ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল: আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত এক মহীয়সী
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:১৫
মহীয়সী ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল বিশ্বের আর্তমানবতার সেবায় জীবন উৎসর্গকারী নারী। সেবা ধর্মের মাতৃস্বরাপা মহীয়সী নারী হিসাবে অমরত্বের আসনে আসীন হয়ে আছেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ছিলেন আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত, একজন লেখক এবং পরিসংখ্যানবিদ। যিনি দ্যা লেডি ইউথ দ্যা ল্যাম্প নামে পরিচিত ছিলেন। আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত মহীয়সী ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলকে নিয়ে লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
| তৎকালীন সময়ে লন্ডনে সেবিকার কাজকে খুব ছোট করে দেখা হতো। অথচ ধনী, উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়েও ফ্লোরেন্স তখন নিজেকে একজন সেবিকা রূপে তৈরি করেন। তিনি তার তার কর্মে জানিয়ে দিয়েছিলেন- নার্সিং একটি পেশা নয়, সেবা। |
জন্ম স্থানের নামানুসারে নাম: ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে এক বিত্তশালী ইংরেজ পরিবারে ১৮২০ সালের ১২ মে মাসে জন্মগ্রহণ করেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। তার বাবা উইলিয়াম এডওয়ার্ড নাইটিঙ্গেল এবং মা ফ্রান্সিস নাইটিঙ্গেল। জন্ম স্থানের নাম অনুসারে পিতামাতা কন্যার নাম রেখেছিলেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। দীপ হাতে রমনী তারই প্রতীকী নাম। ফ্লোরেন্সের যখন ১৭ বছর বয়স, তখন উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য তাকে পাঠানো হল লন্ডন শহরে। কিন্তু গতানুগতিক শিক্ষার প্রতি কোন আকর্ষণ ছিল না তার। সেবাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করবেন এই ছিল তার অভিলাষ।
নার্স হিসেবে যাত্রা: ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ১৮৫৩ সালে প্রথম প্যারিসের এক মিশনারী হাসপাতালে নার্স হিসাবে যোগদান করেন। প্রথমে পরিবার থেকে বাধা এসেছিলো, কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে তিনি নার্সের চাকরি গ্রহণ করলেন। এই হাসপাতালে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল তার অসাধারণ নিষ্ঠা , শ্রম ও সেবার মনোবৃত্তি দিয়ে অল্প সময়ে সবাইকে বিস্মিত চমৎকৃত করে দিলেন। এরপর নাইটিঙ্গেল লন্ডনের হারল স্ট্রটের এক হাসপাতালে সুপারিনটেনডেন্ট হিসাবে যোগদান করেন।
কল্যাণী কর্মজীবন: ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল বহু হাসপাতালে এবং নার্সিং হোমে যাবার এবং রোগীদের সেবা ও চিকিৎসা পদ্ধতি দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। এইসব হাসপাতালে ব্যাধিগ্রস্ত যন্ত্রণাকাতর মানুষের দুঃখ–কষ্ট দেখেছেন। দেখেছেন অনেক অসহায় মৃত্যু। এইসব দেখে দেখেই তার প্রাণে আর্ত মানবতার প্রতি সৃষ্টি হয় গভীর মমত্ববোধ, সহানুভূতি আর সমবেদনা। ব্যথিত ব্যাধিজরিত মানুষের জন্য কেঁদে উঠতো তার কোমল হৃদয়। আর তখন থেকেই ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল মানবতার সেবায় সেবিকাবৃত্তি গ্রহণের জন্য উৎসাহিত ও মানসিকভাবে তৈরি হতে থাকেন।
ক্রিমিয়ার যুদ্ধে সেবার ব্রত: ১৮৫৩ সালেই শুরু হয় ক্রিমিয়ার যুদ্ধ। ব্রিটিশ সৈন্য অবতরণ করে ক্রিমিয়াতে। কিন্তু সেখানে যুদ্ধে আহত পঙ্গু সৈনিকদের কোনো চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় আহত সৈনিকদের মাঝে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুঃখ–দুর্দশা, কষ্ট–যন্ত্রণা। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল এখানে সেবার ব্রত নিয়ে এগিয়ে এলেন। প্রথমে সরকার তাকে অনুমতি দিতে চায়নি। কেননা তখন নারীদের এমন স্বাধীনতা ছিলো না। কিন্তু নাইটিঙ্গেলের অপরিসীম আগ্রহের কারণে শেষমেশ সরকার তাকে ক্রিমিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার অনুমতি দিতে বাধ্য হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে এসে নাইটিঙ্গেল লক্ষ্য করলেন সর্বত্র অব্যবস্থা। খুবই নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অবস্থিত হাসপাতালটি। নাইটিঙ্গেল ক্রিমিয়াতে পৌঁছেই হাসপাতাল নামধারী ব্যারাকটিকে একটি পরিপূর্ণ ও আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করলেন। নাইটিঙ্গেল তার সঙ্গিনীদের নিয়ে আহত অসহায় সৈনিকদের সেবায় সর্বাত্মকভাবে আত্মনিয়োগ করলেন। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল আহত রক্তাক্ত সৈনিকদের নোংরা রক্তাক্ত পরিধেয় পোশাক ধোলাই করার জন্য নিজেই একটি লীগ স্থাপন করলেন। কাপড় ধোয়ার কাজে নিয়োগ করলেন আহত সৈনিকদের স্ত্রীগণকে।
লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প উপাধি: ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল হাসপাতালের সেবাকর্মের ও কর্মপদ্ধতির আমূল পরিবর্তন আনলেন। নাইটিঙ্গেল আহত সৈনিকদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য প্রতি রাতে আলো হাতে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন আহত সৈনিকদের শয্যার পাশে। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল পরম স্নেহে ও মমতায় তাদের সেবাশুশ্রুষা করতে লাগলেন। নিতে লাগলেন সবার কুশলাদি। তিনি তার সেবাশুশ্রুষা ও মমতা দ্বারা সকল আহত সৈনিকদের এতোটা শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন যে, তিনি যখন আলো হাতে শয্যার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেন, তখন শয্যায় যে ছায়া পড়তো, সৈনিকগণ পরম শ্রদ্ধায় সেই ছায়ায় চুম্বন করতেন। তারা তাকে ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ উপাধিতে ভূষিত করে। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল মানবতার সেবায় নিজেকে এমনভাবে আত্মনিয়োগ করেছিলেন যে, তিনি দিনে রাতে প্রায় ২০ ঘন্টা পরিশ্রম করতেন। ১৮৫৬ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শেষ হলে নাইটিঙ্গেল ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন।
পঙ্গু হয়েও নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠা: ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের আশা ছিলো তিনি একটি নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করবেন। এজন্যে তিনি ৪০ হাজার পাউন্ডও সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে তিনি প্যারালাইসিস এ পঙ্গু হয়ে পড়েন। নাইটিঙ্গেল নব্বই বছর বেঁচেছিলেন। কিন্তু তার জীবনের অর্ধাংশেরও বেশি সময় কেটেছে পঙ্গু অবস্থায়। তবু পঙ্গু অবস্থাতেও বিছানায় শুয়ে শুয়ে চালিয়ে গেছেন তার সেবার কাজ। তার আন্তরিক চেষ্টায় অসুস্থ অবস্থাতেও ১৮৬৯ সালে লন্ডনের সেন্ট টমাস হাসপাতালে স্থাপিত হয় নার্স ট্রেনিং স্কুল। তারই অনুপ্রেরনায় দেশেবিদেশে গড়ে উঠেছে নার্সিং আন্দোলন, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নার্সিং স্কুল। অবহেলিত সেবাবৃত্তি হয়ে উঠেছে সম্মানের ও আদরণীয় পেশা। নতুন যুগের মেয়েরা এই পেশাকেই এখন গ্রহন করেছে ব্রত হিসেবে।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল এর মৃত্যু: নানা রোগে আক্রান্ত নাইটিঙ্গেল ১৯০১ সালে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। অবশেষে ১৯১০ খ্রি: ১৩ই আগস্ট জীবন প্রদীপের প্রহরিনী, মহীয়সী ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল তার স্বদেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল মারা গেলেও তার সেবার আদর্শের কথা সারা বিশ্বের মানুষের মনে জাগরুক হয়ে আছে। মাদার তেরেসা তারই আদর্শের অনুসারী এক অন্যতম উত্তরসুরী।

