদের অনেকেই প্রচারের আলোয় এসেছেন, অনেকেই নীরবে-নিভৃতে করেছেন সুরের আরাধনা। বাউল শাহ আবদুল করিম সম্ভবত সেই ধারার সর্বশেষ বাউল ও লোকগানের স্রষ্টা ছিলেন। অসংখ্য জনপ্রিয় বাউল গান ও গণসঙ্গীতের রচয়িতা কিংবদন্তিতুল্য বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমকে নিয়ে লিখেছেন সাইফুল অনিক

শিশুকাল থেকেই দারিদ্রের কষাঘাত
শাহ আব্দুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই থানার উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ইব্রাহীম আলী ও মাতার নাম নাইওরজান। দারিদ্র্যের মধ্যেই কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন শাহ আব্দুল করিম। শৈশব থেকেই একতারা ছিল তার নিত্যসঙ্গী। সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগী হয়ে জাড়াননি কাজে। ফলে কাটেনি তার দারিদ্র্য। বাধ্য হয়ে নিয়োজিত ছিলেন কৃষিশ্রমে। জীবন কেটেছে সাদাসিধেভাবে। তবে কোনও কিছুই তার সঙ্গীতপ্রেম ঠেকাতে পারেনি। বাউল সম্রাটের প্রেরণা তার স্ত্রী আফতাবুন্নেসা; যাকে তিনি আদর করে ‘সরলা’ নামে ডাকতেন। তার একমাত্র ছেলে শাহ নূর জালাল।

৮ দিনের শিক্ষাজীবন
রাখাল বালকের জীবনে পড়ালেখা এসেছিল একবার। বৃটিশ আমলে ভাটি অঞ্চলে একটা নৈশ স্কুল হলো। অনেকের মতো শাহ আব্দুল করিম ভর্তি হলেন সেই স্কুলে। কিন্তু, হঠাৎ করেই লোকের ধারণা জন্মালো যে, নৈশ স্কুলে পড়লে বৃটিশ সৈন্যদের সাথে গিয়ে জার্মানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। তখন ছাত্ররা পালাতে লাগল স্কুল ছেড়ে। ফলে নৈশ স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। আট দিন এই স্কুলে ক্লাস করে শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটলেও শাহ আব্দুল করিম নিজ উদ্যোগে কিছু কিছু শিখেছেন, তবে তিনি সবচেয়ে বেশি শিখেছেন জীবন থেকে, মাটি থেকে, মানুষ থেকে।

সঙ্গীতের জন্য গ্রাম থেকে বিতাড়িত
করিম নিজের গ্রামের মানুষের কাছে কাফের উপাধি পেয়েছিলেন শুধু মিথ্যা না বলতে না চাওয়ায়। এক ঈদের দিনে যুবক শাহ আব্দুল করিমকে দেখা গেল ঈদের জামাতে। ইতিপূর্বেই তিনি গান বাজনা করেন এই প্রচারটি গ্রামে বেশ চাউড় হয়ে আছে। তাকে বলা হলো, গান গাওয়া বেশরা-বেদাতি কাম। করিম যেন সকলের সামনে তওবা করে। তিনি শান্ত এবং দ্বিধাহীনভাবে বললেন, “পরে করিব যাহা এখন যদি বলি করব না, সভাতে এই মিথ্যা কথা বলতে পারব না।” আর তখনই শাহ আব্দুল করিমকে কাফের আখ্যা করে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

কৃষির সাথে সঙ্গীত সাধনা
তিনি খুব ছোটবেলায় তার গুরু বাউল শাহ ইব্রাহিম মাস্তান বকশ থেকে সঙ্গীতের প্রাথমিক শিক্ষা নেন। ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তার গান কথা বলে সকল অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরূদ্ধে। তিনি তার গানের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন প্রখ্যাত বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহ, পুঞ্জু শাহ এবং দুদ্দু শাহ এর দর্শন থেকে। তিনি বাউল গানের দীক্ষা লাভ করেছেন সাধক রশীদ উদ্দীন, শাহ ইব্রাহীম মাস্তান বকশ এর কাছ থেকে। তিনি শরীয়তী, মারফতি, দেহতত্ত্ব, গণসঙ্গীতসহ বাউল গান এবং গানের অন্যান্য শাখার চর্চাও করেছেন।

স্বল্পশিক্ষিত বাউল শাহ আব্দুল করিম এ পর্যন্ত প্রায় দেড় সহস্রাধিক গান লিখেছেন এবং সুরারোপ করেছেন। বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে তার ১০টি গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। শিল্পীর চাওয়া অনুযায়ী এ বছরের প্রথম দিকে সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের উদ্যোগে বাউল আব্দুল করিমের সমগ্র সৃষ্টিকর্ম নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কিশোর বয়স থেকে গান লিখলেও কয়েক বছর আগেও এসব গান শুধুমাত্র ভাটি অঞ্চলের মানুষের কাছেই জনপ্রিয় ছিল। সাম্প্রতিককালে এ সময়ের বেশ কয়েকজন শিল্পী বাউল শাহ আব্দুল করিমের গানগুলো নতুন করে গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলে তিনি দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন।

প্রকাশিত বই
বাউল শাহ আবদুল করিমের এ পর্যন্ত ৬টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো হলো- আফতাব সংগীত, গণ সংগীত, কালনীর ঢেউ, ভাটির চিঠি, কালনীর কূলে এবং দোলমেলা। বিগত বছরে সিলেট জেলা মিলনায়তনে তার রচনাসমগ্র অমনিবাস-এর মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে।

শাহ আবদুল করিমের জনপ্রিয় কিছু গান
তিনি তার জীবনে দেড় সহস্রাধিক গান লিখেছেন এবং সুরারোপ করেছেন। তার মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় কিছু গানের মধ্যে বন্দে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, গাড়ি চলে না, আমি কূলহারা কলঙ্কিনী, কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া, কোন মেস্তরি নাও বানাইছে, কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু, বসন্ত বাতাসে সইগো, আইলায় না আইলায় নারে বন্ধু, মহাজনে বানাইয়াছে ময়ুরপংখী নাও, আমি তোমার কলের গাড়ি, সখী কুঞ্জ সাজাও গো, জিজ্ঞাস করি তোমার কাছে, মানুষ হয়ে তালাশ করলে, আমি বাংলা মায়ের ছেলে, রঙ এর দুনিয়া তরে চায় না অন্যতম।

সম্মাননা
বাউল শাহ আব্দুল করিম ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। বাংলা একাডেমি তার দশটি গানের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে। এছাড়া দ্বিতীয় সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানে এই বাউল সম্রাটকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। এছাড়াও ২০০০ সালে কথা সাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরি পদক পান। বাউল সাধক শাহ আবদুল জীবনের একটি বড় অংশ লড়াই করেছেন দরিদ্রতার সাথে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময় তার সাহায্যার্থে এগিয়ে এলেও তা যথেষ্ঠ ছিল না।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে সাউন্ড মেশিন নামের একটি অডিও প্রকাশনা সংস্থা তার সম্মানে ‘জীবন্ত কিংবদন্তীঃ বাউল শাহ আবদুল করিম’ নামে বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া তার জনপ্রিয় ১২ টি গানের একটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। এই অ্যালবামের বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ তার বার্ধক্যজনিত রোগের চিকি‍ৎসার জন্য তার পরিবারের কাছে তুলে দেয়া হয়।

বাউলের প্রয়াণ
২০০৯ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম মৃত্যু বরণ করেন। সেই দিন শনিবার সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে সিলেটের একটি ক্লিনিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সিলেটের নুরজাহান পলি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন আব্দুল করিমকে ১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার দুপুর থেকেই লাইফসাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়ে ছিল।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading