মানবপাচার রোধে দরকার সম্মিলিত প্রচেষ্টা
সাদিকুজ্জামান পলাশ । সোমবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৫:০০
করোনা মহামারীর থাবায় সারা বিশ্ব আজ নাজেহাল। ভেঙ্গে পড়েছে মানুষের মুখোমুখি যোগাযোগ। এক দেশ থেকে অন্য দেশ এমনকি দেশের অভ্যন্তরে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে চলাফেরার রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। বৈশ্বিক অর্থনীতির উপর পড়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া, খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা করেছ অনেক রাষ্ট্র। মানবউন্নয়ন সূচকগুলোর উপর বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষার উপর নেমে এসেছে বিপর্যয়। ২০২০ সালে এসে কিছু টিকা আবিষ্কৃত হওয়ায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্ঠা করছে অনেক দেশ। টিকার অপ্রতুলতা এবং করোনার নতুন নতুন ভেরিয়েন্টের হানা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছ প্রতিনিয়ত।
করোনাভাইরাসের মহামারীর ভয়াবহতার কাছে আড়ালে পড়ে যাচ্ছে মানব সভ্যতার জন্য হুমকির অনেক আলোচিত বিষয়। সারা বিশ্বের বিশেষ করে অনুন্নত রাষ্ট্রের জন্য দরিদ্র্যতার পাশাপাশি একটা সামাজিক অভিশাপ মানবপাচার। অনেক আলোচিত বিষয়ের আড়ালে থেকে যায় মানবপাচারের মত জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি।
বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে মানুষ কেন মানবপাচারের শিকার হয় সেই প্রশ্নের উত্তরে দুটি বিষয়কে সর্বাধিক আলোচনা করা যেতে পারে, প্রথমত- অসচ্ছলতা এবং দ্বিতীয়ত- বেকারত্ব। দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি লাভের জন্য মানুষের চেষ্টা একটা চিরাচরিত ব্যাপার। যদি কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্মসংস্থানের পথ দেখায়, নিজের ভাগ্যের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে অনেকে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হয়। তারা এই সুযোগকে ব্যাবহার করে অবৈধ পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমায় বিদেশে। পাচারকারীরা তাদের স্বার্থ হাসিল করে অর্থের বিনিময়ে। তাদেরকে তুলে দেয় বিদেশে থাকা তাদের লিয়াজো গ্যাঙের হাতে।
নারীদের ক্ষেত্রে তালাকপ্রাপ্ত, অল্প বয়স্ক বিধবা, বা কাজের সন্ধানকারীকে টার্গেট করে পাচারকারীরা। ক্ষেত্র বিশেষে প্রেমের ফাঁদে ফেলে পাচার করে দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশে।অনেক সময় পাচারকারীরা পাচারের শিকার ব্যক্তির পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ দাবী করে। পাচারের শিকার এই সমস্ত মানুষের দুঃখের সীমা থাকে না। অনেক মানুষ কোন উপায় না পেয়ে নির্মমভাবে মৃত্যুর শিকার হয়, দাসত্বের বেড়াজালে আটকে পড়ে সমগ্র জীবন, নারীরা বাধ্য হয় পতিতাবৃত্তিতে, শিশুদেরকে বাধ্য করা অমানুষিক শ্রমের সাথে যুক্ত হতে। অনেক নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়। কাউকে পিটিয়ে হাত পা ভেঙে দেওয়া, শরীরকে আয়রন দিয়ে ঝলসে দেয়ার মত ঘটনাও ঘটেছে। অনেকটা দাসের মত কাটতে থাকে দিনগুলো।
অপরাধ দমনে দেশে অনেক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা বিভাগ কাজ করছে। তারপরও নারী ও শিশু পাচারের ঘটনা এখনও কমছে না বরং দিন দিন এর মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। একের পর এক মানব পাচারের যে ঘটনা ঘটে চলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো কোনোভাবে তার দায় এড়াতে পারে না। অতীতে আমরা দেখেছি, যখন কোনো অপরাধী চক্র ধরা পড়ে, তখন তাদের নিয়ে কিছুদিন তৎপরতা চলে। তারপর সবাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। অবৈধ মানব পাচার প্রতিরোধে এ মুহূর্তে দেশব্যাপী জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন।
মানব পাচার রোধে জাতীয় ও গ্রাম পর্যায়ে সভা, সমাবেশ, সেমিনার, আলোচনা ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। এতে মসজিদের ইমাম, খতিব, শিক্ষক ও ধর্মীয় নেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকবে। তারা নিজ নিজ এলাকায় এ বিষয়ে জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন। এ বিষয়টি বাস্তবায়ন ও কার্যকর করার জন্য গ্রাম পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ সরকারের গোচরে এলে পাচারের শিকার বিদেশকর্মীদের দেশে ফেরত আনার পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। ফেরত আসার পরে পাচারের শিকার নারী বা পুরুষের বিমর্ষ চেহারা বলে দেয় তাদের জীবনের ভয়াবহতা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় অনেকটা আড়ালে চলে যায় কে বা কাদের শিকার হয়ে তাদের জীবনে নেমে এলো এমন দুর্বিষহতা। কেন, কিভাবে তারা শিকার হল, কে বা কারা জড়িত, উদ্দেশ্য কি; মানবপাচারের সেই বিষয়গুলো থেকে যায় অজানা। তবে, ভুক্তভোগীরা এই অপরাধ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে, ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিত ও উদ্ধার এবং পুনর্বাসনের পথে সহায়তা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক
ইউডি/অনিক

