নতুন নির্বাচন কমিশন: অনেক প্রত্যাশা

নতুন নির্বাচন কমিশন: অনেক প্রত্যাশা

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৩:৩০

সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ নতুন শনিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। সাবেক সচিব কাজী হাবিবুল আউয়াল নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এই কমিশনের বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন এই নির্বাচন কমিশন নিয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশা অনেক। বিস্তারিত লিখেছেন কিফায়েত সুস্মিত

দেশের ত্রয়োদশ সিইসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন হাবিবুল আউয়াল। তার নেতৃতত্বাধীন কমিশনের পরিচালনায় আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হবে। নতুন এই কমিশনে কমিশনারের দায়িত্ব পালন করবেন চারজন। তারা হলেন- অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আলমগীর ও আনিছুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ রাশেদা সুলতানা এমিলি এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহসান হাবীব খান। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন শনিবার হলেও কবে নাগাদ তারা শপথ নেবেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে গতবার নিয়োগের পরদিনই প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে শপথ নিয়ে দায়িত্ব পালন শুরু করেছিল কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন।

প্রস্তাবিতদের থেকেই নিয়োগ: রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট ব্যক্তি, পেশাজীবী সংগঠনের প্রস্তাবিত তালিকা থেকেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সিইসিসহ অন্যান্য কমিশনারের নিয়োগের তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, সার্চ কমিটির কাছে যেসব নাম প্রস্তাব করা হয়েছে তাদের মধ্য থেকেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
সার্চ কমিটির প্রস্তাবিত নামের তালিকার ৪৯ নম্বরে ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া কাজী হাবিবুল আউয়ালের নাম। এছাড়া ৩২২ জনের ওই তালিকার ২৬১ নম্বরে অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ বেগম রাশিদা সুলতানা, ২৩৬ নম্বরে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহসান হাবিব খান, ১৫৪ নম্বরে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব আলমগীর এবং ১৪৪ নম্বরে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমানের নাম রয়েছে। যদিও প্রস্তাবিত এসব নামের বাইরের কাউকেও সিইসি বা অন্যান্য কমিশনার নিয়োগের সুপারিশ করার এখতিয়ার ছিল সার্চ কমিটির।

প্রত্যাশা অনেক আছে চ্যালেঞ্জও: নতুন এই নির্বাচন কমিশনের ওপর দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক। দেশের সর্বস্তরের মানুষ একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও রাজনৈতিক দলগুলোর শতভাগ অংশগ্রহণমুলক একটি নির্বাচন চায়। আর নতুন কমিশন যদি এই চ্যালেঞ্জগুলো উতরে উঠে একটি উৎসবমুখর নির্বাচন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে তবে সেটাই হবে তাদের বড় অর্জন। বিশ্লেষকরা বলছেন, তাদের শুরুতেই দেখতে হবে পূর্ববর্তী কমিশন কি করেছে এবং দেশের জনগন ও রাজনৈতিক দলগুলো মূলত কি চাচ্ছে। এই দুয়ের মধ্যে থেকে সব রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরি করা। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নানা ঘটনা আসন্ন নির্বাচনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সেই দিক বিবেচনায় নতুন এই কমিশনের অনেক কাজ। তাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ উতরে যেতে হবে এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে।

গ্রহণযোগ্য করতে না পারলে মনোবেদনা থাকবে: প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর কাজী হাবিবুল আউয়াল গণমাধ্যমকে বলেছেন, যদি সবাইকে নিয়ে একটি সম্মানজনক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারি তবে হয়ত সফলতার সুখ কিছুটা ভোগ করতে পারব, নতুবা মনোবেদনা থাকবে। তিনি আরও বলেন, সিইসি হিসেবে শপথ নেয়ার পর আমি আমার সব সহকর্মীদের সাঙ্গে মত বিনিময় করব। কিতাবে কী লিখা আছে তা দেখব। জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র দুই বছরের মতো সময় বাকি আছে। তাই প্রস্তুতি নিতে হবে। যদি সবাইকে নিয়ে একটি সম্মানজনক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারি তবে হয়ত সফলতার সুখ কিছুটা ভোগ করতে পারব।

সব দলের প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিতের অঙ্গিকার: সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব দায় নির্বাচন কমিশনের নয় মন্তব্য করে হাবিবুল আউয়াল বলেন, সব দলের প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিত করতে তিনি কাজ করবেন। তিনি বলেন, যদি রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা না পান তবে তাকে নিয়েও ‘ইমেজ সংকট’ হতে পারে। অতীতের দুটি নির্বাচন কমিশনের ইমেজ সংকট আছে, সেটা কাটাতে কী করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইমেজ সংকট আমাকে নিয়েও হতে পারে। আমি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দলগুলোর সহযোগিতা না পাই, নির্বাচনী পরিবেশ অনুকূল না হলে আপনারা আমাকে দায়ী করবেন। আমাদের চেয়ে অনেক বড় হচ্ছে রাজনৈতিক দায়িত্ব। তারা যদি মনে করে নির্বাচন কমিশন সুন্দর নির্বাচন করিয়ে দেবে, তাহলে ভুল-ভ্রমাত্মক ধারণা হবে। তাদেরকে সক্রিয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। তারা আমার কাছে সহযোগিতা চায়, আমিও সহযোগিতা চাই।

মাঠ ছেড়ে দিলে নির্বাচন অবাধই হবে: তিনি বলেন, আপনি যদি মাঠ ছেড়ে দেন, তাহলে নির্বাচন অবাধই হবে। কোনো বাধা থাকবে না। মাঠে যদি থাকেন, তাহলে নির্বাচন বাধা-বিপত্তির মধ্যে সকলের অংশগ্রহণটা হবে। অবাধ হল, কেউ গেল না আমি একাই ভোট দিয়ে আসলাম। সে অবাধ আমরা চাচ্ছি না। ‘লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড’ ইসিকে তৈরি করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটাও আমি বলবো অ্যাবসলিউট সেন্সে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে কতটা সম্ভব হবে এজন্য পক্ষ-প্রতিপক্ষ শক্তিকে কাছাকাছি শক্তির হতে হয়। যারা অপজিশনে থাকবেন তাদের আরও সক্রিয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে। তাহলে মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগ আপেক্ষিকভাবে ভালো হবে।

নতুন চার নির্বাচন কমিশনার (বাঁ থেকে ঘড়ির কাঁটার দিকে)- রাশেদা সুলতানা এমিলি, আহসান হাবীব খান, আনিছুর রহমান ও মো. আলমগীর।

হাবিবুল আউয়ালের আদ্যোপান্ত: ৬৬ বছর বয়সী হাবিবুল আউয়াল পাঁচ বছর আগে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। এরপর তিনি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে আইন বিভাগে শিক্ষকতা করছিলেন। হাবিবুল আউয়ালের পৈত্রিক ভিটা চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দীপে হলেও তার জন্ম কুমিল্লায়। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে জেলখানায় জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলার বাদী ছিলেন তৎকালীন কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) আবদুল আউয়াল। বিসিএস ১৯৮১ ব্যাচের এই কর্মকর্তা সরকারি চাকরি শুরু করেন মুনসেফ (সহকারী জজ) হিসেবে। ১৯৯৭ সালে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০০০ সালের ডিসেম্বরে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব হন হাবিবুল আউয়াল। ২০০৪ সালে হন অতিরিক্ত সচিব। ২০০৭ সালে পদোন্নতি পেয়ে একই মন্ত্রণালয়ের সচিব হন তিনি। সচিব হওয়ার পর ২০০৯ সালে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত আইন মন্ত্রণালয়েই ছিলেন হাবিবুল আউয়াল। ২০১০ সালে এপ্রিলে ধর্ম সচিব করা হয় হাবিবুল আউয়ালকে। পরে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব করা হয়। ২০১৪ সালে সেখান থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব করে পাঠানো হয় তাকে। ওই বছরই পদোন্নতি পেয়ে জ্যেষ্ঠ সচিব হন তিনি। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে অবসরে যাওয়ার কথা ছিল হাবিবুল আউয়ালের। কিন্তু পিআরএল বাতিল করে তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হিসেবে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেয় সরকার। ২০১৬ সালে আরও এক বছর বাড়ানো হয় চুক্তির মেয়াদ। এরপর ওই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকেই জ্যেষ্ঠ সচিব হিসেবে ২০১৭ সালে অবসরে যান তিনি।

নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনই ব্রত: এদিকে, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নতুন নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সাবেক জ্বালানি সচিব মো. আনিছুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, আমি যে রকমভাবে কাজ করে এসেছি, সেভাবেই করব। আইন-বিধি অনুযায়ী, সংবিধান আমাকে যেটুকু ক্ষমতা দিয়েছে, সেগুলো নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করব। জাতির তো অনেক প্রত্যাশা এবারের নির্বাচন কমিশনের কাছে এবং অনেক চ্যালেঞ্জও রয়েছে এবারের নির্বাচন কমিশনের ওপর, সেটি কীভাবে বিবেচনা করবেন, সে প্রশ্নে নতুন ইসি বলেন, সেটা আসলে আমরা আগে বসি, এরপর আমরা আলাপ-আলোচনা করব, আমাদের সামনে কী আছে, কী করতে হবে, এককভাবে তো আর কমিশন না, সবাই মিলে। আমার এককভাবে বলাটা মনে হয় ঠিক হবে না।

অতীতের ইসির ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে না: অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার চেষ্টা করা এবং অতীতের ইসির ভুলের পুনরাবৃত্তি না করাই হবে নতুন কমিশনের প্রথম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন নবনিযুক্ত নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর। শনিবার গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দলকে আস্থায় নিয়ে কমিশন পরিচালনার চেষ্টা করা হবে। তিনি আরও বলেন, ইসির কর্মকাø যেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় সেদিকে তারা সতর্ক থাকবেন। বিরোধী দল বিএনপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল ইসি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি তাহলে তারা কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন জানতে চাইলে মো. আলমগীর বলেন, আমরা কমিশন মিটিংয়ে বসব, সবাই তাদের মতামত দেবেন। অবশ্যই আমরা সব রাজনৈতিক দলকে আস্থায় নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করব।

সরকারকে ডা. জাফরুল্লাহ’র অভিনন্দন: প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জাফরুল্লাহ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, সরকার অনেকদিন পর সঠিক কাজ করেছে। তাদের অভিনন্দন। আশা করি তাকে সব ধরনের সাপোর্ট দেয়া হবে এবং তিনি তার দায়িত্ব পালন করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবেন। কমিটির সঙ্গে সাক্ষাতে গিয়ে যে ১০ জনের নাম দিয়েছিলেন গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী, তার মধ্যে কাজী হাবিবুল আউয়ালও ছিলেন।
কোন বিবেচনায় কাজী হাবিবুল আউয়ালের নাম তালিকায় দিয়েছিলেন প্রশ্নে তিনি বলেন, তার পরিবার ও অতীত বিবেচনা করে মনে হয়েছে তার ওপর আস্থা রাখা যায়। গত ১০ বছর তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ নেই। নাম দেয়ার বিষয়ে আমি তার কাছে অনুমতিও চাইনি। আমার চিন্তার স্বচ্ছতায় মনে করেছি তিনি কাজটি ভালোভাবে করবেন। উনার কর্মজীবন পর্যবেক্ষণে রেখেছিলাম। উনার পিতা আইজি প্রিজন হিসেবেও দক্ষ ও সৎ ব্যক্তি ছিলেন।

প্রথমবারের মতো আইন অনুযায়ী ইসি গঠন: এবারই প্রথম আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠিত হলো। গত ২৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে আইন পাসের পর সিইসি ও অন্যান্য নির্বাচন প্রসঙ্গত, কমিশনার পদের জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের খোঁজার জন্য গত ৫ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে আবেদন করা ৩২২ জনের নাম প্রকাশ করেছিল সার্চ কমিটি। গত মঙ্গলবার এদের মধ্য থেকে ১০ জনের নাম চূড়ান্ত করা হয়। পরে বৃহস্পতিবার সার্চ কমিটি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে নাম জমা দেয়। রাষ্ট্রপতি তাদের মধ্য থেকে সিইসি ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার পদে পাঁচ জনকে নিয়োগ দিলেন।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading