ভ্যাকিউম বোমা ব্যবহার: মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল

ভ্যাকিউম বোমা ব্যবহার: মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল

অনিক সরকার । রবিবার, ১৩ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:৪০

রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনে সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়াবহ বিষয়বস্তু হল ভ্যাকিউম বা থারমোব্যারিক বোমা। মানবাধিকার সংগঠন এবং আমেরিকার ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত অভিযোগ করেছেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ভ্যাকিউম বা থারমোব্যারিক বোমা ব্যবহার করেছে। গত সোমবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সুমি অঞ্চলে বিস্ফোরণে যে তেল পরিশোধনাগার বিধ্বস্ত হয়েছে সেখানে এই ভ্যাকিউম বোমা ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদিও নিরপেক্ষ কোন সূত্র থেকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি তা যাচাই করতে পারেনি। বলা হয় বিস্ফোরক দিয়ে তৈরি বোমার চেয়েও মারাত্মক বিধ্বংসী এই ভ্যাকিউম বোমা।

সিএনএন প্রথম একটি রিপোর্টে জানায়, রাশিয়া ইউক্রেনে ভ্যাকিউম বোমা ব্যবহার করছে। রাশিয়ার টিওএস-১ ট্যাঙ্ক দেখা গেছে, যে ট্যাঙ্ক এই ভ্যাকিউম বোমা ছুঁড়তে পারে। ইউক্রেনের ওখতিরকা শহরে রাশিয়া এই বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তারা ফুটেজ দেখেছে। কিন্তু এখনো ওই বোমাই ফাটানো হয়েছিল কি না, তা প্রমাণ হয়নি। তবে এই বোমা ফাটানো যুদ্ধাপরাধের মধ্যে পড়ে বলে তারা জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, বিস্ফোরণের ইমপ্যাক্ট দেখে মনে হচ্ছে, রাশিয়া ভ্যাকিউম বোমাই ব্যবহার করেছে।

এর আগে রাশিয়া দাবি করেছিল ইউক্রেনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র প্রয়োগের কথা পরিকল্পনা করছে আমেরিকা। এবার সেই দাবিকে উড়িয়ে ওয়াশিংটনের দাবি, রাশিয়ার ইঙ্গিত থেকে মনে হচ্ছে এবার হয়তো রাশিয়াই যুদ্ধে জৈব অস্ত্র প্রয়োগ করতে চলেছে। এবার সেই দাবীকেই কার্যত মান্যতা দিল রাশিয়া। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রালয়ের তরফে এই ধরনের অস্ত্র প্রয়োগের দাবিকে সিলমোহর দিয়েছে।

ভ্যাকিউম বোমা কোনো ধরনের নিউক্লিয়ার বোমা নয়। কিন্তু প্রায় তার কাছাকাছি ক্ষতি করতে পারে ভ্যাকিউম বোমা। একটি গোটা অঞ্চলকে মুহূর্তে তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা থাকে এই বোমায়। এই ভ্যাকুয়াম বোমার আরেক নাম হলো থার্মোবারিক ওয়েপন। ভ্যাকিউম বোমা হলো এমন এক প্রকার বিস্ফোরক যা উচ্চ-তাপমাত্রার বিস্ফোরণ ঘটাতে পার্শ্ববর্তী বাতাস থেকে অক্সিজেন ব্যবহার করে। ফুয়েল-এয়ার বিস্ফোরক হলো সবচেয়ে জনপ্রিয় থার্মোবারিক অস্ত্রগুলোর একটি। এই বোমা ফাটলে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। এই বোমা বিস্ফোরণ হওয়ার পর আশেপাশে প্রবল তাপ তৈরি হয়। শুধু তাই নয়, অনেকক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হয় এর প্রভাব।

ইউক্রেনের সীমান্তে অবস্থানকারী সিএনএন-এর একজন সংবাদদাতার ধারণ করা এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে রাশিয়ার বেলগরদ শহরে টিওএস-ওয়ান নামে এক ধরনের রকেট লঞ্চার বহনকারী নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যা থারমোব্যারিক বোমা বহন ও নিক্ষেপে ব্যবহার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও এই ধরনের ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে। টুইটারে এমনকি ভ্যাকিউম বোমার বিস্ফোরণের ফুটেজও পাওয়া যাচ্ছে। তবে এর কোনটিই নিরপেক্ষ সূত্র থেকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মার্কিন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির একটি গবেষণা অনুসারে, বদ্ধ স্থানের মধ্যে এই বিস্ফোরণের প্রভাব মারাত্মক, অপরিসীম হয়ে উঠতে পারে। ইগনিশন পয়েন্টের কাছাকাছি কেউ থাকলে শরীরে ভয়ঙ্কর আঘাত আসতে পারে। মৃত্যুও হতে পারে। সাময়িকভাবে অজ্ঞান হলেও শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে। কারণ এর প্রভাবে ফুসফুসের কোষ থেকেও অক্সিজেন বেরিয়ে যেতে শুরু করে। মস্তিষ্কের কোষগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই বোমা প্রথম আবিষ্কার করেন মারিও জিপারমায়ার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান লুফটওয়াফ এবং ওয়েহরমাখ্টের এটি ব্যবহার করেছিল বলে জানা যায়। তবে রাশিয়া সত্যিকার অর্থেই ইউক্রেনে ভ্যাকুয়াম বোমা ব্যবহার করেছে কি না, তার সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

১৯৬০-এর দশক থেকে রাশিয়া ও পশ্চিমা বাহিনী ভ্যাকিউম বোমা ব্যবহার করেছে। আফগানিস্তানে গুহার মধ্যে অবস্থান নেয়া আল-কায়েদা যোদ্ধাদের আক্রমণে মার্কিন বাহিনী এই বোমা ব্যাবহার করেছে। ২০০০ সালে রাশিয়া চেচনিয়াতে এই বোমা ব্যাবহার করেছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সমালোচনা করেছে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading