শিশু-কিশোরদের শিক্ষা ও জীবন: গঠনের নতুন উদ্যোগ
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৫:০৫
শিশু-কিশোরদের শিক্ষাজীবন আনন্দময় করতে শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে সরকার। শিশু-কিশোররা তাদের শিক্ষা জীবনে শুধু চাপের মধ্যে না থেকে আনন্দের মধ্য দিয়ে জ্ঞান অর্জন করে জীবন গঠন করতে পারে সেই লক্ষ্যেই নতুন এই শিক্ষাক্রম। এরই আলোকে শিশুরা নিজেদের মতো করে শিখবে এবং দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদুজ্জামান সুপ্ত

দিন দিন বদলে যাচ্ছে মানুষের চিন্তা-চেতনা। বৈশ্বিক সকল কর্মকান্ডেও এসেছে নতুনত্বের ছোঁয়া। নতুন দিনে নতুন ভাবে সবকিছু দেখছে মানুষ। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাও এরই ধারায় নেয়ার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। আর এই আলোকেই শুরু হচ্ছে নতুন শিক্ষাক্রম। এই শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য হচ্ছে সবার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ তৈরি করা। শহরের শিশুদের সঙ্গে যেনো সমানতালে গ্রামের শিশুরাও এগোতে পারে সেই রূপরেখাই হচ্ছে নতুন এই কারিকুলাম। চাপ না নিয়ে শিখননীতি বাস্তবায়নই এর লক্ষ্য। শনিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) নতুন কারিকুলামের পাইলটিং কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি এ কথা জানান।
এ সময়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম, এনসিটিবি সচিব নাজমা আক্তার বিপ্লবী,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. তারিক আহসান প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এনসিটিবি সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান।

শুরুতেই ৬২ প্রতিষ্ঠানে চলবে পরীক্ষামূলকভাবে: নতুন এই শিক্ষাক্রম পরীক্ষামূলকভাবে ৬২ প্রতিষ্ঠানে চলবে। এখন পরীক্ষামূলকভাবে এ কার্যক্রম চলবে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ৬২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটি বাস্তবায়িত হবে। এটা সফল হতে পারলে ২০২৩ সাল থেকে প্রাথমিকভাবে ষষ্ট, সপ্তম শ্রেণি থেকে বাস্তবায়ন করব। ২০২৪ সালে এসে অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে এটি বাস্তবায়িত হবে। সে হিসেবে ২০২৪ সাল থেকে মানবিক, বাণিজ্য ও বিজ্ঞান বিভাগ থাকছে না। শুধু জ্ঞান নয়, পাশাপাশি দক্ষতা অর্জনই লক্ষ্য: ডা. দীপু মনি বলেন, শুধু জ্ঞান নয়, এর সাথে দক্ষতা অর্জনই মূলত নতুন পাঠ্যসূচির লক্ষ্য। সেটি বাস্তবায়নেই আমাদের আগামী দিনের পথচলা।
তিনি বলেন, আমরা দেখব নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা দক্ষতাসম্পন্ন হচ্ছেন কিনা। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বাস্তবায়নে চাই ভূমিকা: শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুযায়ী সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে কিনা শিক্ষার্থীরা সেটি এখন দেখার বিষয়। আমরা যখন দেখব চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের থেকে ফিডব্যাক পাবো, তখন নিজেদের সার্থক মনে করব। আমরা দীর্ঘদিন পর নতুন একটি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যেতে চাচ্ছি। এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। নতুন এই শিক্ষাক্রমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে অভিযোজনের জন্য জ্ঞান, দক্ষতা মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে অর্জিত সক্ষমতাসম্পন্ন করে একজন শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলাই লক্ষ্য। আমরা চাই, মুখস্থ নির্ভরতার বদলে শিক্ষার্থীদের শিখন প্রক্রিয়া হোক আনন্দময়।
শিক্ষায় আমাদের বড় বিনিয়োগ করতেই হবে: ডা. দীপু মনি বলেন, একসঙ্গে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কারিকুলাম বাস্তবায়ন করতে বিশাল আকারের বিনিয়োগ করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতি অবকাঠামোগত বড় পরিবর্তন আনতে হবে। সমস্ত সরঞ্জাম দিতে হবে, শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে ল্যাবরেটরি অ্যাসিটেন্ট নিয়োগ করতে হবে। এটা একটি বড় বিনিয়োগ। শিক্ষায় আমাদের বড় বিনিয়োগ করতেই হবে।
শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরলেই পাইলটিং শুরু হবে: মন্ত্রী বলেন, নতুন কারিকুলাম ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে। ২০২৩ সালে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি বাস্তবায়ন হবে। আর প্রাথমিকে কোনও অসুবিধা নেই মার্চ থেকেই তারা শুরু করতে পারবে। এরই মধ্যে সংক্রমণ আরও হয়তো কমে যাবে। শিক্ষার্থীরা যখন ক্লাসে ফিরবে তখন পাইলটিং শুরু হবে। পরীক্ষা কমিয়ে আনা হবে।

ইতিবাচক: নতুন শিক্ষাক্রমে পরীক্ষা কমিয়ে আনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তার মতে, এতে শিক্ষার্থীদের চাপ কমার পাশাপাশি সরকারি ব্যয় ও অভিভাবকদের খরচ কমবে। তিনি গণমাধ্যমে জানান, এই পরীক্ষার বাহুল্য যত কমানো যায়, আমি তার পক্ষপাতি। এখন পরীক্ষা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটা আমার কাছে সঠিক মনে হচ্ছে। কেননা পাবলিক পরীক্ষার নাম দিয়ে শিশুদের পরীক্ষামনস্ক করে তোলা, গাইডবই-কোচিংয়ের দিকে ঝোঁকা, এটা অন্যায্য কাজ।

শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবে: নতুন এই শিক্ষাক্রম প্রণয়ন নিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জাফর ইকবাল গণমাধ্যমে জানান, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন আনন্দময় করতে নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু মেধা নয়, নিজেদের মতো করে তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবে। মানুষের মস্তিষ্ক মুখস্ত করার জন্য নয়, তথ্য বিশ্লেষণের জন্য। নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন হলে তথ্য মাথায় নিয়ে শিক্ষার্থীরা আর ঘুরবে না। তারা সেটি বিশ্লেষণ করতে পারবে। নতুন সিস্টেমের কারণে কোচিং করার প্রবণতা কমবে।
মুখস্তবিদ্যা থেকে বেরিয়ে আসতে বড় ভূমিকা রাখবে: শিক্ষাবিদ সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম গণমাধ্যমে জানান, আমরা দীর্ঘদিন ধরে খণ্ডে খণ্ডে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিচ্ছি। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে উঠলে তারা গভীর সমুদ্রের মধ্যে পড়ে। জোর করে তাদের ওপর বিভিন্ন বিষয় চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মুখস্তবিদ্যা থেকে বেরিয়ে আসতে নতুন কারিকুলাম বড় ভূমিকা রাখবে।
এনসিটিবির আওতায় সব শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে: এনসিটিবি চেয়ারম্যান (চলতি দায়িত্ব) অধ্যাপক মশিউজ্জামান বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের যেসব স্কুলে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন করা হবে, এ ধরনের ১১৫ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এনসিটিবির আওতায় সব শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এজন্য কিছু শিক্ষককে মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে তৈরি করা হবে। তারা অন্যান্য শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেবেন। তিনি বলেন, ২০২৩ সালের মধ্যে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শেষ না হলে এনসিটিবি নতুন শিক্ষাক্রমের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে না।
যা যা থাকছে নতুন শিক্ষাক্রমে: নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বার্ষিক কোনো পরীক্ষাও থাকছে না। একইসঙ্গে পঞ্চম শ্রেণি শেষে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা (পিইসি ও ইবতেদায়ি) এবং অষ্টম শ্রেণি শেষে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা থাকছে না।
দশম শ্রেণির পর কেবল দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচিতেই প্রথ পাবলিক পরীক্ষা: নতুন কারিকুলামে দশম শ্রেণি শেষ করে প্রথম পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে শিক্ষার্থীদের। তবে এখন নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচির ওপর মাধ্যমিক পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষা তথা এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষা হয়ে থাকে। নতুন শিক্ষাক্রমে এ ক্ষেত্রেও থাকছে ভিন্নতা। কেননা, নবম ও দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচি হবে আলাদা। দশম শ্রেণি শেষে পাবলিক পরীক্ষাটি হবে কেবল দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচির ওপর ভিত্তি করেই। বর্তমানে নবম শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান, মানবিক বা বাণিজ্য বিভাগের কোনো একটি বেছে নিতে হয়। নতুন শিক্ষাক্রমে এসব বিভাগ তুলে দেওয়া হচ্ছে। আলাদা আলাদা বিভাগের বদলে এই পর্যায়েও থাকবে একটি সমন্বিত পাঠ্যক্রম।
শিখনকালীন মূল্যায়নে জোর সর্বোচ্চ: পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে শতভাগ। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান এ বিষয়গুলোতে শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে ৬০ শতাংশ, বাকি ৪০ শতাংশ হবে সামষ্টিক মূল্যায়ন। অর্থাৎ কোনো বিষয়ে ১০০ নম্বর থাকলে পরীক্ষা দিতে হবে ৪০ নম্বরের, বাকি ৬০ নম্বর আসবে শিখনকালীন মূল্যায়ন থেকে। এর বাইরে শারীরিক, মানসিক, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা, ধর্ম শিক্ষা ও শিল্পকলায় মূল্যায়ন হবে শতভাগ। ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানে শিখনকালীন মূল্যায়নও হবে ৬০ শতাংশ, আর সামষ্টিক মূল্যায়ন হবে ৪০ শতাংশ। এর বাইরে জীবন জীবিকা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা, ধর্ম শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতি মূল্যায়ন হবে শতভাগ। তবে নবম ও দশম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানে শিখনকালীন আর সামষ্টিক মূল্যায়ন হবে অর্ধেক করে, অর্থাৎ ৫০ শতাংশ। বাকি বিষয়গুলোর শিখনকালীন মূল্যায়ন ১০০ শতাংশ।
এদিকে, একাদশ ও দ্বাদশে আবশ্যিক বিষয়গুলোতে শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে ৩০ শতাংশ, বাকি ৭০ শতাংশ হবে সামষ্টিক মূল্যায়ন। অর্থাৎ পাবলিক পরীক্ষায় গিয়ে ১০০ নম্বরের মধ্যে পরীক্ষা দিতে হবে ৭০ নম্বরের, বাকি ৩০ নম্বর আসবে শিখনকালীন মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে। তবে প্রায়গিক বিষয় বা ঐচ্ছিক বিষয়ে শিখনকালীন মূল্যায়ন থাকবে শতভাগ। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যসূচির ওপর প্রতি বছর শেষে একটি করে পরীক্ষা হবে। এই পরীক্ষার ফলাফলের সমন্বয়ে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হবে।
আগামী বছর থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন: দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০২৩ সাল থেকে দুই দিন করে সাপ্তাহিক ছুটি থাকবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। বর্তমানে বেশির ভাগ স্কুল ও কলেজে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া বাকি ছয় দিন পাঠদান হয়ে থাকে। তবে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকে।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, ২০২৩ সাল থেকে প্রাথমিক থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই দিন করে সপ্তাহিক ছুটি থাকবে। পাশাপাশি নতুন পাঠক্রমে যারা যুক্ত হচ্ছেন তারাও এখন থেকেই সপ্তাহে দুদিন ছুটি পাবেন।

