পরকীয়া: এক বিধ্বংসী ভাইরাসে ধ্বংসের পথে পরিবার ও সমাজ

পরকীয়া: এক বিধ্বংসী ভাইরাসে ধ্বংসের পথে পরিবার ও সমাজ

মার্জিয়া রহমান স্বর্ণা । মঙ্গলবার, ১ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৫:৪০

সমাজের মূলমন্ত্র পরিবার। পরিবার গঠনে বিয়ে হলো প্রত্যেক ধর্মের পবিত্র বন্ধন। সেজন্য বিয়ে-বহির্ভূত নারী-পুরুষের সম্পর্ক সকল ধর্মেই নিষিদ্ধ। বিয়েরর মতো পবিত্র বন্ধনের মাধ্যমে যে সম্পর্কের সূচনা হয়, তা বর্তমানে অনায়াসে ভেঙে যাচ্ছে পরকীয়ার কারণে। এর প্রাদুর্ভাব সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বর্তমান সময়ে আলোচিত ব্যাধি পরকীয়া। পরকীয়া একটি অমানবিক বিকৃত মানসিকতার কাজ। শরিয়তের পরিভাষায় পরকীয়া বলা হয়, বিয়ে-পরবর্তী কারো সঙ্গে কোনো ধরনের প্রেম-ভালোবাসাকে। ইসলাম এটাকে সম্পূর্ণরুপে হারাম করে দিয়েছে।

পরকীয়া মানবতাবিরোধী একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ। এই জঘণ্য কাজটি বর্তমানে লাগামহীন পাগলা ঘোড়ার ন্যায় ছুটে চলেছে। যার প্রচণ্ড খুরের আঘাতে সমাজ ক্ষত-বিক্ষত হওয়ার উপক্রম। সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো নারী-পুরুষ পরকীয়ায় লিপ্ত হতে পারে না। পরকীয়া সম্পর্কে যেমন সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট হয়, তেমনি পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল ধরে। পরকীয়া নামের অসামাজিক ইসলাম বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কের অশুভ থাবায় বিপর্যয়ের মুখে সংসার ও পরিবার। সমাজের নিম্ন স্তর থেকে উচ্চচ স্তরের সকল শ্রেণি পেশার মানুষের মাঝে এই ঘৃণ্য স্বভাব বিদ্যমান। ফলে স্বামী-স্ত্রীর দুই পরিবারে সম্পর্কের টানাপোড়নের সাথে সাথে তৃতীয় আরেকটি পরিবারেও অশান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। সমাজে ব্যাপক বিস্তরণশীল এই ব্যাধির জন্য দায়ী কে? শুধুই কি ব্যক্তি? হ্যাঁ ব্যক্তির নোংরা মানসিকতার দায়বদ্ধতা অবশ্যই আছে। যার ফলশ্রুতিতে জঘন্য হত্যাকাণ্ডও সংঘটিত হচ্ছে। অনেকে অশান্তি সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। কিন্তু কেন? তার একটাই উত্তর ভয়ঙ্কর ব্যাধি পরকীয়া।

বিভিন্ন কারণে পরকীয়া সংঘটিত হয়। যেমন একসঙ্গে না থাকা, পরনারী বা পুরুষের প্রতি আকর্ষণ বোধ করা, ধৈর্য ধারণ না করা, অশ্লীল বিনোদন দেখা, অতিরিক্ত বাইরে যাওয়া, ধর্মীয় জ্ঞান না থাকা। বিশেষ করে পশ্চিমা নষ্ট সংস্কৃতির অন্ধানুসরণ, ভারতীয় বাংলা-হিন্দি সিনেমা এবং সিরিয়ালের ব্যাপক বিস্তরন, ফেসবুক এবং ইলেক্ট্রনিক প্রিন্ট মিডিয়ার অপব্যবহারের দরুন স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্মানবোধ, ভালোবাসা, আত্মোবিশ্বাস উঠে গেছে। নগ্ন নারী-পুরুষ মডেলের কামুক আবেদনময়ী সৌন্দর্য যখন স্বামী অথবা স্ত্রী দেখছে তখন নিজের স্ত্রী/স্বামীর সৌন্দর্য আর তাকে তৃপ্তি দিতে পারছে না। ঠিক তখনই এরা পরকীয়ার মতো ভয়ঙ্কর সমাজবিরোধী পথ বেছে নিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে। আর পরিবার ধ্বংস হলে সমাজ ধ্বংস হবে এবং সমাজ ধ্বংস হলে রাষ্ট্রের অস্তিত্য থাকবে না।

পরকীয়ার জেরে পৃথিবীতে ভাংছে হাজারো সুখের সংসার। গর্ভধারিণী মা তার সন্তাদের রেখে চলে যায় অন্য পুরুষের সাথে। সন্তানরা হারাচ্ছে তাদের সোনালী ভবিষ্যৎ, ভোগছে নরক যন্ত্রনায়। বর্তমানে মা তার সন্তানকে খুন করছে। স্বামী তার স্ত্রীকে খুন করছে। স্ত্রী তার স্বামীকে খুন করাচ্ছে ভাড়াটে খুনি দিয়ে ইত্যাদি অহরহ ঘটনা ঘটছে আমাদের এই বাংলাদেশে। এইসব খুনের মূল উপজীব্য বিষয় হলো পরকীয়া। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণীদের প্রেম, পালিয়ে বিয়ে এবং পরকীয়ার কারণে পারিবারিক, সামাজিক অস্থিরতা এবং নানাবিদ অনাকাঙ্খিত ঘটনা দিন দিন বাড়ছে নতুন নতুন মাত্রায়। এর বেশীরভাগ সূত্র ঘটে মোবাইল, ফেসবুক, ইমো, ভাইবারসহ ইন্টারনেটের সাথে সম্পৃক্ত প্রযুক্তির মাধ্যমে। প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার সামাজিক অবক্ষয় অনাচার বিস্তারের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা। তাদের মতে, প্রযুক্তি এবং গণমাধ্যম নানামূখী চাহিদা এবং ভোগের আকাঙ্খা সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি সন্তানদের প্রতি মা-বাবার মনোযোগের অবহেলা, ধর্মীয় এবং নীতি-নৈতিকতা চর্চার অভাবে ছড়িয়ে পরছে নানাবিধ অনাচার।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, পরকীয়ার কারণে পরিবার ভেঙ্গে যায়। পারিবারিক ও সামাজিক সুখ নষ্ট হয়। একটি সমাজকে নষ্ট করে দেয়ার জন্য পরকীয়ার বিষাক্ত ভাইরাসের মতোই কাজ করে বলে তারা মনে করেন। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত পরিবারে এই ব্যাধি দিন দিন মারাত্মক ভাবে বিস্তার লাভ করছে। অনেকেই এই সমস্যায় ভুগছেন আর মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট এর ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার পর পরকীয়ার হার আরও বেড়ে গেছে। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তি, ইন্টারনেট আর টিভি চ্যানেলগুলো একটু সচেতন হলে সমাজ থেকে পরকীয়া নামক ভাইরাস শব্দটি ক্রমান্বয়ে কমে যাবে।

লেখক: শিক্ষিকা।

ইউডি/সিফাত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading