বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার প্রবক্তা সত্যেন্দ্রনাথ বসু

বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার প্রবক্তা সত্যেন্দ্রনাথ বসু

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৫:১৫

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সঙ্গে যে স্বনামধন্য বিজ্ঞানীর নাম একযোগে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু। সত্যেন্দ্রনাথ শুধুমাত্র অগ্রগামী বিজ্ঞানীই ছিলেন না, সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন মাতৃভাষা বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার প্রাণপুরুষ, বিশিষ্ট বাণী, রুরালী ও জার্মান ভাষায় পারদর্শী ও বিশিষ্ট শিক্ষাব্রতী। এছাড়া বাংলা ভাষায় জনপ্রিয় বিজ্ঞানচর্চা প্রসারের ক্ষেত্রেও সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন একনিষ্ঠ সাধক ও সংগঠক। বোসন নামে মৌলিক কণায় তার অস্তিত্ব সারা দুনিয়ার বিজ্ঞানীরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন সাইফুল অনিক

সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন একজন বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞান। সত্যেন্দ্রনাথ বসু আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে যৌথভাবে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান প্রদান করেন, যা পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বলে বিবেচিত হয়। ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী সত্যেন্দ্রনাথ কর্মজীবনে সংযুক্ত ছিলেন বৃহত্তর বাংলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষায়তন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। সান্নিধ্য পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, মারি ক্যুরি প্রমুখ মনীষীর। এই কিংবদন্তীসুলভ মানুষটির জন্ম ১৮৯৪ খ্রীস্টাব্দের ১লা জানুয়ারি ইন্ডিয়ার পশ্চিম বঙ্গের উত্তর কলকাতার গোয়াবাগান অঞ্চলে। বাবার নাম সুরেন্দ্রনাথ বসু। মা আমোদিনী দেবী।

শিক্ষা জীবনে দ্বিতীয় হননি তিনি
শৈশবেই শিক্ষার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তার। মা-বাবার একমাত্র সন্তান সত্যেন্দ্রনাথ নর্মাল স্কুলের পর হিন্দু স্কুলে ভর্তি হন। ১৯০৯ খ্রীস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-পরিচালিত এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অধিকার করে প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। ১৯১১ খ্রীস্টাব্দে এফ. এ. পরীক্ষায় প্রথম স্থান এবং ১৯১৩ খ্রীস্টাব্দে স্নাতক পরীক্ষায় গণিতে অনার্সসহ প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯১৫ খ্রীস্টাব্দে স্নাতকোত্তর মিশ্রগণিত পরীক্ষাতেও প্রথম স্থানটি তারই অধিকারে থাকে।

গবেষণায় বিশ্বজয় ও খ্যাতিময় কর্মজীবন
বাংলা তথা ইন্ডিয়ার এই কৃতী ছাত্রটিরও চাকরির সন্ধানে দুটি বছর যায়। ১৯১৭ খ্রীস্টাব্দে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবগঠিত বিজ্ঞান কলেজে পদার্থবিদ্যা ও মিশ্ৰগণিতের অধ্যাপকরূপে যোগ দেন। ১৯২১ খ্রীস্টাব্দে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার রীডার হন। ক্রমে হন ঐ বিভাগের প্রধান। সেখান থেকে একখানা ছ-পাতার গবেষণামূলক প্রবন্ধ তিনি আইনস্টাইনের কাছে পাঠান। ১৯২৪ খ্রীস্টাব্দের জুন মাসে সেই প্রবন্ধটির মৌলিকতায় গভীরভাবে অভিভূত হন জার্মান বিজ্ঞানী আইনস্টাইন। তা থেকেই হয় ‘বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন।

১৯০০ খ্রীস্টাব্দে জার্মান বিজ্ঞানী প্ল্যাঙ্ক কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণে শক্তির পরিমাপ সম্পর্কে যে সূত্র দেন, সেই সূত্রের প্রতিষ্ঠায় আইনস্টাইনীয় ব্যাখ্যায় কিছু বিচ্যুতি ছিল। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ মৌলিকতার সূত্রে প্ল্যাঙ্কের সূত্রটিকে সুসংবদ্ধ করেন। তার ভাবনার আলোকে আইনস্টাইন একক পরমাণু সম্পন্ন কোয়ান্টাম্বাদ গড়ে তোলেন। সারা বিশ্ব বিস্মিত হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থানুকূল্যে সত্যেন্দ্রনাথ ১৯২৪ খ্রীস্টাব্দে ইউরোপ যাত্রা করেন। ফ্রান্স হয়ে যান জার্মানী। আইনস্টাইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলাপ হয়।

বিশ্ববিজয়ের পর দেশে ফিরে এলে জড় হয় একের পর এক খ্যাতির মালা। ১৯২৯ খ্রীস্টাব্দে হন ইন্ডিয়ান বিজ্ঞান কংগ্রেসে পদার্থবিজ্ঞান শাখার সভাপতি। ১৯৪৫ খ্রীস্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান হয়ে আসেন। এই বছরই তিনি আইনস্টাইনের নতুন ক্ষেত্রতত্ত্বের ওপর কাজ শুরু করে ১৯৫২ খ্রীস্টাব্দে সহজ পদ্ধতিতে ঐ তত্ত্বের সম্পূর্ণতা দান করেন। জীববিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা এবং রসায়নের ওপরও তিনি আলোকপাত করেছেন। ১৯৫৭ খ্রীস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৫৮ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ডক্টরেট উপাধিতে সহ হন। ইন্ডিয়া সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক রূপে নির্বাচিত করেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ খ্রীস্টাব্দ অবধি তিনি বিশ্বভারতীর উপাচার্যের পদ অলঙ্কৃত করেন।

মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার প্রবক্তা
সত্যেন্দ্রনাথ বসু সারা জীবন বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করলেও নিজের মাতৃভাষার প্রতি তার ছিল অগাধ শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা। উপনিবেশিক ভারতবর্ষে যখন মানুষ কেবলমাত্র ইংরেজি শিক্ষাকেই শিক্ষিত মানুষ হওয়ার মাপকাঠি বলে মনে করত সেই সময় তিনি মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন তার শিক্ষক প্রবাদপ্রতিম বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু এবং আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের থেকে। সমকালীন সময়ে বিজ্ঞান চর্চা বলতে ইংরেজি ভাষার বিকল্প হিসেবে অন্য কিছুকে প্রায় ভাবাই যেত না। স্রোতের বিপরীতে চলে সত্যেন বসু তখন বাংলাভাষায় বিজ্ঞান চর্চাকে সমর্থন করে অসংখ্য অবদান রেখে যান। তার নেতৃত্বেই ১৯৪৮ সালে গঠিত হয় বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ।

এই পরিষদের মঞ্চ থেকেই তিনি বারংবার মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার পক্ষে সওয়াল করতে থাকেন। এই সংস্থার মুখপত্র হিসেবে বাংলা ভাষার বিজ্ঞান পত্রিকা জ্ঞান ও বিজ্ঞান প্রকাশিত হয়। তিনি বার বার তার প্রতিভা দ্বারা প্রমাণ করে গিয়েছেন যে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের মৌল নিবন্ধ রচনা করা সম্ভব। বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের মুখপত্রে তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন- “যারা বলেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা সম্ভব নয় তারা হয় বাংলা জানেন না অথবা বিজ্ঞান বোঝেন না।”

গবেষকের পাশাপাশি ছিলেন সাহিত্যিক
১৯১৬ খ্রীস্টাব্দের নভেম্বরে বন্ধু হারীকৃষ্ণ দেবের মধ্যস্থতায় এবং প্রমথ চৌধুরীর একান্ত আগ্রহে সবুজপত্র’-এর আসরে যোগ দেন তিনি। বিচিত্রা-র আসরেও তিনি উপস্থিত থাকতেন। পরিচয় পত্রিকার সঙ্গেও ছিল তার নাড়ীর টান। সমালোচক নীরেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন তার সম্পর্কে ভাই এবং পরম সুহৃদ। নীরেন্দ্রনাথ তাই সারা জীবনের সঞ্চয় বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদকে দান করেন। ঢাকায় থাকাকালীন ‘বিজ্ঞান পরিচয়’ প্রকাশ, কলকাতায় বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ প্রতিষ্ঠা এবং তার মুখপত্র জ্ঞান ও বিজ্ঞান’-এর প্রকাশনায় তিনি ব্রতী হন। তারই উৎসাহে বাংলা ভাষায় প্রথম বিজ্ঞানের অভিধান ‘বিজ্ঞান ভারতী’ রচনা করেন দেবেন্দ্রনাথ বিশ্বাস। লোকশিক্ষার প্রয়োজনে ঐ গ্রন্থের মূল্য অপরিসীম।

দেশ-দেশান্তরের সম্মাননা
সত্যেন্দ্রনাথ বসু ১৯৫৪ খ্রীষ্টাব্দে ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি লাভ করেন। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৫৮ খ্রিঃ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করে । ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দেই ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটি তাকে ফেলো মনোনীত করে। তার সমগ্র জীবনের কর্মক্ষেত্র কলকাতা শহরে সত্যেন বসুর নামে সত্যেন্দ্রনাথ বসু জাতীয় মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘বিশ্বপরিচয়’ সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামে উৎসর্গ করেছিলেন।

বিজ্ঞান সাধকের প্রয়াণ
বিজ্ঞান ইতিহাসের এই মহাসাধক ১৯৭৪ খ্রিঃ ৪ঠা ফেব্রুয়ারী কলকাতায় আশিবছর বয়সে লোকান্তরিত হন। বর্তমান শিক্ষার্থীরা যদি এই বিজ্ঞানসাধকের জীবনের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় তবে দেশ ও জাতির মঙ্গল হবে।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading